বাংলাদেশের অর্থনীতি একটি উত্ক্রমণশীল পর্যায়ে রয়েছে। করোনার অভিঘাতে চলতি বছর কিছুটা হোঁচট খেলেও এক দশকের বেশি সময় ধরে দেশে চমকপ্রদ অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি হচ্ছে। রাষ্ট্রীয় নেতৃত্ব এ অর্থনৈতিক উন্নয়ন আরো বেগবান করার মাধ্যমে ২০৪১ সালের মধ্যে বাংলাদেশকে উন্নত দেশের কাতারে উত্তরণে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। স্বাভাবিকভাবে অর্থনৈতিক উন্নয়নের সঙ্গে শিল্পায়নের একটি গভীর যোগসূত্র বিদ্যমান। কিন্তু দুঃখজনক বিষয় হলো, বিগত সময়ে দেশে শিল্প-কারখানা গড়ে উঠেছে অনেকটা অপরিকল্পিতভাবে এবং এক্ষেত্রে পরিবেশ সুরক্ষার বিষয়টিও খুব একটা প্রাধান্য পায়নি। পরিবেশ অধিদপ্তরের মানদণ্ড অনুযায়ী কারখানাগুলোয় শিল্পবর্জ্য রোধে ইটিপি বাস্তবায়ন বাধ্যতামূলক হলেও অধিকাংশ প্রতিষ্ঠানই তা যথাযথভাবে পরিপালন করেনি। সরকারি প্রশাসনের তরফ থেকে ঝটিকা অভিযানে গেলে তাত্ক্ষণিকভাবে ইটিপি চালু রাখা হলেও প্রতিষ্ঠানগুলো বাড়তি ব্যয়ের দোহাই দিয়ে বেশির ভাগ সময় সেগুলো বন্ধ রেখেছে। ফলে শিল্পবর্জ্যে আমাদের নদী, পানি ও মাটি ব্যাপকভাবে শিকার হয়েছে। সর্বোপরি হুমকিতে পড়েছে পরিবেশ। এ অবস্থায় আগের শিল্পায়ন প্রক্রিয়া সামগ্রিকভাবে আদৌ কতটা টেকসই হয়েছে, সেটি নিয়ে প্রশ্ন রয়ে যায়।
এটি সত্য যে বাঞ্ছনীয় অর্থনৈতিক উন্নয়ন করতে হলে জোরালো শিল্পায়নের বিকল্প নেই। কিন্তু শিল্পায়নের ধরনটি কেমন হবে, তা নিয়ে সুপরিকল্পিত চিন্তাও জরুরি। ভূখাণ্ডিকভাবে বাংলাদেশ ছোট আয়তনের একটি দেশ, অথচ জনসংখ্যা বিপুল। সবচেয়ে বড় কথা, জনসংখ্যা ক্রমেই বেড়ে চলছে। এ অবস্থায় সবার জন্য খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত করাটাও আমাদের জন্য একটি অনিবার্য বাস্তবতা। আর তার জন্য চাই কৃষিজমি ও পরিবেশ সুরক্ষা। কৃষিজমি ও প্রাকৃতিক সংহতি রক্ষা করা না গেলে ক্রমবর্ধিষ্ণু জনসংখ্যার খাদ্য জোগানো কঠিন। আবার উন্নয়নের সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য অর্জনও আমাদের করতে হবে; শুধু কৃষির ওপর নির্ভর করে যা মোটেই সহজসাধ্য নয়। বৈশ্বিক অভিজ্ঞতায় দেখা গেছে, যে দেশ যত উন্নত, জাতীয় আয়ে শিল্পের অবদানও সেখানে ততটা বেশি। সংগত কারণে উন্নত দেশের স্বপ্নপূরণে শিল্পায়নে আমাদেরও যে আরো জোর দিতে হবে, তা নিয়ে দ্বিমতের সুযোগ নেই। তবে এক্ষেত্রে আর দশটা দেশের শিল্পায়ন প্রক্রিয়া বা নীতি নির্বিচারে অনুসরণ করলে হবে না। এ-সম্পর্কিত নীতি-পরিকল্পনার বিন্যাসে নিজস্ব ভৌগোলিক বৈশিষ্ট্য ও আনুষঙ্গিক বিষয় অবশ্যই আমলে নিতে হবে। ছোট ও একটি বদ্বীপভিত্তিক দেশ হওয়ায় এখানে প্রাকৃতিক ভারসাম্যের বিষয়টি একান্তভাবে অপরিহার্য। প্রধানমন্ত্রী এটি গভীরভাবে অনুধাবন করে সাম্প্রতিক এক বৈঠকে শিল্পায়নের বিকাশের সঙ্গে সঙ্গে কৃষিজমি ও পরিবেশ রক্ষার বিষয়টি নিশ্চিত করার নির্দেশ দিয়েছেন। আলোচ্য নির্দেশ বাস্তবায়নে শিল্প মন্ত্রণালয়সহ সংশ্লিষ্ট সরকারি কর্তৃপক্ষগুলোর সক্রিয়তা প্রত্যাশিত।
সরকারের সর্বোচ্চ পর্যায়ে বর্তমানে পরিবেশ-প্রতিবেশ ব্যবস্থা সুরক্ষায় সদিচ্ছা দেখা যাচ্ছে। পরিবেশ দূষণের কারণে হাজারীবাগের ট্যানারি সাভারে নেয়া হয়েছে। পরিবেশবান্ধব চামড়ানগরী গড়ে তোলা হয়েছে। ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা রাসায়নিক, প্লাস্টিক ও হালকা প্রকৌশল শিল্পের জন্য পৃথক শিল্পনগরী গড়ে তোলা হয়েছে। পরিকল্পিতভাবে গড়ে তোলা হচ্ছে ১০০টি বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল। এরই মধ্যে বেশ কয়েকটি প্রস্তুত হয়েছে। সেখানে শিল্প-কারখানাগুলোর জন্য প্লট বরাদ্দ চলমান রয়েছে। এগুলো নিঃসন্দেহে সঠিক নির্দেশনার পদক্ষেপ। তবে কেবল সরকারি অঙ্গীকারেই পরিবেশবান্ধব শিল্পায়ন নিশ্চিত করা কঠিন। শিল্পোদ্যোক্তাদেরও এক্ষেত্রে অগ্রণী ভূমিকা রাখতে হবে বৈকি। অতীতে দেখা গেছে, বিনিয়োগকারীরা নিয়ম-নীতি উপেক্ষা করে পরিশোধন ছাড়াই শিল্পবর্জ্য নিষ্কাশন করেছে। ফলে মারাত্মকভাবে পরিবেশ দূষণ ঘটেছে। ভবিষ্যতে এ ধরনের প্রবণতা তাদের পরিহার করতে হবে। পরিবেশ সুরক্ষায় দেশে আইনের ঘাটতি নেই। যথেষ্ট সহায়ক আইন-বিধি রয়েছে। কিন্তু প্রয়োগের ক্ষেত্রে বরাবরই শিথিলতা লক্ষ করা গেছে। সংশ্লিষ্ট দায়িত্বশীল সংস্থা ও প্রতিষ্ঠানের দিক থেকে আকস্মিক অভিযানের ভিত্তিতে তাত্ক্ষণিক কিছু আর্থিক জরিমানামূলক পদক্ষেপের বাইরে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণের দৃষ্টান্ত দেখা যায়নি। কাজেই পরিবেশবান্ধব শিল্পায়ন নিশ্চিতে আইন প্রয়োগে আরো কঠোরতা অবলম্বন জরুরি।
সন্দেহ নেই, শিল্পায়ন বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্য জীবনসঞ্চারী একটি অনুষঙ্গ। একই সঙ্গে বাংলাদেশ বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাতে সবচেয়ে নাজুক দেশের একটিও। এর মধ্যে দেশে শিল্পদূষণ অব্যাহত থাকলে জলবায়ুগত ঝুঁকি আরো যে বাড়বে, তা সহজেই অনুমেয়। তাই সেটিও বিবেচনায় রাখতে হবে। সনাতনী শিল্পায়নের বিপরীতে অনেক দেশই এখন সবুজ শিল্পায়নে ঝুঁকছে। ওইসব দেশে পরিবেশ দূষণ রোধে শিল্প ক্ষেত্রে নতুন নতুন প্রযুক্তি প্রবর্তিত হচ্ছে। আমাদেরও সে পথেই যেতে হবে। বিভিন্ন দেশের উত্তম চর্চাগুলো আমাদের শিল্প খাতে প্রবর্তন করতে হবে, অত্যাধুনিক প্রযুক্তির সন্নিবেশ ঘটাতে হবে। সরকার, উদ্যোক্তা ও দায়িত্বশীল কর্তৃপক্ষের সম্মিলিত প্রয়াসে দেশে পরিবেশবান্ধব শিল্পায়ন নিশ্চিত হবে, এটিই প্রত্যাশা।










