একসময় যুক্তরাষ্ট্রের শিল্প ও বিনোদন জগতে মত প্রকাশের স্বাধীনতা অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা হতো। তবে ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর ইসরায়েলের গাজা অভিযানের পর থেকে বহু শিল্পী, অভিনেতা ও কলাকুশলী অভিযোগ করছেন, তাদেরকে চুপ করিয়ে দেয়ার একটি সংগঠিত উদ্যোগ চলছে। আর এক্ষেত্রে মূল ভূমিকা রাখছেন শিল্পজগতের করপোরেট নেতারা।

অভিনেতা, নৃত্যশিল্পী, সংগীতশিল্পী, লেখক থেকে শুরু করে কারিগরি কর্মী সবমিলিয়ে শতাধিক শিল্পী মিডল ইস্ট আইকে বলেছেন, ইসরায়েলের গাজা যুদ্ধের বিরুদ্ধে কথা বলার কারণে তাদেরকে চাকরি থেকে বরখাস্ত, কালো তালিকাভুক্ত বা হয়রানি করা হয়েছে।

এই শিল্পীরা জানান, ফিলিস্তিনপন্থী অবস্থানের কারণে তারা নানা ধরনের পেশাগত ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছেন। তাদের অধিকাংশই খ্যাতির শীর্ষে না থাকার কারণে তাদের এই ভোগান্তির কথা সংবাদমাধ্যমে গুরুত্ব পায় না। অনেকে জনপ্রিয় সিরিজ ও সিনেমায় কাজ করেছেন, তবু পরিচিতির অভাবে চুপ করে থাকতে বাধ্য হচ্ছেন। বেশিরভাগ শিল্পীই আড়ালে কথা বলেছেন, কারণ প্রকাশ্যে প্রতিবাদ করলে এজেন্সি ও প্রযোজনা সংস্থাগুলোর পক্ষ থেকে প্রতিশোধের আশঙ্কা রয়েছে।

২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে ইসরায়েল অধিকৃত পশ্চিম তীরে ফিলিস্তিনি চলচ্চিত্র নির্মাতা হামদান বল্লালকে মারধর করে আটক করে। বল্লাল সদ্য অস্কারজয়ী প্রামাণ্যচিত্র ‘নো আদার ল্যান্ড’-এর সহ-পরিচালক ছিলেন। এ ঘটনায় অস্কার প্রদানকারী একাডেমি কোনো নিন্দা জানায়নি। ‘বিশ্বজুড়ে সহিংসতা গ্রহণযোগ্য নয়’ মর্মে একটি বিবৃতি দিয়ে নিজেদের দায়িত্ব শেষ করেছেন।

অন্যদিকে, স্নো হোয়াইট খ্যাত অভিনেত্রী র‍্যাচেল জেগলার ২০২৪ সালের আগস্টে ‘ফ্রি প্যালেস্টাইন’ লিখে টুইট করায় বক্তব্য প্রত্যাহারের জন্য তার ওপর স্টুডিও চাপ সৃষ্টি করে। তিনি রাজি না হওয়ায় চলচ্চিত্রের ব্যর্থতার জন্য প্রযোজকরা প্রকাশ্যে তার ওপর দোষ চাপিয়েছেন।

এই দুটি ঘটনাই প্রমাণ করে, ইসরায়েলের যুদ্ধের সমালোচনায় শিল্পীদের মুখ বন্ধ করার জন্য একটি উচ্চপর্যায়ের প্রচেষ্টা চালানো হচ্ছে। যেখানে হলিউডের করপোরেট নেতৃত্ব, জনসংযোগ প্রতিষ্ঠান ও প্রতিভা ব্যবস্থাপনার সংস্থাগুলোর সক্রিয় ভূমিকা রয়েছে।

শিল্পীদের ভাষ্যে, বিনোদনজগতে ইসরায়েলবিরোধী অবস্থান নিলে ক্যারিয়ার ঝুঁকিতে পড়ে। একজন টিভি লেখক জানিয়েছেন, সামাজিক মাধ্যমে কে কী বলেছে তা যাচাই করতে হলিউডের একটি জনসংযোগ সংস্থা কর্মীদের নির্দেশ দিয়েছে। অভিনেতা আমিন এল-গামাল বলেন, এ ধরনের নিপীড়ন প্রমাণ করা প্রায় অসম্ভব। কারণ প্রতিনিধিরা সাধারণত যোগ্যতার প্রশ্ন তুলে ছাটাই করে ফেলে।

সামাজিক মাধ্যম পোস্ট ‘সংবেদনশীল’ হওয়ায় নিউ ইয়র্কের থিয়েটার ও টেলিভিশন অভিনেতা কলিন বাকিংহ্যামকেও কাজ থেকে বাদ দেয়া হয়েছে। অনেক শিল্পী জানান, কাজ হারানোর কারণ তাদের ফিলিস্তিনপন্থী অবস্থান, তবে সে কারণ স্পষ্টভাবে জানানো হয় না।

২০২৩ সালে ঐতিহাসিক লেখক ও অভিনেতা ধর্মঘটে যে একাত্মতা দেখা গিয়েছিল, ৭ অক্টোবরের পর তা ভেঙে পড়েছে। অনেকে অভিযোগ করেন, ইউনিয়নের নির্বাচিত নেতারাই ফিলিস্তিনপন্থী সদস্যদের দমন করছেন। ফিলিস্তিন সংক্রান্ত প্রস্তাব উত্থাপন করলে তখন নির্বাচিত নেতারা হয়রানি, অপপ্রচার ও ক্ষমতার অপব্যবহার করেন বলেও অভিযোগ রয়েছে।

তবে নিপীড়ন চললেও শিল্পীরা সবাই চুপ করে নেই। থিয়েটার ওয়ার্কার ফর সিজফায়ার, ড্যান্সারস ফর প্যালেস্টাইনসহ ফিলিস্তিনপন্থী নানান সংগঠন সংগঠিত হয়ে প্রতিরোধ গড়ে তুলছেন।

থিয়েটার ওয়ার্কার ফর সিজফায়ার জানিয়েছে, ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রের অন্তত ২৭টি থিয়েটার প্রতিষ্ঠান ফিলিস্তিন একাডেমিক ও সাংস্কৃতিক বয়কট আন্দোলন সমর্থন করেছে। তবে শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোর বোর্ড সদস্য ও দাতাদের মধ্যে ইসরায়েলপন্থীদের প্রভাব এখনো চ্যালেঞ্জ হয়ে রয়েছে।