সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশের অর্থনীতি বিশ্বের অন্যতম দ্রুতবর্ধনশীল ও উচ্চপ্রবৃদ্ধি অর্জনকারী দেশ হিসেবে বিশ্ববাসীর দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে। বিশ্বের বিভিন্ন নির্ভরযোগ্য গবেষণা সংস্থা কর্তৃক উদীয়মান অর্থনৈতিকভাবে শক্তিশালী রাষ্ট্র ক্লাবের সদস্য হিসেবে বাংলাদেশের নাম কয়েক বছর ধরেই আলোচিত হচ্ছে। গোল্ডম্যান স্যাকসের মতে, বাংলাদেশে বিনিয়োগের ক্ষেত্রে বিদ্যুৎ, জ্বালানি, সিমেন্ট ও টেলিযোগাযোগ খাত বিনিয়োগের জন্য সবচেয়ে সম্ভাবনাময় ক্ষেত্র এবং নাউট ফ্রাঙ্ক ও সিটি গ্রুপ কর্তৃক যৌথভাবে প্রণীত ‘দ্য ওয়েলথ রিপোর্ট ২০১২’ প্রতিবেদনে বিশ্বের সম্পদপ্রবাহ ও সম্ভাব্য বিনিয়োগের মাধ্যমে ২০৫০ সালের মধ্যে দ্রুত প্রবৃদ্ধি অর্জনে প্রথম চারটি দেশের মধ্যে নাইজেরিয়া, ভারত ও ইরাকের পরই বাংলাদেশের অবস্থান। কভিডের সময় যেখানে উন্নত দেশগুলো অর্থনীতি সচল রাখতে হিমশিম খাচ্ছে, সেখানে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ছিল ইতিবাচক। এর বিপরীতে বাংলাদেশে মজুরি সবচেয়ে কম। আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার গবেষণার বরাত দিয়ে গণমাধ্যমে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এশিয়া প্যাসিফিক অঞ্চলের দেশগুলোর মধ্যে ন্যূনতম মজুরি সবচেয়ে কম বাংলাদেশে। শুধু তা-ই নয়, এ অঞ্চলের মধ্যে একমাত্র বাংলাদেশেই ন্যূনতম মজুরি আন্তর্জাতিক দারিদ্র্যসীমার সবচেয়ে নিচের স্তরের চেয়েও কম।
অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে মাথাপিছু জাতীয় আয়ও বাড়েছে। কিন্তু এর সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণভাবে বাড়েনি মজুরি। এমনকি মূল্যস্ফীতির সঙ্গেও মজুরি বৃদ্ধির হার সামঞ্জস্যপূর্ণ নয় বলে বিভিন্ন গবেষণায় উঠে এসেছে। তথ্য-উপাত্ত বলছে, এ সময়ে কৃষিতে মজুরি বেড়েছে বেশি। কারণ এখানে শ্রমিকের চাহিদার চেয়ে জোগান কম। অন্যদিকে শিল্প খাতে দক্ষ শ্রমিকের অভাব দৃশ্যমান। আমরা যদি কর্মসংস্থানের স্তরকে পিরামিড হিসেবে বিবেচনা করি, তাহলে দেখা যায়, নিচের দিকে শ্রমিকের মুজরি কম। কিন্তু ওপরের দিকে শ্রমিকের মজুরি বেশি। নিচে শ্রমিকের সংখ্যা বেশি হওয়ায় গড় মজুরি কমে যাচ্ছে। এক্ষেত্রে দক্ষতা-সক্ষমতা বৃদ্ধির মাধ্যমে পিরামিডের ওপরের স্তরে শ্রমিকের উত্তরণ নিশ্চিত করা প্রয়োজন। শিল্পে এখনো প্রচুর বিদেশী কাজ করছেন। কারণ সেখানে দক্ষ স্থানীয় শ্রমের জোগান মিলছে না। তাদের স্থান অধিকারে দেশীয় শ্রমিকের দক্ষতা বাড়ানোর বিকল্প নেই। শিল্পে একদিকে দক্ষ শ্রমিকের সংকট রয়েছে, অন্যদিকে মজুরি কম। এটি বিপরীতমুখী। কিছু কিছু ক্ষেত্রে দেখা যাচ্ছে, শ্রমের চাহিদা রয়েছে এবং মজুরিও বেশি, কিন্তু দক্ষ লোক পাওয়া যাচ্ছে না। আবার নিচের দিকে কম মজুরিতে প্রচুর অদক্ষ শ্রমিক মিলছে। এক্ষেত্রে চাহিদা ও জোগানের মধ্যে ভারসাম্য বিধান জরুরি। দক্ষ শ্রমিকের অভাবে শিল্পের বিকাশও বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। তাই দক্ষ জনবল তৈরি ও আনুষ্ঠানিক খাতে শিল্পায়নে জোর দিতে হবে। অভিযোগ রয়েছে, দক্ষ জনবল তৈরি না হওয়ায় আনুষ্ঠানিক খাত বড় হচ্ছে না। এক্ষেত্রে প্রশিক্ষণ বৃদ্ধি ও শিক্ষা কারিকুলামে পরিবর্তন আনা আবশ্যক। মজুরি বৃদ্ধি না পাওয়ার অন্যতম কারণ কাঠামোগত ত্রুটি। দেশে শ্রমের জোগান বেশি হলেও চাহিদা অনুযায়ী দক্ষ শ্রমিক পাওয়া যাচ্ছে না। আবার শ্রমের উৎপাদশীলতার দিক থেকেও বাংলাদেশের শ্রমিকের অবস্থান তলানিতে। এক্ষেত্রে শিল্প ও শ্রমিকের উভয়ের জন্য উইন উইন অবস্থা নিশ্চিত করতে হলে দক্ষ ও উৎপাদশীল শ্রমের সরবরাহ যেমন বাড়াতে হবে, তেমনি আনুষ্ঠানিক খাতের সম্প্রসারণও ঘটাতে হবে। পাশাপাশি শ্রমিকের পদোন্নতিও নিশ্চিত করতে হবে। যে চাকরিগুলোতে মজুরি বেশি কিন্তু বিদেশীরা কাজ করছেন সে স্থান স্থানীয় শ্রমিক দিয়ে পূরণে সংশ্লিষ্ট কাজে দক্ষতা বৃদ্ধির উদ্যোগ নিতে হবে।
শ্রমিকের ন্যূনতম মজুরি বাড়াতে আনুষ্ঠানিক খাতে শ্রমিকের অংশগ্রহণ বাড়াতে হবে। বাংলাদেশের শ্রমবাজারের বড় অংশ এখন অনানুষ্ঠানিক খাতে নিয়োজিত, যেখানে ন্যূনতম মজুরির কোনো অস্তিত্ব নেই। কোনো চুক্তিও নেই, তাদের অধিকার রক্ষায় সরকারের তদারকি প্রতিষ্ঠানও আইনের সীমাবদ্ধতার কারণে ভূমিকা রাখতে পারে না। মজুরি বাড়াতে হলে শ্রমিকের দক্ষতা-উৎপাদনশীলতাও বাড়াতে হবে। বর্তমানে একটি বা দুটি শিল্পে শ্রমের ঘনত্ব বেশি। পরিস্থিতির পরিবর্তনে শিল্পেরও বৈচিত্র্যকরণ দরকার। একটি বা দুটি শিল্পনির্ভর থেকে শ্রমবাজারকে বের করে আনতে নতুন নতুন শিল্প সৃষ্টিতে দৃষ্টি দিতে হবে। এক্ষেত্রে সম্ভাবনমায় শিল্প চিহ্নিতপূর্বক তাদের বিকাশে সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা বাড়াতে হবে। বাংলাদেশে ট্রেড ইউনিয়নগুলো দুর্বল এবং তাদের অধিকারও সীমিত। সেখানে প্রকৃত শ্রমিকের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে, যাতে মজুরি নির্ধারণের সময় শ্রমিক সংগঠনগুলো সর্বোচ্চ ভূমিকা রাখতে পারে। সর্বোপরি, অর্থনৈতিক উন্নয়নের সঙ্গে শ্রমিকের মুজরি সামঞ্জস্যপূর্ণ করতে হলে আনুষ্ঠানিক শিল্প খাত বড় এবং শ্রমিকের দক্ষতা-উৎপাদনশীলতা বাড়াতে হবে।










