রাজধানী কারাকাসসহ দেশের উত্তরাঞ্চলের বিস্তীর্ণ এলাকায় বহুতল ভবন ধসে পড়েছে, ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে হাসপাতাল, সড়ক, সেতু ও বিমানবন্দর। দেশটির অন্তর্বর্তী সরকার এখন পর্যন্ত ১৮৮ জনের মৃত্যুর তথ্য নিশ্চিত করেছে। এখনো ধ্বংসস্তূপের নিচে হাজার হাজার মানুষ আটকে আছেন। মার্কিন ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থা (ইউএসজিএস) জানিয়েছে, দেশটিতে মৃতের সংখ্যা ১০ হাজার ছাড়িয়ে যেতে পারে।
বুধবার সন্ধ্যায় স্থানীয় সময় প্রায় ৬টার দিকে প্রথম ভূমিকম্পটি আঘাত হানে। ১ মিনিটেরও কম সময়ের মধ্যে দ্বিতীয় ও আরো শক্তিশালী কম্পন অনুভূত হয়। মাত্র ৩৯ সেকেন্ডের ব্যবধানে আঘাত হানা এ দুটি ভূমিকম্পের মধ্যে দ্বিতীয়টি ছিল ১৯০০ সালের পর ভেনিজুয়েলায় আঘাত হানা সবচেয়ে শক্তিশালী ভূমিকম্প। ভূমিকম্পের কেন্দ্র ছিল রাজধানী কারাকাস থেকে প্রায় ১৬০ কিলোমিটার পশ্চিমে সান ফেলিপের কাছে। তবে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে রাজধানী কারাকাস এবং উপকূলীয় লা গুয়াইরা অঞ্চল। জনবহুল এসব এলাকায় পরপর দুটি শক্তিশালী কম্পনের কারণে অসংখ্য ভবন ধসে পড়ে এবং হাজারো মানুষ ধ্বংসস্তূপের নিচে আটকা পড়েন। এরপর অন্তত ৩০টি আফটার শক অনুভূত হয়।
রাজধানী কারাকাসের বিভিন্ন এলাকায় ভারী যন্ত্রপাতি দিয়ে ধ্বংসস্তূপ সরানোর কাজ চলছে। উদ্ধারকর্মীরা কংক্রিটের স্তূপের নিচে জীবিত মানুষের সন্ধানে অনুসন্ধানী কুকুর, শব্দ শনাক্তকারী যন্ত্র এবং বিশেষ উদ্ধার সরঞ্জাম ব্যবহার করছেন। কোথাও কোথাও ধ্বংসস্তূপের নিচ থেকে মানুষের শব্দ পাওয়া যাওয়ায় ঘণ্টার পর ঘণ্টা ধরে একই স্থানে উদ্ধার অভিযান চালানো হচ্ছে। তবে ধারাবাহিক আফটার শক উদ্ধারকাজকে আরো ঝুঁকিপূর্ণ করে তুলেছে।
বর্তমানে রাজধানী কারাকাসের অনেক এলাকাই যেন যুদ্ধবিধ্বস্ত নগরীর চিত্র ধারণ করেছে। ধসে পড়া বহুতল ভবনের কংক্রিটের স্তূপ, ভাঙা বিদ্যুতের খুঁটি, ফেটে যাওয়া সড়ক, উল্টে থাকা গাড়ি এবং চারদিকে ছড়িয়ে থাকা ধ্বংসাবশেষের কারণে অনেক এলাকায় স্বাভাবিক চলাচল বন্ধ রয়েছে।
সবচেয়ে ভয়াবহ পরিস্থিতি লা গুয়াইরায়। সরকার এলাকাটিকে এরই মধ্যে ‘প্রাকৃতিক দুর্যোগ এলাকা’ ঘোষণা করেছে। এখানকার বহু আবাসিক ভবন সম্পূর্ণ ধসে পড়েছে। উদ্ধারকারীরা জানিয়েছেন, অনেক পরিবার পুরোপুরি ভবনের নিচে চাপা পড়েছে। ফলে প্রকৃত হতাহতের সংখ্যা নির্ধারণে সময় লাগবে।
উদ্ধারকাজে সেনাবাহিনী, দমকল, পুলিশ, সিভিল ডিফেন্স, স্বেচ্ছাসেবক এবং আন্তর্জাতিক উদ্ধারকারী দল অংশ নিয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় পৌঁছাতে ভারী ক্রেন, এক্সক্যাভেটর এবং বিশেষ উদ্ধারযন্ত্র ব্যবহার করা হচ্ছে। কিন্তু ধ্বংসস্তূপে আটকে থাকা মানুষের সংখ্যা এত বেশি যে উদ্ধার অভিযান ধীরগতিতে এগোচ্ছে। সরকারের পক্ষ থেকে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকেও ভারী যন্ত্রপাতি সরবরাহের আহ্বান জানানো হয়েছে, যাতে দ্রুত ধ্বংসস্তূপ সরিয়ে অনুসন্ধান চালানো যায়।
হাজার হাজার মানুষ ঘর ছেড়ে খোলা মাঠ, পার্ক, স্টেডিয়াম এবং সড়কের পাশে রাত কাটাচ্ছেন। ধারাবাহিক আফটার শকের কারণে কেউই ক্ষতিগ্রস্ত ভবনে ফিরতে সাহস করছেন না। বিভিন্ন স্কুল ও সরকারি ভবনকে অস্থায়ী আশ্রয় কেন্দ্রে রূপান্তর করা হয়েছে। সেখানে খাবার, বিশুদ্ধ পানি এবং প্রাথমিক চিকিৎসা দেয়া হলেও আশ্রয়প্রার্থীর সংখ্যা দ্রুত বাড়ছে। বিদ্যুৎ ও যোগাযোগ ব্যবস্থাও ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন রয়েছে। বেশির ভাগ স্থানে মোবাইল নেটওয়ার্ক অচল হয়ে পড়ায় পরিবারগুলো স্বজনদের সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারছে না। রাজধানীর আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের একটি রানওয়ে ফেটে যাওয়ায় এবং অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় নিয়মিত ফ্লাইট চলাচল বন্ধ রাখা হয়েছে। মেট্রো ও রেলসেবার বড় অংশও স্থগিত। বহু সড়ক ধ্বংসস্তূপে আটকে থাকায় ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় ত্রাণ ও উদ্ধারসামগ্রী পৌঁছাতে বিলম্ব হচ্ছে। মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও জানিয়েছেন, বিমানবন্দরের ক্ষতি সত্ত্বেও যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক সক্ষমতা ব্যবহার করে সেখানে জরুরি সহায়তা পৌঁছে দেয়ার প্রস্তুতি নেয়া হয়েছে।
কারাকাসের হাসপাতালগুলো আহত মানুষের ভিড়ে উপচে পড়ছে। কোথাও কোথাও হাসপাতালের ভবন ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় অস্থায়ী ফিল্ড হাসপাতাল স্থাপন করা হয়েছে। জরুরি বিভাগে চিকিৎসক ও নার্সরা টানা কাজ করছেন। রেড ক্রস জানিয়েছে, তাদের নিজস্ব অবকাঠামোও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তবু উদ্ধার ও চিকিৎসাসেবা অব্যাহত রয়েছে। সংস্থাটি বলেছে, ক্ষয়ক্ষতির প্রকৃত চিত্র এখনো জানা যায়নি এবং আফটার শক উদ্ধারকর্মীদের জন্যও বড় ঝুঁকি তৈরি করছে।
অন্তর্বর্তী প্রেসিডেন্ট ডেলসি রদ্রিগেজ বৃহস্পতিবার জাতির উদ্দেশে দেয়া বক্তব্যে ঘটনাটিকে জাতীয় ট্র্যাজেডি বলে উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, ‘বহু ভবন ধসে পড়েছে এবং যত বেশি সম্ভব মানুষকে জীবিত উদ্ধার করতে সরকার সর্বোচ্চ শক্তি নিয়ে কাজ করছে।’ তিনি নিহতদের পরিবারের প্রতি সমবেদনা জানিয়ে জানান, উদ্ধার ও ত্রাণ কার্যক্রমে রাষ্ট্রের সব ধরনের সক্ষমতা ব্যবহার করা হচ্ছে। একই সঙ্গে দেশজুড়ে জাতীয় জরুরি অবস্থা ঘোষণা করে অবকাঠামো, হাসপাতাল ও আবাসন পুনর্নির্মাণের জন্য আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) অর্থ ব্যবহার করে ২০০ মিলিয়ন ডলারের একটি প্রাথমিক পুনর্গঠন তহবিল গঠনের ঘোষণা দেন।
সরকারি হিসাব অনুযায়ী, ১৮৮ জনের মৃত্যু নিশ্চিত হলেও কর্মকর্তারা স্বীকার করেছেন, এটি এখনো পূর্ণাঙ্গ চিত্র নয়। সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত লা গুয়াইরা অঞ্চলের অনেক এলাকা থেকে এখনো সম্পূর্ণ তথ্য পাওয়া যায়নি। রাজধানী কারাকাসে অন্তত ১০টি বড় ভবন ধসে পড়ার বিষয়টি নিশ্চিত করা হলেও উপকূলীয় অঞ্চলে কত ভবন ধসে পড়েছে, তার সুনির্দিষ্ট হিসাব প্রকাশ করা হয়নি। উদ্ধারকারী কর্মকর্তাদের ধারণা, ধ্বংসস্তূপের নিচে এখনো বিপুলসংখ্যক মানুষ আটকা পড়ে আছেন। তাই প্রতিটি ঘণ্টা পার হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে জীবিত উদ্ধারের সম্ভাবনা কমলেও অভিযান থামানো হচ্ছে না।
ভয়াবহতার সবচেয়ে নির্মম চিত্র উঠে এসেছে প্রত্যক্ষদর্শীদের বর্ণনায়। ধসে পড়া ভবন থেকে প্রাণে বেঁচে বেরিয়ে আসা কারাকাসের বাসিন্দা মারিয়া আলেহান্দ্রা বলেন, ‘নিচে নেমে মনে হচ্ছিল যেন কোনো হরর সিনেমার দৃশ্য। চারদিকে শুধু ধুলা, ধ্বংসস্তূপ, আহত মানুষের আর্তনাদ এবং স্বজনদের মরিয়া ছোটাছুটি দেখা যাচ্ছিল।’ আরেক প্রত্যক্ষদর্শী বলেন, ‘মনে হচ্ছিল পুরো ভবনটা আমাদের ওপর ভেঙে পড়বে। সবাই শুধু অপেক্ষা করছিল কখন সেটি ধসে পড়ে।’
যুক্তরাষ্ট্র এরই মধ্যে অনুসন্ধান ও উদ্ধারকারী দল পাঠানো শুরু করেছে। মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও বলেছেন, ভেনিজুয়েলার এ মুহূর্তের সবচেয়ে জরুরি প্রয়োজন অনুসন্ধান ও উদ্ধার অভিযান। তিনি জানান, যুক্তরাষ্ট্র উপগ্রহ ও আকাশপথের ছবি দিয়ে ক্ষয়ক্ষতির মূল্যায়নে সহায়তা করছে, ব্যক্তিগত অনুদান পৌঁছাতে লজিস্টিক সহায়তা দেবে এবং ক্ষতিগ্রস্ত কারাকাস বিমানবন্দরে জরুরি অপারেশন পরিচালনার জন্য সামরিক সক্ষমতাও ব্যবহার করবে।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পও ভেনিজুয়েলাকে সব ধরনের সহায়তার আশ্বাস দিয়েছেন। ইউরোপীয় কমিশনের প্রেসিডেন্ট উরসুলা ফন ডার লেয়েন এক বার্তায় নিহতদের পরিবারের প্রতি সমবেদনা জানিয়ে বলেন, ইউরোপ ভেনিজুয়েলার জনগণের পাশে রয়েছে। স্পেন, ফ্রান্স, মেক্সিকোসহ একাধিক দেশ উদ্ধারকারী দল, চিকিৎসাসামগ্রী ও মানবিক সহায়তা পাঠানোর ঘোষণা দিয়েছে।
সবচেয়ে উদ্বেগজনক মূল্যায়ন দিয়েছে মার্কিন ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থা। সংস্থাটির পেজার মডেলের প্রাথমিক বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, এ ভূমিকম্পে শেষ পর্যন্ত প্রাণহানি হাজারে পৌঁছাতে পারে এবং ১০ হাজারের বেশি মানুষের মৃত্যুরও উল্লেখযোগ্য সম্ভাবনা রয়েছে। এ পূর্বাভাসের ভিত্তি হলো ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় অসংখ্য ভবন ধসে পড়া, বিপুলসংখ্যক মানুষের ধ্বংসস্তূপের নিচে আটকে থাকার আশঙ্কা এবং ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাগুলো থেকে এখনো পূর্ণাঙ্গ তথ্য না পাওয়া।










