চারমাসব্যাপী চলা যুদ্ধ বন্ধে যুক্তরাষ্ট্র-ইরানের মধ্যে স্বাক্ষরিত প্রাথমিক সমঝোতা চুক্তি মেনে নিতে ইসরায়েল সরকারকে কড়া হুঁশিয়ারি দিয়েছেন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স। তিনি স্পষ্ট করে বলেছেন, সাম্প্রতিক বছরগুলোয় ইসরায়েল আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে প্রায় একঘরে হয়ে পড়েছে। বর্তমানে ওয়াশিংটনই তাদের একমাত্র, প্রধান ও শক্তিশালী মিত্র। খবর টাইমস।
স্থানীয় সময় বৃহস্পতিবার হোয়াইট হাউসে সাংবাদিকদের সঙ্গে ঘণ্টাব্যাপী ব্রিফিংয়ে জেডি ভ্যান্স ইসরায়েলি নেতৃত্বের উদ্দেশ্যে বলেন, আমি যদি ইসরায়েল সরকারের মন্ত্রিসভায় থাকতাম, তবে বিশ্বের বুকে অবশিষ্ট থাকা আমার একমাত্র শক্তিশালী মিত্রকে আক্রমণ করতাম না।
বিশ্লেষকদের মতে, চার মাস আগে ইরান ও ইসরায়েলের মধ্যে যুদ্ধ শুরুর পর থেকে ট্রাম্প প্রশাসনের সঙ্গে তেল আবিবের সম্পর্ক ক্রমাগত তিক্ত হচ্ছে। ভ্যান্সের এ বক্তব্য সেই দূরত্বের সবচেয়ে বড় প্রকাশ্য বহিঃপ্রকাশ।
ব্রিফিংয়ের অধিকাংশ সময়জুড়েই মার্কিন প্রশাসনের এ চুক্তির পক্ষে যুক্তি তুলে ধরেন জেডি ভ্যান্স। যদিও ইসরায়েল এ চুক্তির সরাসরি কোনো পক্ষ নয়, তবে সমঝোতা অনুযায়ী দেশটির ওপর কিছু বাধ্যবাধকতা রয়েছে। সে অনুযায়ী, ইসরায়েলকে দক্ষিণ লেবাননে সব ধরনের ক্ষেপণাস্ত্র হামলা বন্ধ করতে হবে।
চুক্তির বিনিময়ে ইরানের ওপর থেকে অপরিশোধিত তেল রফতানির নিষেধাজ্ঞা তুলে নেয়া হবে, যা দেশটির অর্থনীতিকে সচল করবে। এছাড়া ইরান কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালি পুনরায় খুলে দেয়াড় এবং কোনো ধরনের পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি না করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে।
এ সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরের মাধ্যমে দুই পক্ষের মধ্যে ৬০ দিনের একটি আনুষ্ঠানিক আলোচনা শুরু হয়েছে। এ আলোচনার সফল সমাপ্তিতে ইরানের অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য ৩০০ বিলিয়ন ডলারের একটি পুনর্বাসন তহবিল গঠন হতে পারে।
মার্কিন সংবাদমাধ্যম ‘অ্যাক্সিওস’-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, এ চুক্তি নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন ইসরায়েলি কর্মকর্তারা। দেশটির প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর একজন উপদেষ্টা জানিয়েছেন, লেবাননসংক্রান্ত শর্তগুলো মানতে ইসরায়েল বাধ্য নয়।
চুক্তি স্বাক্ষরের পর থেকে নেতানিয়াহু নিজে প্রকাশ্যে কোনো মন্তব্য না করলেও তার অনুসারী ইসরায়েলি গণমাধ্যমগুলো ট্রাম্প প্রশাসনের তীব্র সমালোচনা করছে। এমনকি ট্রাম্পের বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ এবং জ্যারেড কুশনারের বিরুদ্ধে আর্থিক সুবিধার বিনিময়ে ইসরায়েলের স্বার্থ বিকিয়ে দেয়ার অভিযোগও আনা হয়েছে।
ইসরায়েলি গণমাধ্যমের এ আক্রমণের জবাবে মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট ইসরায়েলকে তাদের সামরিক ও আর্থিক বাস্তবতার কথা মনে করিয়ে দেন। ভ্যান্স বলেন, ইসরায়েলের মোট প্রতিরক্ষা অস্ত্রের দুই-তৃতীয়াংশই আমেরিকার অর্থায়নে এবং মার্কিন প্রযুক্তিতে তৈরি। সুতরাং ইসরায়েলের সমস্যা ডোনাল্ড ট্রাম্প নন। ইসরায়েলের যারা ভাবছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট তাদের সবচেয়ে বড় সমস্যা, তাদের দ্রুত বাস্তবতায় ফিরে আসা উচিৎ।
ভ্যান্স জানান, ট্রাম্প প্রশাসন ইসরায়েল সরকার এবং পারস্য উপসাগরীয় দেশগুলোর সঙ্গে প্রতিদিন যোগাযোগ রাখছে। তবে ইসরায়েলের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাদের সঙ্গে ব্যক্তিগত আলাপে তিনি এমন কোনো উদ্বেগের কথা শোনেননি।
ইরান চুক্তি নিয়ে ওয়াশিংটন যখন একটি বড় ধরনের কূটনৈতিক সাফল্যের দ্বারপ্রান্তে, ঠিক তখনই লেবাননের বৈরুতে প্রাণঘাতী বিমান হামলা চালিয়েছে ইসরায়েল। ভ্যান্স এ হামলার তীব্র সমালোচনা করে বলেন, ওই হামলায় নিহতদের অনেকের সঙ্গেই হিজবুল্লাহর কোনো সম্পর্ক ছিল না। অথচ ইসরায়েল দাবি করেছিল, তারা কেবল হিজবুল্লাহকে লক্ষ্য করেই হামলা চালিয়েছে।
বক্তব্যের শেষাংশে মার্কিন বার্তা পুনর্ব্যক্ত করে ভ্যান্স বলেন, আমরা আন্তরিকভাবেই চাই এ শান্তি প্রক্রিয়া ইসরায়েলের জন্য কল্যাণকর হোক। আমরাও চাই না হিজবুল্লাহ ইসরায়েলে আক্রমণ করুক। কিন্তু সেটি নিশ্চিত করতে হলে আমাদের একটি টেকসই আঞ্চলিক কাঠামো তৈরি করতে হবে, যা হিজবুল্লাহর প্রতি ইরানের সমর্থন বন্ধ করবে এবং লেবাননের সার্বভৌমত্ব রক্ষা করবে।









