কোথাও শিশুর জন্য নিরাপদ বাসযোগ্য পরিবেশ আবার কোথাও শিশুর জন্য অপেক্ষা করে যুদ্ধ। এসব শিশু তো জানেও না তারা কোন পাপের শিকার। দারিদ্র্য এবং অভাবের কারণে এই পার্থক্য গড়ে ওঠে। এসব দেশের শিশুরা ঝুঁকিপূর্ণ এবং মারাত্মক ঝুঁকিপূর্ণ কাজ করে। রাষ্ট্রের একটা দায়িত্ব থাকে এসব শিশু যাতে ভারী এবং ঝুঁকিপূর্ণ কাজ না করে এবং সে বিষয়ে আইনও থাকে; কিন্তু বাস্তব পরিস্থিতি ভিন্ন। অভাব না তো আইন দিয়ে আটকানো যায় আর না তো উপদেশ দিয়ে। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই পেটের জ্বালা মেটানোর জন্যই তারা কাজে নামে। আমাদের দেশের প্রেক্ষাপটে শিশুরা গাড়ি ঠেলা, পাথর ভাঙা থেকে শুরু করে মাল টানা, ওয়েল্ডিং কারখানায় কাজ করে। এসব ঝুঁকিপূর্ণ কাজের অনুমোদন না থাকলেও আসলে কিছুই করার নেই। সচেতনতাও এক্ষেত্রে তেমন কিছু করতে পারে না যদি অভাব দূর না হয়। আগে পেট তারপর অন্যান্য সুযোগের প্রশ্ন আসে।

শিশুদের মধ্যে আবার শ্রমজীবী ও পথশিশুরা সবচেয়ে কষ্টে আছে। এই দুঃসময়ে সবচেয়ে খারাপ অবস্থায় আছে পথশিশুরা। প্রতিটি শিশুকে যখন বাড়িতে রাখার কথা বলা হচ্ছে, তাদের সুরক্ষার কথা বলা হচ্ছে- তখন এই শিশুদের সুরক্ষার নিশ্চয়তা বিধান কে করবে? শ্রমজীবী ও পথশিশুদের জন্য নভেল করোনাভাইরাস এক বিরাট ধাক্কা। এই ধাক্কা যে কেবল এই কয়েকদিনেই শেষ হবে তা বলা যায় না। তাদের অধিকাংশই নিদারুণ কষ্টে আছে।

পথ শিশুরা নূন্যতম শিক্ষা, স্বাস্থ্য পুষ্টিসহ নানা সুযোগ-সুবিধা থেকে বঞ্চিত। তারা খোলা আকাশ, পার্ক, ফুটপাত, রেলস্টেশন, ফেরিঘাট লঞ্চ টার্মিনাল কিংবা বাসস্টেশনে থাকে। রাজধানীর কমলাপুর রেলস্টেশন, বিমানবন্দর রেলস্টেশন, টঙ্গী রেলস্টেশন, হাইকোর্ট মাজার, সোহরাওয়ার্দী উদ্যান, রমনা পার্ক, পলাশী মোড়, দোয়েল চত্বর, চানখাঁরপুল, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস, শহীদ মিনার, ঢাকা মেডিকেল, গাবতলী, সদরঘাট ও বিভিন্ন ফুট ওভারব্রিজ এলাকায় তাদের বসবাস।

কেবল দরিদ্রতার কারণেই পথশিশু বাড়ছে না বরং এর পেছনে আরও অনেক কারণ রয়েছে। পরিচয়হীন, ঠিকানাবিহীন শিশুদেরও আশ্রয় হচ্ছে পথে। বড় হয়ে ওঠার সঙ্গে সঙ্গে এসব শিশু পেটের ক্ষুধা মেটাতে নানারকম কাজ বেছে নেয়। এসব কাজের মধ্যে রয়েছে হকার, শ্রমিক, রিকশাচালক, ফুল বিক্রেতা, আবর্জনা সংগ্রাহক, হোটেল শ্রমিক, বুনন কর্মী, কুলি, বিড়ি শ্রমিক, ঝালাই কারখানার শ্রমিক ইত্যাদি বিভিন্ন রকম ঝুঁকিপূর্ণ কাজ যা আমরা আমাদের চারদিকে তাকালেই এর বাস্তবতা টের পাই। কেবল পেটের ক্ষুধা মেটানোই এদের কাছে মুখ্য বিষয় হয়ে দাঁড়ায়।

সোশ্যাল অ্যান্ড ইকোনমিক এনহান্সমেন্ট প্রোগ্রামের (সিপ) এক প্রতিবেদনে জানা যায়, পথশিশুদের প্রায় ৪৪ শতাংশ মাদকাসক্ত, ৪১ শতাংশ শিশুর ঘুমানোর কোনো বিছানা নেই, ৪০ শতাংশ গোসল করতে পারে না, ৩৫ শতাংশ খোলা জায়গায় মলত্যাগ করে, ৫৪ শতাংশ অসুস্থ হলে দেখার কেউ নেই এবং ৭৫ শতাংশ শিশু অসুস্থ হলে চিকিৎসকের সঙ্গে কোনো যোগাযোগ করতে পারে না। অন্য এক গবেষণায় বলা হয়েছে, ৩৪ দশমিক ৪ শতাংশ শিশু কোনো স্থানে সর্বোচ্চ ছয় মাস থাকে। তাদের মধ্যে ২৯ শতাংশ শিশু আইন প্রয়োগকারী সংস্থার কারণে স্থান পরিবর্তন করে। আর নিরাপত্তাকর্মীদের কারণে স্থান ত্যাগ করে ৩৩ শতাংশ শিশু। খোলা আকাশের নিচে ঘুমানোর পরও তাদের মধ্যে ৫৬ শতাংশ শিশুকে মাসিক ১৫০ থেকে ২০০ টাকা নৈশপ্রহরী ও মাস্তানদের দিতে হয়। তারা পুলিশি নির্যাতন ও গ্রেপ্তারেরও শিকার হয়।

করোনার সংক্রমণ ঠেকাতে ঘরে থাকা, স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলা ও সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখার ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। এ অবস্থায় ঘরহীন পথশিশুরা দলবেঁধে ঘুরছে, খেলছে। রেলস্টেশন বাস টার্মিনাল, কোনো ভবনের নিচে জটলা করছে, পাশাপাশি ঘুমাচ্ছে। ক্ষুধার্ত পথশিশুরা খাদ্যের জন্য ছোটাছুটি করছে। শিশুদের নিয়ে কাজ করছেন এমন ব্যক্তিরা বলছেন, পথশিশুরা যেমন স্বাস্থ্যঝুঁকিতে আছে, তেমনি এদের মাধ্যমে সংক্রমণ ছড়ানোর শঙ্কা রয়েছে।

স্ট্রিট চিলড্রেন অ্যাক্টিভিস্টস নেটওয়ার্ক (স্ক্যান)করোনার শুরুর দিকে ৪৫২ জন পথশিশুদের উপর জরিপ করে জানায়, তাদের কেউই মাস্ক ব্যবহার করে না৷ তারা মনে করে, করোনা ধনীদের রোগ, এটা গরিবদের হয় না৷ করোনা সম্পর্কে অসচেতন এই শিশুরা নিয়মিত খাবারও পায় না৷ অনেকে খাবার বিতরণ করলেও পথ শিশুরা তা সবসময় পায় না৷ তাদের কাজ নেই৷ তাদের কেউ কোভিড আক্রান্ত কিনা তা-ও তারা বুঝতে পারে না৷ তারা মনে করে, সর্দি হয়েছে৷

এক তথ্যে দেখা যায়, বিশ্বে ৮৪ মিলিয়ন শিশুশ্রমের সঙ্গে জড়িত। যার ৫৬ শতাংশ বাস করে মধ্যম আয়ের দেশে এবং ২ মিলিয়ন বাস করে উচ্চ আয়ের দেশে। করোনাকালেও শিশুরা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে বেশি। এ কারণে শিশুদের আরও ঝুঁকিপূর্ণ কাজের দিকে ঠেলে দিতে পারে। ২০২১ সালে শিশুশ্রম নির্মূলের আন্তর্জাতিক বর্ষ নির্ধারণ করা হয়। ক্ষেত্রবিশেষে তারা বেশিরভাগই নিজের ইচ্ছার বিরুদ্ধে এ কাজ করছে। এর প্রধান কারণ অবশ্য দারিদ্র্য। করোনাকালে দারিদ্র্য বৃদ্ধি পেয়েছে। এর ফলে শিশুশ্রম বৃদ্ধি পাওয়ার আশঙ্কা সৃষ্টি হয়েছে। 

করোনা সংকটে সবচেয়ে দুঃসহ পরিস্থিতি পার করছে পথশিশুরা। লকডাউনের সময় তাদের অবস্থা মারাত্নক সূচনীয় অবস্থায় ছিল। সড়কের পাশেই রাত্রিযাপন। দল বেঁধে খাবার সংগ্রহ। স্বাস্থ্যবিধি মানা যাদের কাছে উপহাস মাত্র। চলমান করোনা পরিস্থিতিতে সংক্রমণের উচ্চ ঝুঁকিতে রয়েছে এসব পথশিশু। দেশে ছিন্নমূল এসব শিশুর পরিসংখ্যানগত সঠিক কোনো তথ্য না থাকলেও শহরে তিন থেকে চার লাখ পথশিশু রয়েছে বলে বিভিন্ন গবেষণা সংস্থার প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। নগরীর বিভিন্ন স্থান ঘুরে খাবার সংগ্রহ করে তারা। করোনা পরিস্থিতিতে চরম খাদ্য সংকটে পড়েছে এ সুবিধাবঞ্চিতরা। বাস টার্মিনাল, রেলস্টেশন ও লঞ্চঘাটে কুলির কাজ করত অনেক শিশু। করোনার কারণে আশ্রয়কেন্দ্রগুলো বন্ধ। সেইসঙ্গে বন্ধ রয়েছে তাদের নিয়ে কাজ করা এনজিও সংস্থাগুলোর শিক্ষা কার্যক্রমও। ফলে খাবার না পেয়ে শহরের অলিগলিতে ঘুরে বেড়াচ্ছে এসব পথশিশু। 

পথশিশুদের একটি বড় অংশ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের উপর নির্ভরশীল হয়ে চলত। প্রায় বছর খানেক হতে চলেছে সব ধরনের শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ। কিন্ডারগার্টেন, কোচিং সেন্টার, সারকারী-বেসরকারী স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী, অভিভাবক ও শিক্ষকদের দান খয়রাত ও তাদের বিভিন্ন ফরমায়েশে বহু পথশিশুর জীবন জীবীকা চলত। কিন্তু দীর্ঘমেয়াদী শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকায় এসব পথশিশুদের আয়ের পথ বন্ধ হয়ে গেছে। ফলে তাদের জীবীকা নির্বাহ আরো কষ্টকর হয়েছে।

২০১৫ সালের ইউনিসেফের এক পরিসংখ্যানে দেখা যায়, দেশে পথশিশুর সংখ্যা ১০ লাখ। এর মধ্যে রাজধানী ঢাকায় ছিল আড়াই লাখের বেশি। যদিও বর্তমান সময়ে এ সংখ্যা ২০ থেকে ২৫ লাখ বলে দাবি করছে অনেক সংগঠন। শিশু বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ‘পথশিশুসহ ছিন্নমূল সব মানুষই সংক্রমিত হওয়ার পাশাপাশি করোনাভাইরাসের বাহক হওয়ার ঝুঁকিতে আছে। কারণ তাদের মধ্যে স্বাস্থ্যসুরক্ষার জ্ঞানের অভাব রয়েছে। নেই সুরক্ষাসামগ্রী কেনার মতো টাকা।’

হোটেল-রেস্টুরেন্টের উচ্ছৃষ্ট খাবারের একটি অংশ খেয়ে জীবন ধারণ করে পথশিশুর বড় একটি অংশ। অনেকের স্টেশনে বা লঞ্চঘাটে কুলি-মজুরের কাজ বা ফেরি করে কিছুটা আয় হতো। অথবা শপিংমল, অফিস-আদালত, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে কর্মরত সচ্ছল মানুষদের দান-দক্ষিণায় চলে যেত এদের দিন।

কিন্তু এখন নেই হোটেল-রেস্টুরেন্টের রমরমা ব্যবসা। শপিংমলেও ক্রেতাদের ভিড় কমে গেছে। পথে আগের মতো নেই সচ্ছল মানুষের ব্যাপক চলাফেরা। তাই এই মানুষদের কপালে জোটে না উচ্ছিষ্ট খাবার। মেলে না ছোট-খাটো কোনো কাজও। গাড়ির কাছে গেলে করোনার ভয়ে কেউ খোলে না গ্লাস। দূর দূর করে তাড়িয়ে দেন হোটেলের কর্মচারী ও মালিকরা। পথে হাঁটা অধিকাংশ সচ্ছল ব্যক্তিও এখন আর তাদের দান করে না। কাছে গেলেই তাড়িয়ে দেয়। ফেলে দেওয়া জিনিসপত্র এখন আগের মতো পাওয়া যায় না। যা পাওয়া যায় তাতে এক বেলা খাওয়াও জোটে না। তাই এদের অধিকাংশই কখনো খেয়ে বা না খেয়ে স্টেশনের প্লাটফরমে, রাস্তায়, ফুটপাতে, পার্কে বা খোলা স্থানে ঘুমিয়ে পড়ে। ঘুম ভাঙলে এদের একটাই চিন্তা খাব কি?

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজিক বিজ্ঞান অনুষদের ডিন অধ্যাপক ড. সাদেকা হালিম বলেন, ‘করেনাকালে পথশিশুদের প্রতি সমাজ ও রাষ্ট্রের যতটা দায়িত্বশীল মানবিক হওয়ার কথা ছিল; তা হতে পারেনি। এদের অনেকে খাবার না পেয়ে ছোট-খাটো অপরাধে যুক্ত হয়ে যেতে পারে। এমনটি হতে থাকলে এটা সুষ্ঠু সমাজ গঠনেও বিরূপ প্রভাব ফেলবে। এ দায় রাষ্ট্রকেই নিতে হবে।’ তিনি আরো বলেন, ‘নারী ও শিশু মন্ত্রণালয় এদেরকে নিয়ে এই মহামারিকালে তেমন কোনো কাজ করছে না। এমনকি বেসরকারি সংগঠনগুলোও অনেক বেশি এগিয়ে আসছে না।’ তিনি আরো বলেন, ‘কয়েকটি জোনে ভাগ করে পথশিশু ও ছিন্নমূল মানুষের তালিকা করা যেতে পারে। স্বেচ্ছাসেবক নিয়োগের মাধ্যমে সরকার এদের সাহায্য করতে পারে।’

এদের মধ্যে অনেকেই তাই একটু ভালোভাবে বাঁচার আশায় না বুঝেই অপরাধমূলক কার্যক্রমে জড়িয়ে পড়ে। আমরা যদি তাদের জন্য ভালোভাবে বাঁচার সুযোগ রাখি তারা নিশ্চয় অপরাধীদের কথায় প্রভাবিত হবে না। সমাজ থেকে অপরাধের মাত্রা অনেকটা কমে আসবে।

পথশিশুদের সুরক্ষায় জরুরি ভিত্তিতে পদক্ষেপ নিতে হবে। এই মুহূর্তে রাজধানীর বিভিন্ন এলাকা থেকে পথশিশুদের উদ্ধার করে সমাজসেবা অধিদপ্তরের অধীনে পরিচালিত হোমগুলোতে আশ্রয় দেওয়া যেতে পারে। এ ছাড়া মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয় পরিচালিত পথশিশু পুনর্বাসন কার্যক্রম কর্মসূচির আওতাধীন সেন্টার এবং বিভিন্ন এনজিও পরিচালিত সেন্টার বা হোমগুলোতেও রাখা যেতে পারে।' উদ্ধারের পর তাদের স্বাস্থ্য পরীক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত, আশ্রয়স্থলে খাদ্যসহ প্রয়োজনীয় উপকরণ সরবরাহ এবং মনোসামাজিক কাউন্সেলিং সেবা দেয়া যেতে পারে।

শীত শুরু হয়েছে, সেসাথে শুরু হয়েছে করোনার দ্বিতীয় ঢেউ।শীত শুরু হওয়ার সাথে সাথে করোনাও বৃদ্ধি পাচ্ছে। শীতকাল পথশিশুদের জন্য সবচেয়ে কষ্টের সময়।এসব শিশুদের মধ্যে শীত কষ্টের সাথে সংক্রমণও বেড়ে যাওয়ার আশংকা করা হচ্ছে। পথশিশুরা করোনায় আক্রান্ত হলে তারা যেহেতু টেস্ট করাতে পারেনা তাই বুঝতেও পারেনা তারা কোন ধরনের রোগে আক্রান্ত। ফলে একজন আক্রান্ত হলে তার সংম্পর্সে আরো অনেকে আক্রান্ত হতে পারে। মনে রাখতে হতে ওরা আমাদেরই সন্তান, দেশের নাগরিক। তাই সরকার, বিভিন্ন এনজিও, দাতা সংস্থা ও দেশের বিত্তবানদের জরুরী ভিত্তিতে এসব অসহায় পথশিশুদের পাশে এগিয়ে আসা উচিত।
লেখকঃ ব্যাংক কর্মকর্তা
ইমেইলঃ ma_masum@yyahoo.com