ড. মোহাম্মদ কবির হাসান বাংলাদেশী-আমেরিকান অর্থনীতিবিদ। ইউনিভার্সিটি অব নিউ অরলিন্সের ডিপার্টমেন্ট অব ইকোনমিকস ও ফাইন্যান্সের প্রফেসর। বর্তমানে তিনি একই বিশ্ববিদ্যালয়ে হাইবারনিয়া প্রফেসর অব ইকোনমিকস অ্যান্ড ফাইন্যান্স, হ্যানকক হুইটনি চেয়ার প্রফেসর ইন বিজনেস এবং ব্যাংক ওয়ান প্রফেসর ইন বিজনেস নামে তিনটি বিশেষ চেয়ার প্রফেসর হিসেবে অধিষ্ঠিত। তিনি ২০১৬ সালে ইসলামিক ডেভেলপমেন্ট ব্যাংকের (আইডিবি) ইসলামিক ব্যাংকিং অ্যান্ড ফাইন্যান্স পুরস্কারে ভূষিত হয়েছেন। প্রফেসর হাসান বিভিন্ন সময়ে বিশ্বব্যাংক, আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল, আফ্রিকান উন্নয়ন ব্যাংক, ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি), ইসলামিক ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক, জাতিসংঘ উন্নয়ন কার্যক্রম (ইউএনডিপি), বাংলাদেশ ব্যাংক, সৌদি আরবের মুদ্রা কর্তৃপক্ষ, তুরস্কের সরকারসহ বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি সংস্থায় পরামর্শক ও উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। এছাড়া প্রফেসর হাসান অ্যাকাউন্টিং অ্যান্ড অডিটিং অর্গানাইজেশন ফর দ্য ইসলামিক ফাইন্যান্সিয়াল ইনস্টিটিউশনের (এএওআইএফআই) নীতি ও শাসন ব্যবস্থা কমিটির বোর্ড সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন। সম্প্রতি ইসলামী অর্থনীতি, ব্যাংকিং ও ইসলামী অর্থায়ন বিষয়ে বণিক বার্তার বিভিন্ন প্রশ্নের উত্তর দিয়েছেন। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন এম এম মুসা
১৯৮৩ সাল থেকে ৩৭ বছর ধরে আপনি যুক্তরাষ্ট্রে বসবাস করছেন। আপনার প্রাতিষ্ঠানিক পড়াশোনা (বিএ, এমএ ও পিএইচডি) পশ্চিমা ব্যাংকিং ও ফাইন্যান্স বিষয়ে এবং সে অর্থে ইসলামী অর্থায়ন নিয়ে আপনার প্রাতিষ্ঠানিক কোনো প্রশিক্ষণও ছিল না। তার পরও আপনি কীভাবে এ-সংশ্লিষ্ট গবেষণায় যুক্ত হলেন?
১৯৮০ সালে কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া কলেজ থেকে এইচএসসি পাসের পর এক বছর ঢাকা মেডিকেল কলেজে এবং আরো এক বছর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগে কাটিয়ে ১৯৮৩ সালের জানুয়ারিতে আমি যুক্তরাষ্ট্রে পাড়ি জমাই। প্রাতিষ্ঠানিক পড়াশোনা শেষে আমি ইউনিভার্সিটি অব নিউ অরলিন্সে শিক্ষার্থীদের ফাইন্যান্সের মৌলিক কোর্সগুলো পড়ানো শুরু করি, যেখানে সম্পদের সময়মূল্য ও বিভিন্ন ধরনের সুদভিত্তিক অর্থায়ন, যেমন গৃহ নির্মাণ ঋণ, যানবাহন ঋণ, বীমাসহ ব্যক্তি অর্থায়নের বিভিন্ন দিক নিয়ে আলোচনা করতে হতো। একজন প্র্যাকটিসিং মুসলিম হিসেবে তখন থেকেই আমি নিয়মিত পবিত্র কোরআন পড়ি। ওই সময় কোরআন পড়ে সুদভিত্তিক আর্থিক বিষয়গুলোর ব্যাপারে খুবই নেতিবাচক কথাগুলো ভালোভাবে জানতে পারি, বিশেষ করে আর্থিক চুক্তিসংক্রান্ত আয়াত পড়ে, যেখানে সুদের কুফল ও ব্যবসার সুফলের ওপর জোর দেয়া হয়েছে। তার পরে আমি ইসলামী ফাইন্যান্স বিষয়ে বিস্তর পড়াশোনা শুরু করি এবং মজার বিষয় হলো, পশ্চিমা ভঙ্গুর ব্যাংকিং ও আর্থিক ব্যবস্থার সমাধান এতে খুঁজে পাই, যা আমি অনেক দিন ধরে অনুসন্ধান করেছি। আমি দেখি যে ইসলামী অর্থ ব্যবস্থা সব জাতি ও মানুষের জন্য ভালো। কারণ এটি শোষণমূলক সুদভিত্তিক আর্থিক ব্যবস্থা থেকে মানবজাতিকে মুক্তি দিতে পারে।
ইসলামী অর্থায়ন ও ব্যাংকিংয়ের বিশেষ দিক কী আছে, যেটি নিয়ে আপনি আগ্রহী?
আমি কোনো ধর্মীয় বিষয়ের পণ্ডিত বা বিশেষজ্ঞ নই, আমি একজন অর্থনীতিবিদ এবং অর্থায়ন বিষয়ের শিক্ষক। কাজেই আমি প্রায়োগিক ইসলামী অর্থায়ন ও ব্যাংকিং বিষয়ে বেশি আগ্রহী। আসলে ইসলামী অর্থনীতি কোনো ধর্মতত্ত্ব নয়, এটি একটি সামাজিক বিজ্ঞান। ইসলামী অর্থায়ন কীভাবে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিকে ত্বরান্বিত করতে পারে, ইসলামী অর্থায়ন পশ্চিমা অর্থায়ন ব্যবস্থার চেয়ে কম না বেশি কার্যকরী এবং সুদ বা দায় সমাজে কতটা বৈষম্য তৈরি করতে পারে—এসব বিষয় নিয়ে আমি গবেষণা করে থাকি।
বৈশ্বিক অর্থায়নের প্রেক্ষাপটে ইসলামী অর্থায়ন খাতের আকার এখন কেমন?
ইসলামী অর্থায়ন একটি বিকাশমান খাত এবং অনেক দেশেই এটি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচিত হচ্ছে, বিশেষ করে সাম্প্রতিক বছরগুলোয় এ খাতকে বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে ভাবা হচ্ছে। আইএফএসবির (২০২০) তথ্যানুযায়ী, বার্ষিক ১১ দশমিক ৪ শতাংশ প্রবৃদ্ধি বজায় রেখে বৈশ্বিক আইএফএসআইয়ের মোট আর্থিক মূল্য ২০১৯ সালে ২ দশমিক ৪৪ ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলারে উন্নীত হয়েছে। ২০২০ সালের প্রত্যাশিত প্রবৃদ্ধি অবশ্য কিছুটা মন্দাজনিত ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে। ইসলামী ফাইন্যান্সের সম্পদগুলো এখনো মূলত জিসিসি (গালফ কোঅপারেশন কাউন্সিল) অঞ্চলে (৪৫.৪ শতাংশ), মধ্যপ্রাচ্য ও দক্ষিণ এশিয়ায় (২৫.৯ শতাংশ) এবং দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় (২৩.৫ শতাংশ) কেন্দ্রীভূত। ইসলামী ব্যাংকিংকে ১৩-আইএফএসবি অধিক্ষেত্রে পদ্ধতিগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ বিবেচনা করা হয়েছে। ইসলামী ব্যাংকিংয়ের যেসব জায়গায় পদ্ধতিগত গুরুত্ব রয়েছে, সেসব জায়গাতেই ৯১ দশমিক ৪ শতাংশ ইসলামী ব্যাংকিং সম্পদ কেন্দ্রীভূত আছে। এছাড়া ২০১৯ সালের হিসাব অনুযায়ী ৮৩ দশমিক ৬ শতাংশ সুকুক স্থিতি এবং ৭৭ দশমিক ৬ শতাংশ সুকুক ইস্যু করা হয়েছে এমন জায়গায়, যেখানে ইসলামী ব্যাংকিংয়ের পদ্ধতিগত গুরুত্ব রয়েছে।
গতানুগতিক ব্যাংকিং খাতের চেয়ে উল্লিখিত খাতটির প্রবৃদ্ধি প্রায় ৫০ শতাংশ বেশি। মুনাফার হিসাবেও বিশ্বের সেরা ২০টি ইসলামী ব্যাংক তাদের গড় বিনিয়োগের ১২ শতাংশ লাভ (রিটার্ন অন ইকুইটি) করছে। গ্রাহকের হিসাবেও ইসলামী ব্যাংক সারা বিশ্বের জনসংখ্যার অন্ততপক্ষে ২৫ শতাংশ দখল করে আছে। এ খাত প্রায় ১৭ শতাংশ সম্পদের প্রবৃদ্ধি নিয়ে এগোচ্ছে, যেখানে বিশ্বের ৯০টি দেশের ৯০০টিরও অধিক প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে উল্লেখ্য সেবা পরিচালিত হচ্ছে।
ভবিষ্যতে চলমান উন্নয়নের একটি টেকসই কাঠামো নির্মাণে ইসলামী অর্থায়নের মূল লক্ষ্য থাকবে। এছাড়া এ খাতে তারল্য ব্যবস্থাপনার গ্রহণযোগ্য সমাধানের পথ খুঁজে বের করা এবং আরো বেশি আর্থিক অন্তর্ভুক্তির মাধ্যমে পুরো সমাজে ভূমিকা রাখার ব্যাপারেও অধিকতর মনোনিবেশ করা হবে।
যদিও ইসলামী সম্পদের বর্তমান আকার উল্লেখযোগ্য, তবুও বিকাশের আরো জায়গা রয়ে গেছে। ২০১৪ সালের হিসাব অনুযায়ী ইসলামী অর্থায়ন খাতের সম্ভাব্য আকার বর্তমান আকারের চেয়ে প্রায় তিন গুণ বেশি, যার মাধ্যমে মুসলিম দেশ বা অসাম্প্রদায়িক দেশগুলোয়ও এ খাতের সম্প্রসারণের সম্ভাবনা ও গুরুত্ব সহজেই অনুমেয়। অবকাঠামোগত উন্নয়ন, নিয়ন্ত্রণ কাঠামো, ব্র্যান্ডের প্রচার, সুশাসন, মৌলিক সংযোজন ও মানবসম্পদ উন্নয়নের মাধ্যমে এ খাতের চাহিদা পূরণে ভালো ভূমিকা রাখা সম্ভব, যাতে বিভিন্ন আর্থিক পণ্য ও সেবার মাধ্যমে এ খাতের সম্ভাব্য সম্প্রসারণ সংঘটিত হয়।
সামাজিক বিনিয়োগ, সামাজিক বাণিজ্য ও ইমপ্যাক্ট ইনভেস্টমেন্ট সম্পর্কে আমরা শুনে থাকি। ইসলামী অর্থায়নের সঙ্গে সামাজিক গুরুত্বপূর্ণ অর্থায়ন ও ইমপ্যাক্ট ফাইন্যান্সিংয়ের সম্পর্ক কী?
ইমপ্যাক্ট ইনভেস্টিং হলো এমন ধরনের বিনিয়োগ, যেখানে নির্দিষ্ট সামাজিক লক্ষ্য ও আর্থিক সুফল একসঙ্গে বিবেচনা করে বিনিয়োগ করা হয় এবং যৌথ লক্ষ্যে অর্জনকে গুরুত্ব দেয়া হয়। ইমপ্যাক্ট ইনভেস্টিংয়ের আওতায় রয়েছে সামাজিক ভূমিকাসূচক খাতগুলো (উদাহরণস্বরূপ কর্মসংস্থান সৃষ্টি, পরিবেশগত প্রভাব, সুশাসনের মানদণ্ড ইত্যাদি), যার জন্য লিখিত নিয়মের বাইরেও ইসলামী মূল্যবোধের নীতি বেশি কাজ করে। ইমপ্যাক্ট ইনভেস্টিংয়ের ক্ষেত্রে নেতিবাচক দিকগুলো ছেঁকে দেখার পাশাপাশি উপকারী দিকগুলোয়ও বিশেষ নজর দেয়া হয়। ব্যবস্থাপকরা সক্রিয়ভাবে সামাজিক ভূমিকা রাখা ক্ষেত্রগুলোয় বিনিয়োগে উৎসাহী হন। এছাড়া ইমপ্যাক্ট ইনভেস্টিংয়ের মাধ্যমে বিনিয়োগের পরেও কোম্পানিগুলোকে সামাজিক ভূমিকা রাখায় উৎসাহিত করা হয় এবং পোর্টফোলিও কোম্পানিগুলোকে তাদের সামাজিক ভূমিকা সম্প্রসারণে সহায়তাও করা হয়।
অর্থায়নের লক্ষ্য ও কাঠামো উভয়কে ইসলামী অর্থায়নে গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা হয়, কারণ রিবা ও অতিরিক্ত ঘারারে ইসলামের নিষেধাজ্ঞা, যা সাধারণত বোঝায় সুদে টাকা দেয়া এবং ঝুঁকির বাণিজ্য। এছাড়া ইসলামী অর্থায়নের কিছু আনুষঙ্গিক বাছাই প্রক্রিয়া আছে (যেমন অ্যালকোহল, তামাক ও জুয়া) এবং প্রচলিত আর্থিক সেবায় নিষেধাজ্ঞা আছে, কারণ তাতে রিবা অন্তর্ভুক্ত। সর্বোপরি বর্তমান কাঠামো ও আইনগত পরিপালনে ইমপ্যাক্ট ফাইন্যান্সিংয়ের জন্য ইসলামী ব্যাংক এখনো তেমন প্রায়োগিক নয়। ইসলামী ব্যাংকিং খাতকে নতুন নতুন ঝুঁকি বণ্টনে সক্ষম আর্থিক উপাদান সামনে নিয়ে আসতে হবে।
সামাজিক ইমপ্যাক্ট ইনভেস্টমেন্টের (এসআইআই) ক্ষেত্রে ইসলামী অর্থায়নের প্রাসঙ্গিকতা কতটুকু? ইসলামী অর্থায়নের মাধ্যমে সামাজিক পরিবর্তনে ভূমিকা রাখার ক্ষেত্রে জাতীয় নীতিনির্ধারণ কী কী ভূমিকা রাখতে পারে?
যেহেতু বিনিয়োগের ক্ষেত্রে শরিয়াহ নীতি মেনে বিনিয়োগ করা হয়, অর্থাৎ ইসলামী বিধি পরিপন্থী কার্যক্রম বা পণ্যে বিনিয়োগ করা হয় না এবং যে হারে মুনাফা নির্ধারণ বা আদায় করা হয়, সেহেতু সব মিলিয়ে এসআইআইয়ের সঙ্গে ইসলামী অর্থায়নের প্রাসঙ্গিকতা আছে। ঐকমত্যের ভিত্তিতেও বাজারের চাহিদা অনুযায়ী মানদণ্ড ও প্রতিবেদন নির্ধারণে সামাজিক ভূমিকার মানদণ্ড এবং প্রতিবেদনের সক্ষমতা রয়েছে। এছাড়া বিনিয়োগের ক্ষেত্রে আর্থিক ও সামাজিক সুফলের ভারসাম্য রক্ষায় সামাজিক ভূমিকার মানদণ্ড ও প্রতিবেদনের ভূমিকা রয়েছে এবং বিবিধ বিনিয়োগকে ভূমিকার সাপেক্ষে তুলনা করার জায়গা রয়েছে।
ইসলামী অর্থায়ন খাতের জন্য একটি এসআইআই সহায়ক নিয়ন্ত্রণ নীতিমালা থাকা প্রয়োজন। এর মধ্যে থাকতে পারে বিভিন্ন ফাউন্ডেশনের ট্রাস্টিদের নতুন ক্ষমতায়ন, যাতে তারা সামাজিক ইমপ্যাক্ট ইনভেস্টমেন্ট করতে পারে এবং পেনশন ফান্ডের ট্রাস্টিদের তাদের বিনিয়োগের সামগ্রিক সামাজিক সুফল সম্পর্কে উৎসাহিত করা, যাকে তারা তাদের সামাজিক ও নৈতিক দায়িত্ব হিসেবেও বিবেচনা করতে পারে। এছাড়া সামাজিক খাতের অর্গানাইজেশনের (এসএসও) মাধ্যমে সংগৃহীত বিনিয়োগের লক্ষ্য, আকার ও সীমাকে স্বীকৃতি দেয়ার মতো সহজতর, সুসংহত নীতিমালা ও আনুষঙ্গিক বিধিবিধান গ্রহণ করতে হবে, যাতে পরিপালন ব্যয় বিনিয়োগের আকারের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হয়। নিয়ন্ত্রণ কাঠামোর মধ্যেও কিছুটা নমনীয়তার মাত্রা থাকতে হবে, যাতে বাজার সম্প্রসারণ ও আনুষঙ্গিক প্রয়োজনীয় পরিবর্তনকে সুযোগ করে দেয়া যায়।
একটি সহায়ক নিয়ন্ত্রণ কাঠামোর মাধ্যমে ইসলামী অর্থায়নকে ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পে বিনিয়োগে উৎসাহিত করতে হবে। নিয়ন্ত্রণ কাঠামোকে পুনর্গঠন করতে হবে, যাতে বিশেষ ক্ষেত্রগুলোয়, যেমন পেনশন ফান্ড ব্যবস্থাপকের জন্য নতুন সামাজিক ভূমিকাসূচক বিনিয়োগের আর্থিক পণ্য সৃষ্টিতে নমনীয়তা ও স্বকীয়তার মাত্রা বাড়ে। এছাড়া এসআইআই খাতগুলোয় খুচরা বিনিয়োগের ক্ষেত্রে প্রাসঙ্গিক নিয়ন্ত্রণ কাঠামোকে সমানুপাতিক, বিনিয়োগ সম্ভাবনার খরচের বিপরীতে গ্রাহকের নিরাপত্তা বিবেচনা করা এবং নিয়ন্ত্রণ কাঠামোর মধ্যে একই রকম চিন্তার সমন্বয় সাধনে সচেষ্ট হতে হবে। বর্তমান প্রচলিত অর্থ ব্যবস্থার মধ্যে সমন্বয়হীনতা দূর করে সামাজিক ভূমিকাসূচক অর্থায়নকে চিহ্নিত ও উৎসাহিত করতে হবে। এ-সংক্রান্ত অর্জনে প্রথম ধাপ হিসেবে অভ্যন্তরীণ ক্ষেত্রে খুচরা বিনিয়োগে এসআইআইকে চালু করতে এই সুপারিশ যথেষ্ট প্রায়োগিক।
ইসলামী শরিয়াহ কাউন্সিল, যা ইসলামী আইন ও বিধিবিধান মেনে চলার পাশাপাশি ইসলামী অর্থায়নের আরো সুসংগঠিত সুশাসন কাঠামো লাগবে, যাতে সামাজিক ইমপ্যাক্ট ইনভেস্টমেন্ট করা যায়। ফলে সামাজিক উত্কর্ষ, টেকসই উন্নয়ন ও স্থিতিশীলতা অর্জিত হবে। ইসলামী অর্থায়ন, সামাজিক ইমপ্যাক্ট ইনভেস্টমেন্টের ক্ষেত্রে অনুষঙ্গ হিসেবে কাজ করবে। জিসিসি স্বাধীন সম্পদ তহবিল, যা দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগের অবস্থান বজায় রেখেছে, ইসলামী অর্থায়নের সামাজিক এজেন্ডা বাস্তবায়নে ও কাঠামোগত ভূমিকাসূচক বিনিয়োগে সহায়ক ভূমিকা পালন করতে পারে।
আমরা মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশগুলোয় ইমপ্যাক্ট ইনভেস্টমেন্টকারীদের উৎসাহিত করতে সামাজিক উদ্যোগের আকার কীভাবে বাড়াতে পারি?
ইমপ্যাক্ট ইনভেস্টমেন্টের ক্ষেত্রে সক্ষমতা বাড়ানোটা খুব জরুরি। প্রচলিত বিনিয়োগের বাইরেও ইমপ্যাক্ট ইনভেস্টমেন্টের জন্য আলাদা কিছু দক্ষতা ও সক্ষমতা প্রয়োজন হয়। প্রচলিত বিনিয়োগের মতোই ইমপ্যাক্ট ইনভেস্টমেন্টের ক্ষেত্রেও অবশ্যই মূল বাণিজ্যিক দিকগুলো পর্যালোচনা করতে হবে। সর্বোপরি ইমপ্যাক্ট ইনভেস্টমেন্টের ক্ষেত্রে সামাজিক ভূমিকার কথা অবশ্যই বিবেচনায় রাখতে হবে। ইসলামী বিনিয়োগের ব্যবস্থাপকদেরও একটি নৈতিক পরিসর গঠন করা দরকার, যাতে শরিয়াহ মেনেই সামাজিক দায়বদ্ধতার প্রতি মনোযোগের জায়গা বাড়াতে হবে। নৈতিক পরামর্শক পর্ষদ গঠন করতে হবে, যাতে ইসলামী ইমপ্যাক্ট ইনভেস্টমেন্টের জন্য প্রয়োজনীয় অবকাঠামো গঠন করা যায়।
মুসলিম জনগোষ্ঠীকে একটি বিশ্বাসনির্ভর অনুপ্রেরণার জায়গা করে নিতে হবে, যেখানে একই সঙ্গে অন্যদের থেকে শেখাও যায় এবং আলোচনা ও সমন্বয়ের একটা প্লাটফর্ম তৈরি করা যায়, যাতে ব্যবসা-বাণিজ্যের সঙ্গে কীভাবে দাতব্য, মানবহিতৈষী ও সামাজিক অগ্রগতিকে সমন্বয় করা যায়, যা আমরা সাম্প্রতিক ইমপ্যাক্ট ইনভেস্টিং পদ্ধতিগুলোয় দেখতে পাই। সমসাময়িক টেকসই ও দায়িত্বশীল উদ্যোগগুলোর সঙ্গে ইসলামী বিধিবিধানের সম্পর্ক আছে, যেমন ইকুয়েটর প্রিন্সিপাল, যেখানে প্রকল্পে বিনিয়োগকারীদের ওপরে পরিবেশগত দায়বদ্ধতার জন্য সহায়ক নীতি অনুসরণ করা হয়। ইসলামী প্রতিষ্ঠানগুলো সমসাময়িক টেকসই ও দায়িত্বশীল কাঠামোকে আত্তীকরণ করতে পারবে, যাতে ইসলামী নৈতিক দিকগুলোয়ও আরো মনোযোগী হওয়া যায়। অনেকেই এরই মধ্যে এভাবে এগোতে শুরু করেছে, যেমন ইউরোপের এরাবিসকিউ এবং সৌদি আরবের সেডকো।
ইসলামী অর্থায়ন কীভাবে জাতিসংঘের টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রায় সহায়ক ভূমিকা রাখতে পারে?
সামাজিক পণ্য উৎপাদনে সহায়ক হয়ে বা সামাজিক ক্ষেত্রে বিনিয়োগের মাধ্যমে ইসলামী অর্থায়ন প্রতিষ্ঠানগুলো পরোক্ষভাবে সামাজিক ও পরিবেশগত ক্ষেত্রে ভূমিকা রাখতে পারে। মুদ্রাবাজারও (নির্দিষ্ট করে বললে ওয়াকফ সম্পদ) সামাজিক ক্ষেত্রের উন্নয়নে ভূমিকা রাখতে পারে। ওয়াকফ ক্ষেত্রকে বহুমুখী প্রক্রিয়ার মাধ্যমে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া প্রয়োজন, যাতে এটি সামাজিক উন্নয়নে ভালো ভূমিকা রাখতে পারে। কিছু দেশ এরই মধ্যে ওয়াকফ ক্ষেত্রকে উজ্জীবিত করার উদ্যোগ নিয়েছে। উদাহরণস্বরূপ, সুদানের আওয়াকাফ কর্তৃপক্ষ বর্তমান ওয়াকফ সম্পদকে আরো উৎপাদনশীল ও রাজস্ব আয়নির্ভর করে গড়ে তোলার জন্য বিনিয়োগ বা বিনির্মাণ বিভাগ চালু করার উদ্যোগ নিয়েছে এবং সে লক্ষ্যে নতুন ওয়াকফ ও অনুদান সংগ্রহ করছে। একইভাবে কুয়েতেও আওয়াকাফের একটি স্বতন্ত্র ও সাধারণ সচিবালয় গঠন করা হয়েছে, যাদের কাজ হলো দেশের ওয়াকফ সম্পদের সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা।
জাকাতযোগ্য সম্পদের পুনর্মূল্যায়ন ও সুষ্ঠু ব্যাখ্যার মাধ্যমে সমসাময়িক সময়ের পরিপ্রেক্ষিতে জাকাত সম্পদের সম্প্রসারণ সম্ভব। বর্তমানে অপ্রতুল জাকাত সংগ্রহের অন্যতম কারণ হচ্ছে প্রচলিত কিছু ব্যাখ্যা, যেখানে বর্তমান সময়ের প্রেক্ষাপটে অনেক জাকাতযোগ্য সম্পদকে জাকাত প্রদানকারীরা হিসাবের মধ্যে রাখছেন না। অনেক প্রচলিত ও পুরনো সম্পদের ধারণায় যা ছিল, যেমন গৃহস্থালি পশু এখন অনেকের কাছেই দেখা যায় না; কিন্তু অনেক সমসাময়িক সম্পদ যেমন স্টক, মুদ্রাবাজের বিনিয়োগ বা উদ্বৃত্ত পণ্যকে অনেক সময়ই জাকাতযোগ্য সম্পদ বিবেচনা করা হচ্ছে না। দ্বিতীয়ত, জাকাত প্রতিষ্ঠানগুলোর সংগ্রহ ও বিতরণের প্রক্রিয়াকে আরো উন্নত ও গতিশীল করতে হবে। এক্ষেত্রে আইনগত, প্রাতিষ্ঠানিক ও প্রায়োগিক পর্যায়ে বিবিধ উদ্যোগ গ্রহণ করা প্রয়োজন।
ইসলামী অর্থায়নের মতো উদ্ভাবনী অর্থায়ন প্রক্রিয়াকে অর্থায়নের ঘাটতি পূরণের মাধ্যমে টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে কীভাবে ব্যবহার করা যায়?
বিনিয়োগকারীদের ও স্বতন্ত্র সম্পদকে উদ্বুদ্ধ করতে উদ্ভাবনী প্রক্রিয়া, যেমন কার্বন বাজারকে কাজে লাগানো যেতে পারে। অর্থনৈতিক, সামাজিক ও পরিবেশগত দিক দিয়ে টেকসই উন্নয়নকে ত্বরান্বিত করতে ইসলামী অর্থায়নের পণ্যগুলো যথেষ্ট উপযোগী ও প্রায়োগিক এবং ২০১৫-এর উন্নয়ন এজেন্ডা-পরবর্তী কর্মসূচির জন্য পুরো অর্থায়ন পরিকাঠামোর একটি উল্লেখযোগ্য উপাদান হিসেবে বিবেচিত।
ইসলামী অর্থায়নের পণ্যগুলো অধিকতর সামাজিক উন্নয়নকে ত্বরান্বিত করছে। সংহতি-সূচক ইসলামী অর্থায়ন বিশেষ করে জাকাত ও ওয়াকফকে প্রান্তিক পর্যায়ের অর্থায়নের একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হিসেবে ব্যবহার করা যেতে পারে। ইসলামী অর্থায়নের মাধ্যমে অর্থনৈতিক অন্তর্ভুক্তিও এগিয়ে নিয়ে যাওয়া সম্ভব। বিশ্বের মুসলিম জনগোষ্ঠীর উত্তরোত্তর ও উল্লেখযোগ্য সংখ্যা বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে তাল মিলিয়ে বিশেষায়িত আর্থিক সেবা প্রদানের মাধ্যমে ইসলামী অর্থায়ন এই বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর জন্য তার উপযোগিতা বজায় রাখবে।
নীতিনির্ধারক, বিনিয়োগকারী ও তহবিল ব্যবস্থাপককের মধ্যে প্রণোদনা কাঠামোর সাম্য প্রতিষ্ঠায় ইসলামী অর্থায়ন সামাজিক ও অর্থনৈতিক উন্নয়নে ভূমিকা রাখতে পারে। উদাহরণস্বরূপ, ইসলামী বীমা ধারণা ‘তাকাফুল’-কে প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে অংশীদারদের তহবিল ও কার্যক্রম বণ্টনের নীতির ওপরে, যাতে নীতিনির্ধারকদের মধ্যে তহবিল ও দায়িত্বের সুষ্ঠু বণ্টন হয়, যারা লাভ ও ক্ষতি উভয়েরই ভাগীদার হবে।
বৈশ্বিক অর্থনৈতিক মন্দা বা অচলাবস্থার সময়ে অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে ইসলামী অর্থায়ন ভূমিকা পালন করে। বিশেষ করে ব্যক্তি বা ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের সঙ্গে আর্থিক প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ঝুঁকির বণ্টন ও দীর্ঘমেয়াদি সম্পর্ক নির্মাণকে মূল নীতিতে রাখায় এর মাধ্যমে আর্থিক খাত ও অর্থনীতি সুদৃঢ় হচ্ছে। আর্থিকীকরণ যেভাবে বৈশ্বিক অর্থনৈতিক মন্দা ও অচলাবস্থাকে ঋণাত্মক ভূমিকায় রেখেছে, সেখানে ইসলামী অর্থায়ন সাধারণ স্বার্থ ও দায় বণ্টনের ওপর ভিত্তি করে অধিকতর স্থিতিশীল, অন্তর্ভুক্ত এবং উন্নয়নমুখী আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক কাঠামো নির্মাণে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখতে পারে।
ইসলামী অর্থায়ন খাতকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য সর্বোত্তম পন্থাগুলো কী কী বলে আপনি মনে করেন?
আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর মান নির্ধারণ এবং এর প্রয়োগের মাধ্যমে প্রচলিত ইসলামী ব্যবস্থার অপব্যবহার রোধ করা যেতে পারে। সঠিক প্রবৃদ্ধির জন্য পণ্যের মান নির্ধারণ ও সামঞ্জস্যবিধানের মাধ্যমে সঠিক শরিয়াহ পরিপালন পদক্ষেপ নেয়া জরুরি। প্রশিক্ষণ কার্যক্রমের মাধ্যমে মানবসম্পদ উন্নয়ন করে এ খাতের প্রচার, কার্যক্রম পরিচালনা এবং তদারকির ক্ষেত্রে উপযোগী ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা প্রয়োজন, যাতে ইসলামী অর্থায়ন প্রতিষ্ঠানগুলোর উত্তরোত্তর প্রবৃদ্ধি অর্জিত হয়। ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো এক্ষেত্রে ভালো ভূমিকা রাখছে, কিন্তু সরকারের পক্ষ থেকেও এ বিষয়ে আরো কাজ করতে হবে। ক্ষুদ্রঋণকে দরিদ্র জনগোষ্ঠীর মাঝে উৎসাহিত করতে হবে, যার মাধ্যমে উদ্ভাবনী ক্ষেত্রে ও চাহিদা বৃদ্ধিতে ইসলামী অর্থায়নের ভূমিকা রাখার বড় সুযোগ রয়েছে। ইসলামী অর্থনৈতিক ব্যবস্থাকে উন্নত ও কার্যকর করার লক্ষ্যে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক বিভিন্ন ইভেন্ট আয়োজন করতে হবে। উদাহরণস্বরূপ, তুরস্কে এরই মধ্যে সুদবিহীন অর্থায়নকে উৎসাহিত করতে একটি প্রচারণা ক্যাম্পেইন শুরু হয়েছে।
বিশ্বায়ন, স্বচ্ছতা, মূলধন আন্দোলনসহ অন্য পারিপার্শ্বিক বিষয়গুলো ইসলামী অর্থায়ন সেবা খাতে বড় প্রভাব রেখে চলেছে, বিশেষ করে এ খাতকে প্রতিনিয়ত চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন করছে। ইসলামী অর্থায়নের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ কী বলে আপনি মনে করেন?
সাম্প্রতিক বছরগুলোয় সিএআর (ক্যাপিট্যাল এডিকুয়েসি রেশিও)-তে একটি নিম্নমুখী ধারা লক্ষ করা যাচ্ছে। শরিয়াহসম্মত ও উদ্ভাবনী মূলধনি উপকরণ জোগানের ক্ষেত্রে এখনো চ্যালেঞ্জ রয়ে গেছে, যার মাধ্যমে ব্যাসেল-৩ বা আইএফএসবি-১৫-এর আবশ্যকতাগুলো পূরণ করা যায়। এছাড়া ইসলামী রেটিং এজেন্সিও প্রয়োজন, যারা ইসলামী মূলধন বাজারে বিক্রীত পণ্যগুলোর কার্যকরী রেটিং করতে পারে।
ইসলামী নিয়ন্ত্রণ সংস্থাগুলোর স্বচ্ছতাও একটি অন্যতম চ্যালেঞ্জ এবং এ বিষয়ে অবশ্যই মনোযোগ দিতে হবে। ইসলামী অর্থায়নের গ্রহণযোগ্যতা বৃদ্ধি করতে একটি কার্যকরী অবকাঠামো প্রণয়ন করা দরকার, যা আন্তর্জাতিক মান সমন্বয়ের ক্ষেত্রে মুক্ত বাজার ও স্বচ্ছতাকে সমর্থন করবে। শরিয়াহ বিশেষজ্ঞরা যে প্রক্রিয়ায় শরিয়াহসম্মত ইসলামী অর্থায়নের পণ্য বা সেবা নির্ধারণ করেন বা করবেন, তাতেও স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা খুব জরুরি। গ্রহণযোগ্যতা নিশ্চিতকল্পে এসব শরিয়াহ সিদ্ধান্তের প্রকাশ ও প্রচার হওয়ারও প্রয়োজনীয়তা আছে। ইসলামী অর্থায়ন উপকরণ নির্ধারণের ক্ষেত্রে যেকোনো অন্তর্দ্বন্দ্ব নিরসনে বহিরাগত শরিয়াহ বিশেষজ্ঞেরও মত প্রকাশের একটা জায়গা থাকতে হবে।
এছাড়া ইসলামী অর্থায়নে বিনিয়োগকারীদের প্রয়োজন অনুযায়ী ও সন্তুষ্টির স্বার্থে আরো নতুন নতুন ইসলামী অর্থায়ন সংশ্লিষ্ট উপকরণ ও সেবা উদ্ভাবন করতে হবে। প্রচলিত একটা কথা আছে যে ইসলামী অর্থায়নের পণ্য বা সেবা মূলত চিরাচরিত আর্থিক সেবা ও পণ্যের নকল বা একই রূপ; যা হওয়া যাবে না। তাই প্রচলিত আর্থিক সেবাকেই ইসলামী অর্থায়ন খাতে আত্মস্থ না করে ইসলামী অর্থায়নের মূল নীতির ওপর জোর দিয়ে নতুন নতুন উদ্ভাবনী সেবা চালু করতে হবে।
ইসলামী অর্থায়ন খাতের প্রবৃদ্ধির জন্য এ-সংক্রান্ত শিক্ষা কার্যক্রম কতটা জরুরি এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো এক্ষেত্রে কী কী ভূমিকা রাখতে পারে?
ধর্মীয় বিশ্বাসের কারণেই মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশগুলোয় অনেক ব্যক্তিই প্রচলিত ব্যাংকিং ধারা থেকে নিজেদের বিচ্ছিন্ন রাখেন, যা অর্থনীতি ও উন্নয়নের পথে অন্তরায়। যেকোনো পরিবর্তনের সঙ্গেই ইসলামী অর্থায়নের নতুন বাজার প্রসারের ক্ষেত্রে অন্তরায় হওয়ার মতো ইস্যু রয়েই গেছে। এর মধ্যে একটি ইস্যু হলো শিক্ষা, বিশেষ করে ইসলামী অর্থায়নকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার মতো জ্ঞান ও দক্ষতাসম্পন্ন ব্যক্তির অভাব রয়ে গেছে। এ ইস্যুর অন্যতম প্রতিকার হতে পারে ইসলামী মূল্যবোধকে অর্থায়নের সঙ্গে সম্পৃক্ত করতে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে একাডেমিক কার্যক্রম পরিচালনা করা এবং মূলধারায়ও বিষয়টি সংযোজন করা যেতে পারে। এসব অন্তর্ভুক্তির বিভিন্ন পন্থা আছে। প্রচলিত উপকরণের সীমার বাইরে শরিয়াহসম্মত ও নৈতিক দিক থেকে পর্যালোচনার অনেকগুলো বিষয়ের একটি হলো ফিনটেক। টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা সম্পৃক্ততার আরেকটি পথ উন্মোচন করে দেয়। বর্তমানে ব্যবহূত প্রক্রিয়াগুলোর সম্প্রসারণ ও ধনাত্মক বাছাই প্রক্রিয়াকে সংযোজনের মাধ্যমে ইসলামী অর্থায়ন টেকসই উন্নয়নের অনেক পথ বাতলে দিতে পারে। পরিশেষে, ইসলামী অর্থায়ন মানুষকে তার উন্নত অর্থনৈতিক জীবনের জন্য প্রয়োজনীয় সেবা দিতে পারে।
ইসলামী অর্থায়ন নিয়ে মানুষকে জানানোর ক্ষেত্রে শিক্ষাক্রমের কোন কোন দিককে আপনি গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করেন?
ইসলামী অর্থায়নের উন্নয়নের ক্ষেত্রে মানবসম্পদ একটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ অংশ, তাই এ বিষয়ে যারা সম্পৃক্ত, যেমন কর্মী বা সেবাগ্রহীতা, সবাইকেই এ বিষয়ে শিক্ষিত করে তোলা খুব জরুরি। বিভিন্ন রিসার্চ সেন্টার, একাডেমিক প্রতিষ্ঠান ও ইসলামী অর্থায়ন প্রতিষ্ঠানের প্রশিক্ষণ কার্যক্রমের মাধ্যমে এ-সংক্রান্ত প্রশিক্ষণে সম্পৃক্ত করার ক্ষেত্রে বর্তমান কর্মজীবী ও গ্রাহকদের উদ্বুদ্ধ করা দরকার। এই শিক্ষণের চলমান প্রক্রিয়ার মাধ্যমে সক্ষমতা বৃদ্ধি ও কর্মশক্তি সম্প্রসারণের সুযোগ বৃদ্ধি পাবে। জীবনের অন্যান্য দিকের পাশাপাশি ইসলামী অর্থায়নের ক্ষেত্রেও প্রযুক্তির বিকাশ বিভিন্ন অগ্রগতির সক্ষমতা বৃদ্ধি করছে। যারা আগে কোনো আর্থিক সেবায় সম্পৃক্ত ছিলেন না, তাদেরকে অন্তর্ভুক্তিকরণ যথেষ্ট কার্যকর একটি প্রক্রিয়া। সর্বোপরি, প্রযুক্তির কল্যাণে সম্প্রসারিত সক্ষমতার সঙ্গে তাল মিলিয়ে মেধার ব্যবধান কমানোয় ইসলামী অর্থায়ন ভালো করে যাচ্ছে।
ইসলামী অঞ্চলের বাইরের দেশগুলোও ধীরে ধীরে ইসলামী অর্থায়নের উপকারী দিকগুলো উপলব্ধি করতে শুরু করেছে। বিশ্বের মোট জনগোষ্ঠীর ২৪ শতাংশ অর্থাৎ ১ দশমিক ৮ বিলিয়ন মুসলিম, যারা মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশগুলো ও পশ্চিমা দেশগুলোয় অবস্থান করে। এর মাধ্যমে ইসলামী অর্থায়ন কোথায় পৌঁছতে সক্ষম, তা কিছুটা আন্দাজ করা যায়। আইসিডি-রেফিনিটিভ ইসলামী অর্থায়ন উন্নয়ন প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৪ সালের মধ্যে এ খাত ৩ দশমিক ৫ ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলারে উন্নীত হবে, যা ২০১৮ সালের মধ্যে ২ দশমিক ৫ ট্রিলিয়ন ছিল। ৮৭টি দেশ এক হাজারেরও বেশি প্রতিষ্ঠানের দ্বারা ইসলামী অর্থায়নের মাধ্যমে আর্থিক সেবাদান করে। যাহোক, ইসলামী অর্থায়ন শিক্ষাক্রমের দিক দিয়ে এখনো অনেক পিছিয়ে আছে। মুসলিম যুব সম্প্রদায়কে লক্ষ্য করে এদিকও এগিয়ে নিয়ে যেতে হবে, যেখানে তারা এ-সংক্রান্ত অর্থনৈতিক দিকে জ্ঞান লাভ করবেন। পশ্চিমা দেশগুলোর সঙ্গে ব্যবধান কমানো নিশ্চিত করতে হবে। একাডেমিক প্রতিষ্ঠান স্থাপন এক্ষেত্রে জরুরি। দক্ষিণ এশিয়া ও মধ্যপ্রাচ্যের ৬০ শতাংশ নারী এবং আরব বিশ্বের ১৫ বছরের ঊর্ধ্বে অপ্রাপ্তবয়স্কদের ৪০ শতাংশ লেখাপড়া জানে না। শিক্ষাক্রম ও এ-সংশ্লিষ্ট ক্ষেত্র এজন্য অনেকাংশে দায়ী এবং এ-সংক্রান্ত বিষয়ে বিশেষ করে মৌলিক আর্থিক শিক্ষায় সবাইকে শিক্ষিত করে তুলতে হবে। এ খাতকে সামনে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া খুব জরুরি এবং এটা তখনই সম্ভব যখন এ খাতের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট শিক্ষা, চিন্তাধারার সম্প্রসারণ ও জ্ঞানের বণ্টন কার্যকর হবে। এ তথ্যের বিনিময় ও শিক্ষাই শরিয়াহসম্মত বিভিন্ন পণ্য ও সেবা উৎপাদনে কাজ করতে পারে। বিভিন্ন গবেষণায় প্রকাশিত পরামর্শ নিয়ে এবং এ-সংক্রান্ত সমস্যা সমাধানের প্রক্রিয়ার মাধ্যমে এ খাতকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া সম্ভব হবে। বিনিয়োগকারী ও তাদের ক্রমবর্ধমান চাহিদার সঙ্গে সাদৃশ্য রেখে শরিয়াহসম্মত ইসলামী অর্থায়ন সেবা প্রণয়ন প্রয়োজন। এসব পণ্য ও সেবা উৎপাদনে ইসলামী অর্থায়ন প্রকৌশলী প্রয়োজন, যা বর্তমানে প্রচলিত সেবাকে আরো সামনে এগিয়ে নিয়ে যেতে পারে। অর্থনৈতিক উদ্ভাবন বিবিধ উন্নয়নের ক্ষেত্রে সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচন করে।
(চলবে)
ভাষান্তর ও শ্রুতলিখন: হুমায়ুন কবির










