ত্রয়োদশ ওয়ানডে বিশ্বকাপের উদ্বোধনী ম্যাচেই সেঞ্চুরি করেন নিউজিল্যান্ডের দুজন। ডেভন কনওয়ে ১৫২ ও রাচিন রবীন্দ্র ১২৩ রানের হার না মানা ইনিংস খেলেন। চলতি আসরে এরপর আরো ১১টি সেঞ্চুরি হয়েছে। এর মধ্যে দুজন ভারতীয়। সব মিলিয়ে চলতি বিশ্বকাপে এরই মধ্যে সেঞ্চুরি হয়েছে ১৩টি। গত বৃহস্পতিবার পুনেতে বাংলাদেশের বিপক্ষে অপরাজিত সেঞ্চুরিতে ভারতকে জিতিয়েছেন বিরাট কোহলি। ৯৭ বলে ১০৩ রানের হার না মানা সেঞ্চুরি করেন তিনি। এটা তার ৪৮তম ওয়ানডে সেঞ্চুরি। সেঞ্চুরিতে তিনি পৌঁছে গেলেন শচীন টেন্ডুলকারের আরো কাছাকাছি। আর একটি সেঞ্চুরি করলেই কিংবদন্তি টেন্ডুলকারকে ছুঁয়ে ফেলবেন। 

যে গতিতে ছুটছেন তাতে হয়তো চলতি বিশ্বকাপেই শচীনকে ছোঁয়ার পর তাকে টপকেও যাবেন কোহলি। তবে শচীনের টেস্টের রাজত্ব টিকে থাকতে পারে বহু বছর। ৫১টি সেঞ্চুরি নিয়ে সবার ধরাছোঁয়ার বাইরে তিনি। তার পরের নয়জনই এখন অবসরে। কোহলি ১১১ ম্যাচে করেছেন ২৯টি সেঞ্চুরি।

কোহলির বীরত্বগাথার মধ্য দিয়ে ওয়ানডে সেঞ্চুরিতে ভারতের আধিপত্য আরেকবার ফুটে উঠল। সেঞ্চুরিতে শীর্ষ তিনজনই ভারতের এবং শীর্ষ দশের চারজনই ভারতের! টেন্ডুলকারের ৪৯ ও কোহলির ৪৮ সেঞ্চুরির পরই রয়েছেন বর্তমান দলনায়ক রোহিত শর্মা। তার সেঞ্চুরি সংখ্যা ৩১। অস্ট্রেলিয়ান গ্রেট রিকি পন্টিংয়ের সঙ্গে যুগ্মভাবে তিনে ছিলেন রোহিত। ১১ অক্টোবর দিল্লিতে আফগানিস্তানের বিপক্ষে ৮৪ বলে ১৩১ রানের বিস্ফোরক ইনিংস খেলে পন্টিংকে ছাড়িয়ে এককভাবে তিনে উঠে যান রোহিত। 

সেঞ্চুরিতে শীর্ষ দশে রোহিতের পরেই আছেন রিকি পন্টিং (৩০), শ্রীলংকার সনাথ জয়সুরিয়া (২৮), দক্ষিণ আফ্রিকার হাশিম আমলা (২৭), একই দেশের এবি ডি ভিলিয়ার্স (২৫), ওয়েস্ট ইন্ডিজের ক্রিস গেইল (২৫), শ্রীলংকার কুমার সাঙ্গাকারা (২৫) ও ভারতের সৌরভ গাঙ্গুলী (২২)। শীর্ষ ১০ জনের মধ্যে বর্তমানে খেলছেন শুধু কোহলি ও রোহিত। 

এছাড়া শ্রীলংকার তিলকারত্নে দিলশান ২২টি, অস্ট্রেলিয়ার ডেভিড ওয়ার্নার ২১টি, নিউজিল্যান্ডের রস টেলর ২১টি, দক্ষিণ আফ্রিকার হার্শেল গিবস ২০টি ও পাকিস্তানের সাঈদ আনোয়ার ২০টি সেঞ্চুরি করেছেন। ১১২ ম্যাচে ১৯টি সেঞ্চুরি করা পাকিস্তান দলনায়ক বাবর আজম যে গতিতে ছুটছেন তাতে হয়তো শিগগিরই ঢুকে পড়বেন শীর্ষ দশে। 

ওয়ানডে ক্রিকেটে বাংলাদেশীদের মধ্যে সর্বোচ্চ সেঞ্চুরির কীর্তিটা তামিম ইকবালের। তিনি ২৪৩ ম্যাচ খেলে করেছেন ১৪টি সেঞ্চুরি। এছাড়া হাফসেঞ্চুরি করেছেন ৫৬টি। তামিম রান করেছেন ৮ হাজার ৩৫৭। সাকিব আল হাসান ও মুশফিকুর রহিম উভয়ই করেছেন ৯টি ওয়ানডে সেঞ্চুরি। চলতি বিশ্বকাপে বাংলাদেশ স্কোয়াডে সুযোগ পেলে হয়তো সেঞ্চুরির সংখ্যা আরেকটু বাড়িয়ে নিতে পারতেন বামহাতি তারকা তামিম।  

এদিকে, সেঞ্চুরিতে তিনে থাকলেও ডাবল সেঞ্চুরিতে আবার সবার ওপরে রোহিত শর্মা। ওয়ানডে ক্রিকেটে এখন পর্যন্ত ডাবল সেঞ্চুরি হয়েছে মোট ১০টি। এর মধ্যে রোহিত একাই করেছেন তিনটি! তার সর্বোচ্চ ইনিংস ২৬৪ রানের। কলকাতার ইডেন গার্ডেনসে ২০১৪ সালে শ্রীলংকার বিপক্ষে ১৭৩ বল মোকাবেলা করে ৩৩টি চার ও ৯টি ছক্কায় এ ইনিংস খেলেছিলেন তিনি। এছাড়া ২০১৩ সালে বেঙ্গালুরুতে অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে ২০৯ রান ও ২০১৭ সালে মোহালিতে শ্রীলংকার বিপক্ষে ২০৮ রানের ইনিংস খেলার কীর্তি আছে রোহিতের। 

ওয়ানডে ক্রিকেটে ১০টি ডাবলের মধ্যে ভারতের ব্যাটারদেরই করা সাতটি। রোহিত ছাড়া ডাবল করেছেন বিরেন্দর শেবাগ, শচীন টেন্ডুলকার, ইশান কিশান ও শুভমান গিল। এছাড়া নিউজিল্যান্ডের মার্টিন গাপটিল, ওয়েস্ট ইন্ডিজের ক্রিস গেইল ও পাকিস্তানের ফখর জামানের আছে ডাবলের কীর্তি। 

চলতি বছর কোহলি করলেন নিজের চতুর্থ সেঞ্চুরি। এর আগে গত ১০ সেপ্টেম্বর কলম্বোয় এশিয়া কাপ ম্যাচে পাকিস্তানের বিপক্ষে করেছিলেন হার না মানা ১২২ রান। গত জানুয়ারিতে শ্রীলংকার বিপক্ষে ওয়ানডে সিরিজের প্রথম ও তৃতীয় ম্যাচে করেন দুটি ধ্রুপদি ইনিংস। গুয়াহাটিতে ৮৭ বলে ১১৩ রান করার পর কেরালায় ১১০ বলে ১৬৬ রানের হার না মানা ইনিংস খেলেন ১৩টি বাউন্ডার ও ৮ ছক্কায়।

বাংলাদেশের বিপক্ষে কোহলিকে সেঞ্চুরি করার সুযোগ তৈরি করে দেন সতীর্থ লোকেশ রাহুল। তিনি স্বীকার করেন, সেঞ্চুরির সুযোগ বাঁচিয়ে রাখতে তারা দৌড়ে রান নিতে চাননি। লোকেশের কথায়, ‘তিনি (কোহলি) কিছুটা দ্বিধায় ছিলেন। তিনি বলছিলেন, এটা যেহেতু বিশ্বকাপ, বড় আসর, কাজেই সিঙ্গেল না নিলে খারাপ দেখাবে। কিন্তু আমি দেখছিলাম, আমরা তখনো জিতে না গেলেও খুব সহজেই জিতব। কাজেই আপনি যদি মাইলফলক অর্জন করতে পারেন, তবে কেন নয়। আপনি অবশ্যই চেষ্টা করবেন এবং তিনি সেটি করেছেনও। আমি কোনোমতেই সিঙ্গেল রান নিতে চাইনি।’

কোহলিকে সেঞ্চুরির সুযোগ করে দিতে এ জুটি অন্তত পাঁচটি সিঙ্গেল রান দৌড়ে নেননি। একটি পর্যায়ে মনেও হয়নি যে কোহলি তিন অংক ছুঁতে পারবেন, কেননা খেলা তার আগেই শেষ হতে পারে। ২৫৭ রানের লক্ষ্যে খেলা ভারতের সংগ্রহ এক পর্যায়ে ছিল ২২৯/৩। তখন তাদের প্রয়োজন পড়ে ২৮ রান, আর সেঞ্চুরি থেকে কোহলি ২৭ রান দূরে। তিনি ও রাহুল ৩৯তম ওভারের প্রথম দুই বলে সিঙ্গেল নিলে ভারতের প্রয়োজন পড়ে ২৬, আর কোহলিরও সেঞ্চুরি করতে লাগে ২৬। 

এরপর লোকেশের সহায়তায় হাসান মাহমুদ ও নাসুম আহমেদকে একাধিকবার মাঠের বাইরে পাঠিয়ে সেঞ্চুরি পূর্ণ করেন কোহলি। ৪২তম ওভারের শুরুতে ভারতের প্রয়োজন ছিল দুই রান, কোহলির তিন। নাসুমের তৃতীয় বলটিকে ছক্কা মেরে নিজের সেঞ্চুরি ও ভারতের জয় নিশ্চিত করেন কোহলি।

জয় শেষে কোহলি বলেন, ‘আমি দলে বড় অবদান রাখতে চেয়েছি মাত্র। বিশ্বকাপে আমার বেশকিছু ফিফটি আছে, যা আমি কখনই সেঞ্চুরিতে রূপ দেয়ার চেষ্টা করিনি, আমার চিন্তা ছিল দলের জয়। আমি বছরের পর বছর ধরে শুধু চেষ্টা করে গেছি, দলের প্রয়োজনে শেষ পর্যন্ত টিকে থাকতে।’

২০১৫ সালের বিশ্বকাপে পাকিস্তানের বিপক্ষে ১০৭ রানের ইনিংস খেলার পর বিশ্বকাপে এ প্রথম সেঞ্চুরি করলেন কোহলি। মাঝের এ সময় তিনি সাতটি ফিফটি করেছেন। 

আজ ধর্মশালায় টেবিলের শীর্ষ দল নিউজিল্যান্ডের মুখোমুখি হবে ভারত। নৈসর্গিক এ স্টেডিয়ামে আজও কি হাসবে কোহলির ব্যাট?