কয়েক দশকের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে উত্তেজনা। তবে এ বৈরিতার শুরু ১৯৭৯ সালে। সে সময় আয়াতুল্লাহ রুহুল্লাহ খোমেনির নেতৃত্বে ইসলামি বিপ্লবের মাধ্যমে পশ্চিমাপন্থী শাহ মোহাম্মদ রেজা পাহলভি ক্ষমতাচ্যুত হন। এরপর থেকেই বড় আঞ্চলিক প্রতিপক্ষ হয়ে উঠেছে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র। দুই দেশের মধ্যে দ্বন্দ্ব ঘনীভূত হয়েছে পারমাণবিক কর্মসূচি, আঞ্চলিক মিলিশিয়াদের সমর্থন ও মার্কিন হস্তক্ষেপসহ নানা ইস্যুতে।
বহুদিন ধরেই ইরানকে হুমকি হিসেবে দেখা ইসরায়েল সম্প্রতি অভিযোগ তোলে, পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করছে তেহরান। এই অভিযোগের ভিত্তিতে গত সপ্তাহে ইরানের অভ্যন্তরে নজিরবিহীন হামলা চালায়। এই অভিযোগের পক্ষে কোনো নিরপেক্ষ বা বিশ্বাসযোগ্য প্রমাণ না থাকা সত্ত্বেও ইসরায়েলের পক্ষে সংঘাতে জড়ায় যুক্তরাষ্ট্র।
এ হামলার পর পাল্টা প্রতিশোধের হুঁশিয়ারী দিয়েছে তেহরান। এই দুইদেশের বৈরিতার সময়রেখা বর্ণনা করেছে আল জাজিরা।
১৯৫৩: সিআইএ-সমর্থিত অভ্যুত্থান ও শাহের পুনর্বহাল
১৯৫১ সালে ইরানের প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হন মোহাম্মদ মোসাদ্দেক। ক্ষমতায় বসে ব্রিটিশ নিয়ন্ত্রিত অ্যাংলো-ইরানিয়ান অয়েল কোম্পানি জাতীয়করণ করতে গেলে ব্রিটেন ক্ষুব্ধ হয়। যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যের সহায়তায় সিআইএ-র এক গোপন অভ্যুত্থানে মোসাদ্দেককে উৎখাত করে ক্ষমতায় বসানো শাহ পাহলভিকে।
১৯৫৭: অ্যাটমস ফর পিস কর্মসূচি
বিদ্যুৎ উৎপাদনে পারমাণবিক শক্তি ব্যবহারে আগ্রহী ছিলেন শাহ পাহলভি, আর তার এই পরিকল্পনায় সমর্থন দেয় যুক্তরাষ্ট্র। প্রেসিডেন্ট ডুইট আইজেনহাওয়ারের অ্যাটমস ফর পিস কর্মসূচির আওতায় উভয় দেশ বেসামরিক পারমাণবিক শক্তির জন্য চুক্তি করে। এক দশকের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র ইরানকে পারমাণবিক রিয়্যাক্টর ও ইউরেনিয়াম সরবরাহ করে।
১৯৭৯:ইসলামি বিপ্লব
তবে শাহের দমন-পীড়ন ও পশ্চিমা প্রভাবের বিরুদ্ধে ১৯৭৮ সালে ইরানজুড়ে বিক্ষোভ শুরু হয়। বিক্ষোভের মুখে দেশ ত্যাগ করেন শাহ পাহলভি। সেসময় দেশে ফিরে এসে ইসলামি প্রজাতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করেন নির্বাসিত ধর্মীয় নেতা আয়াতুল্লাহ খোমেইনি।
১৯৮০: যুক্তরাষ্ট্র কূটনৈতিক সম্পর্ক ছিন্ন করে
দেশ থেকে বিতাড়িত শাহকে চিকিৎসার জন্য আশ্রয় দেয় যুক্তরাষ্ট্র। এতে তেহরানের মার্কিন দূতাবাসে ঢুকে ৫২ জনকে জিম্মি করে ইরানি বিপ্লবীরা। প্রতিক্রিয়ায় যুক্তরাষ্ট্র ইরানের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক ছিন্ন করে এবং নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে।
১৯৮০-৮৮: ইরান-ইরাক যুদ্ধ ও যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকা
১৯৮০ সালে খোমেনির ইসলামি বিপ্লবের প্রভাব ঠেকাতে ইরানে হামলা চালান ইরাকের সাদ্দাম হোসেন। এতে যুক্তরাষ্ট্র ইরাককে সমর্থন করে। এই যুদ্ধে হাজার হাজার মানুষ নিহত হয়, ইরাকের রাসায়নিক অস্ত্রের শিকার হয় ইরান।
১৯৮৪: ইরানকে‘সন্ত্রাসের পৃষ্ঠপোষক রাষ্ট্র’ হিসেবে চিহ্নিত
১৯৮৪ সালে মার্কিন প্রেসিডেন্ট রোনাল্ড রেগান ইরানকে আনুষ্ঠানিকভাবে ‘সন্ত্রাসবাদের পৃষ্ঠপোষক রাষ্ট্র’ হিসেবে ঘোষণা দেন। এর পেছনে ছিল লেবানন ও ইসরায়েলের সংঘাত। সেসময় ইসরায়েলের সাথে যুক্তরাষ্ট্রও সংঘাতে জড়িয়ে পড়ে। এই হামলাগুলোর মধ্যে সবচেয়ে ভয়াবহ ছিল বৈরুতে একটি মার্কিন সামরিক ঘাঁটিতে বোমা হামলা, যাতে ২৪১ জন মার্কিন সেনা নিহত হন। যুক্তরাষ্ট্র এই ঘটনার জন্য হিজবুল্লাহকে দায়ী করে। হিজবুল্লাহ ইরানের মদদপুষ্ট একটি লেবাননি শিয়া গোষ্ঠী।
তবে পরে রেগান প্রশাসন যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিকদের মুক্তির জন্য গোপনে ইরানের সঙ্গে আলোচনা চালায়। বিষয়টি ফাঁস হলে ‘ইরান-কনট্রা কেলেঙ্কারি’ নামে পরিচিত এই ঘটনা রেগান প্রশাসনের জন্য বড় ধরনের রাজনৈতিক বিতর্ক ও সমালোচনার কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
১৯৮৮: ইরান এয়ার ফ্লাইট ৬৫৫ ভূপাতিত
একটি মার্কিন যুদ্ধজাহাজ ইরানের আকাশসীমায় প্রবেশ করে একটি যাত্রীবাহী বিমানকে গুলি করে ভূপাতিত করে। এতে ২৯০ জন নিহত হন। এই ঘটনাকে যুক্তরাষ্ট্র ‘ভুল’ দাবি করলেও কখনো আনুষ্ঠানিক ক্ষমা চায়নি, তবে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারদের জন্য ৬ কোটি ১৮ লাখ ডলার ক্ষতিপূরণ দেয়।
১৯৯৫-৯৬: কঠোর নিষেধাজ্ঞা আরোপ
এই সময়কালে প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিনটন নির্বাহী আদেশ জারি করে যুক্তরাষ্ট্রের কোম্পানিগুলোকে ইরানের সঙ্গে বাণিজ্য করতে নিষেধ করেন। কংগ্রেসে আইন পাস করে, ইরানের জ্বালানি খাতে বিনিয়োগকারী বিদেশি কোম্পানিগুলোকে শাস্তির আওতায় আনে।
২০০২: ৯/১১ হামলা
৯/১১ হামলার পর এক ভাষণে ইরানকে ইরাক ও উত্তর কোরিয়ার সঙ্গে ‘অ্যাক্সিস অব ইভিল’ বলে উল্লেখ করেন প্রেসিডেন্ট জর্জ ডব্লিউ বুশ।
২০১৩-১৫: পারমাণবিক চুক্তি
২০১৩ সালে ইরানের সঙ্গে উচ্চপর্যায়ের আলোচনার সূচনা করেন প্রেসিডেন্ট ওবামা। ২০১৫ সালে চীন, রাশিয়া, ফ্রান্স, জার্মানি, যুক্তরাজ্য ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে মিলে জয়েন্ট কম্প্রিহেনসিভ প্ল্যান অফ অ্যাকশন নামের চুক্তি স্বাক্ষর করে। যেখানে ইরান ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ ৩ দশমিক ৬৭ শতাংশে সীমিত রাখার প্রতিশ্রুতি দেয়।
২০১৮: ট্রাম্প চুক্তি থেকে বেরিয়ে যান
২০১৮ সালে ক্ষমতার প্রথম মেয়াদে জয়েন্ট কম্প্রিহেনসিভ প্ল্যান অফ অ্যাকশন একতরফাভাবে যুক্তরাষ্ট্রকে প্রত্যাহার করে নেন থেকে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প। সেইসঙ্গে ইরানের ওপর নতুন করে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেন। ইরানও পরবর্তী সময়ে চুক্তির শর্ত ভঙ্গ করে উচ্চমাত্রায় ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ শুরু করে।
২০২০: জেনারেল কাসেম সোলেইমানিকে হত্যা
২০২০ সালে ট্রাম্প প্রশাসন বাগদাদে ড্রোন হামলায় ইরানের এলিট কুদস ফোর্সের প্রধান কাসেম সোলেইমানিকে হত্যা করে। ইরান পাল্টা জবাবে ইরাকে মার্কিন ঘাঁটিতে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালায়।
২০২৫: ট্রাম্পের চিঠি ও গোপন আলোচনা
মার্চ মাসে ট্রাম্প ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনেইকে চিঠি পাঠিয়ে ৬০ দিনের মধ্যে নতুন পারমাণবিক চুক্তির প্রস্তাব দেন। চুক্তির খুব কাছাকাছি পৌঁছে যাওয়ার দাবিও করেন ট্রাম্প। জানান, ইসরায়েলকে ইরান আক্রমণ না করতে সতর্ক করেছেন তিনি। যদিও তার হুমকি আমলে না নিয়ে হামলা চালায় তেল আবিব।
২০২৫: যুক্তরাষ্ট্রের বিমান হামলা
ট্রাম্প প্রশাসন যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় নিরাপত্তা ও ইসরায়েলের প্রতিরক্ষার দোহাই দিয়ে ইরানের তিনটি গুরুত্বপূর্ণ পারমাণবিক স্থাপনায় বিমান হামলা চালায়।










