‘সামনে পাহাড়! উপরে উঠুন’—এ বিপদ সংকেতটি কেবল চলচ্চিত্রে বা ফ্লাইট সিমুলেটরে শোনার কথা। কিন্তু বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে বাণিজ্যিক উড়োজাহাজের ককপিটে ক্রমাগত বেজে উঠছে এ ভয়ঙ্কর সতর্কবার্তা। অথচ উড়োজাহাজটি তখন সম্পূর্ণ নিরাপদ উচ্চতায় উড়ছে। এর কারণ ভুয়া জিপিএস সংকেত। যা এখন বৈশ্বিক উড়োজাহাজ চলাচলে গুরুতর হুমকিতে তৈরি করছে।
জুরিখ ইউনিভার্সিটি অব অ্যাপ্লাইড সায়েন্সেসের গবেষক এবং জিপিএসওয়াইস প্ল্যাটফর্মের প্রতিষ্ঠাতা বেনোয়া ফিগেতের তথ্য অনুযায়ী, প্রতিদিন প্রায় ৯০০ উড়োজাহাজ এ জিপিএস বিঘ্নের শিকার হচ্ছে। সমস্যাটি বিশেষভাবে তীব্র হয়েছে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ শুরুর পর থেকে। এছাড়া ২০২২ সাল থেকেই মধ্যপ্রাচ্য, বাল্টিক সাগর এবং কৃষ্ণ সাগর অঞ্চলে এ সমস্যা মহামারির আকার নিয়েছে।
এশিয়াতেও এর বিস্তার লক্ষ্য করা যাচ্ছে। ভারত-পাকিস্তান সীমান্ত, উত্তর কোরিয়া ও দক্ষিণ কোরিয়ার আশপাশ এবং মিয়ানমারেও এমন ঘটনা দেখা গেছে। বর্তমান ইরান যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে এসব অঞ্চলের কাছাকাছি দিয়ে যাওয়া ফ্লাইটগুলোও বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে। জিপিএস সিগন্যাল বিকৃত হলে উড়োজাহাজের গ্রাউন্ড প্রক্সিমিটি ওয়ার্নিং সিস্টেম ভুলভাবে বিপদের সংকেত দিতে পারে, যদিও উড়োজাহাজটি নিরাপদ উচ্চতায়ই থাকে।
কিন্তু কারা কিভাবে এ গোলযোগ তৈরি করেছে?
সহজভাবে বললে, জিপিএস বা জিএনএসএস (স্যাটেলাইটভিত্তিক অবস্থান নির্ধারণ ব্যবস্থা) এমন প্রযুক্তি, যা আকাশে থাকা স্যাটেলাইট থেকে সংকেত নিয়ে আমাদের অবস্থান ঠিক করে দেয়। এসব স্যাটেলাইট প্রায় ২০ হাজার কিলোমিটার দূরে থাকে। এত দূর থেকে আসতে আসতে সংকেত খুব দুর্বল হয়ে যায়—প্রায় দুইটা বাল্বের আলোর মতো শক্তি থাকে। যার সুযোগ নেয় সামরিক বাহিনীগুলো।
মূলত যুদ্ধক্ষেত্রে শত্রুপক্ষের ড্রোন বা মিসাইলকে পথ হারানোর জন্য বিভিন্ন দেশের সামরিক বাহিনী এ জিপিএস বিঘ্ন ঘটায়। কাজটি দুভাবে করা হয়। একটি হলো জ্যামিং। মানে এমন শক্তিশালী রেডিও তরঙ্গ ছড়িয়ে দেওয়া যাতে আসল জিপিএস সংকেত চাপা পড়ে যায় এবং কোনো ডিভাইসই নিজের অবস্থান বুঝতে পারে না। আরেকটি হলো স্পুফিং। মানে ভুয়া জিপিএস সংকেত পাঠিয়ে ডিভাইসকে বিশ্বাস করানো যে সে আসলে অন্য কোথাও আছে। সমস্যা হলো এ সংকেতগুলো শুধু ড্রোন বা মিসাইলকেই বিভ্রান্ত করে না, আশপাশ দিয়ে উড়তে থাকা বাণিজ্যিক উড়োজাহাজও এর কবলে পড়ে যায়।

আন্তর্জাতিক এয়ারলাইন পাইলটদের সংগঠন ‘ইন্টারন্যাশনাল ফেডারেশন অব এয়ার লাইন পাইলটস অ্যাসোসিয়েশন’-এর প্রেসিডেন্ট ক্যাপ্টেন রন হে সতর্ক করে বলেছেন, ‘এ ধরনের ভুয়া সংকেত এখন নিয়মিত হয়ে যাচ্ছে। এতে পাইলটরা গুরুত্বপূর্ণ নিরাপত্তা সতর্কতাকে গুরুত্ব না দেয়ার ঝুঁকিতে পড়তে পারেন, যা দীর্ঘমেয়াদে বিপজ্জনক হতে পারে।’
যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল এভিয়েশন অ্যাডমিনিস্ট্রেশন ২০২৬ সালের এক নির্দেশিকায় বলা হয়েছে, জিপিএস বিকৃতির ফলে ককপিটে ম্যাপের অবস্থান হঠাৎ বদলে যেতে পারে। উড়োজাহাজের অবস্থান বাস্তব অবস্থান থেকে অনেক দূরে দেখাতে পারে। এমনকি রানওয়েতে থাকা অবস্থায়ও সিস্টেম ভুলভাবে অন্য কোথাও থাকার সংকেত দিতে পারে।
গবেষণা প্রতিষ্ঠান স্কাই ডাটা সার্ভিসেসের তথ্য অনুযায়ী, প্রতিদিন প্রায় ৯০০টি ফ্লাইট জিপিএস সিগন্যালের এই ধরনের বিঘ্নের মুখে পড়ছে। পাইলটদের ভাষায়, অনেক সময় ককপিটের ডিজিটাল ন্যাভিগেশন সিস্টেম ‘কল্পকাহিনীতে পরিণত’ হয়। ফলে পাইলটদের বাধ্য হয়ে পুরোনো পদ্ধতি রাডার, ইনর্শিয়াল ন্যাভিগেশন বা স্থলভিত্তিক ট্রান্সমিটার ব্যবহার করে উড়োজাহাজ পরিচালনা করতে হচ্ছে। এ যেন আবার ১৯৭০-এর দশকে ফিরে যাওয়া।
যদিও এই সমস্যা সরাসরি যাত্রীদের নিরাপত্তার জন্য তাৎক্ষণিক বড় হুমকি নয়, তবে এটি অপারেশনাল জটিলতা তৈরি করছে। আটলান্টিক মহাসাগর পাড়ি দেয়া ফ্লাইটগুলোকে নিরাপত্তার কারণে বেশি দূরত্ব রেখে চলতে হচ্ছে। এতে নির্ধারিত রুট ব্যবহার করা সম্ভব হচ্ছে না এবং ফ্লাইট দীর্ঘ ও ব্যয়বহুল হয়ে উঠছে। ফিনল্যান্ডের উড়োজাহাজ চলাচল সংস্থা জানিয়েছে, শুধু চলতি বছরের জানুয়ারি ও ফেব্রুয়ারিতেই তারা ৪২১টি জিপিএস বিঘ্নের রিপোর্ট পেয়েছে।

এ সমস্যার বড় উদাহরণ দেখা যায় ২০২৪ সালের ২৫ ডিসেম্বর। আজারবাইজান থেকে রাশিয়ার গ্রোজনি যাওয়ার পথে এক যাত্রীবাহী উড়োজাহাজ কাজাখস্তানে বিধ্বস্ত হয়। প্রাথমিক তদন্তে জানা যায়, পাইলটরা জিপিএস হারিয়ে ফেলেছিলেন এবং ভুল সতর্কবার্তার সম্মুখীন হন। কুয়াশার কারণে নিরাপদ অবতরণ সম্ভব না হওয়ায় তারা ফিরে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন, কিন্তু পরে উড়োজাহাজটি নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলে। এতে ৬৭ জনের মধ্যে অন্তত ৩৮ জন নিহত হন। কাজাখস্তানের পরিবহন মন্ত্রণালয়ের প্রাথমিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, পাইলটরা গ্রোজনির কাছে ইলেকট্রনিক বিঘ্নের শিকার হন, জিপিএস হারিয়ে ফেলেন এবং ‘Pull up’ সতর্কবার্তার মুখে পড়েন। ঘন কুয়াশার কারণে বিকল্প অবতরণও তখন কঠিন ছিল। দুইবার ব্যর্থ অবতরণের চেষ্টার পর উড়োজাহাজটি বাকুতে ফেরার সিদ্ধান্ত নেয়, কিন্তু পথেই প্রাথমিক নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা বিকল হয়ে যায়। যদিও পরে রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন দাবি করেন, ইউক্রেনীয় ড্রোন প্রতিহত করতে গিয়ে ছোড়া ক্ষেপণাস্ত্র দুর্ঘটনার কারণ ছিল। তবে বিশেষজ্ঞরা মনে করেন জিপিএস বিঘ্ন পরিস্থিতিকে জটিল করে তোলে।
লন্ডনভিত্তিক রয়্যাল ইনস্টিটিউট অব নেভিগেশনের প্রধান রামসে ফ্যারাগারের মতে, জিপিএস সমস্যাটি না থাকলে উড়োজাহাজটি সম্ভবত আগেই নিরাপদে অবতরণ করতে পারত।
এ সমস্যা মোকাবিলায় বিভিন্ন উদ্যোগ নেয়া হচ্ছে। ইউরোপীয় দেশগুলো সমন্বিত অ্যাকশন প্ল্যান গ্রহণ করেছে, যেখানে স্বল্পমেয়াদে পাইলট ও এয়ার ট্রাফিক কন্ট্রোলের মধ্যে যোগাযোগের মান উন্নয়ন এবং দীর্ঘমেয়াদে সামরিক উৎস থেকে জিপিএস বিঘ্নের তথ্য সংগ্রহের পরিকল্পনা রয়েছে। প্রযুক্তিগত দিক থেকেও সমাধান খোঁজা হচ্ছে। উন্নত অ্যান্টেনা প্রযুক্তি, সফটওয়্যার ফিল্টার এবং ইউরোপের গ্যালিলিও সিস্টেমে ডাটা যাচাই সুবিধা যুক্ত করা হচ্ছে। পাশাপাশি নিম্ন-কক্ষপথের স্যাটেলাইট ব্যবহার করে আরো শক্তিশালী সংকেত পাঠানোর উদ্যোগ নিয়েছে ইউরোপিয়ান স্পেস এজেন্সি।

তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, তাৎক্ষণিক কোনো একক সমাধান নেই। উড়োজাহাজ শিল্পে নতুন প্রযুক্তি যুক্ত করতে দীর্ঘ সময় লাগে, কারণ প্রতিটি পরিবর্তনের আগে কঠোর পরীক্ষা প্রয়োজন। এর মধ্যে পাইলটদের প্রশিক্ষণ ও প্রস্তুতিই সবচেয়ে বড় ভরসা। সব মিলিয়ে, জিপিএস সংকেত বিকৃতি এখন উড়োজাহাজ চলাচলের নতুন ঝুঁকি তৈরি করেছে। যা সরাসরি দুর্ঘটনা না বাড়ালেও, আকাশপথের নিরাপত্তা ব্যবস্থার ওপর আস্থা কমিয়ে দিতে পারে।
সিএনএন ও ইন্ডিপেনডেন্ট অবলম্বনে










