বাংলাদেশের ইতিহাসে অন্যতম সেরা ক্রিকেটার, বিশ্বের অন্যতম সেরা অলরাউন্ডার সাকিব আল হাসান এখন পুরোদস্তুর ব্যবসায়ীও। বিনিয়োগ করেছেন নানা ব্যবসায়। সমালোচনা রয়েছে, ব্যবসার কারণেই ক্রিকেটের (পড়ুন, আন্তর্জাতিক ক্রিকেট) ওপর থেকে ক্রমেই মন উঠে যাচ্ছে তার! আবার এ নিয়ে জড়ালেন বিতর্কে। জাতীয় দল থেকে কিছুদিনের জন্য ছুটি চান সাকিব। আগামী ১১ মার্চ বাংলাদেশ ক্রিকেট দলের সঙ্গে দক্ষিণ আফ্রিকাগামী বিমানে উঠতে চান না। দক্ষিণ আফ্রিকায় ১৮ মার্চ শুরু হতে যাওয়া ওয়ানডে সিরিজটা তিনি খেলতে চান না। ১৫ দিনের মতো বিশ্রাম নিয়ে মানসিকভাবে চাঙ্গা হয়ে দক্ষিণ আফ্রিকায় খেলতে চান টেস্ট সিরিজটা।

 

কিন্তু এই বিশ্রাম চাওয়া নিয়ে এখন তিনি নতুন করে জড়িয়েছেন বিতর্কে। তার কথায় ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড (বিসিবি) প্রেসিডেন্ট নাজমুল হাসান পাপন।

 

ব্যক্তিগত প্রয়োজনে রোববার দুবাই যাওয়ার আগে সাকিব বিমানবন্দরে সংবাদমাধ্যমের মুখোমুখি হয়ে বলেন, আফগানিস্তান সিরিজটা তিনি মোটেই উপভোগ করেননি এবং নিজেকে তার শুধু একজন ‘প্যাসেঞ্জার’ মনে হয়েছে। এ মুহূর্তে আন্তর্জাতিক ক্রিকেট খেলার মতো শারীরিক ও মানসিক অবস্থায় তিনি নেই।

 

যদিও সাকিবকে ওয়ানডে ও টেস্ট উভয় দলে রেখেই সম্প্রতি দক্ষিণ আফ্রিকা সফরের জন্য দল ঘোষণা করেছে বিসিবি। কিন্তু সাকিব ওয়ানডে সিরিজটা খেলতে চান না, শুধু টেস্ট খেলবেন। ক্রিকেট বোর্ডের ক্রিকেট অপারেশন্স পরিচালক জালাল ইউনুসকে বিষয়টি জানিয়েছেনও সাকিব।

 

ছুটি চেয়ে বিতর্কের মুখে পড়া সাকিবের জন্য নতুন কিছু নয়। ‘অসময়ে’ ছুটি চাওয়ায় অতীতের মতো এবারো তার ওপর বিরক্ত বোর্ড। সাকিব সত্যিকার অর্থেই মানসিকভাবে বিপর্যস্ত কিনা, বুঝে উঠতে পারছেন না পাপন। আইপিএলের নিলামে দল পেলে সাকিব এই ধরনের কথা বলতেন কিনা, সেই প্রশ্নও তুলছেন তিনি।

 

সোমবার নিজ বাসভবনে বিসিবি সভাপতি বলেন, ওকে হয়তো শারীরিক ও মানসিকভাবে কিছু একটা ডিস্টার্ব করছে। সেটা হতেই পারে। ওর যদি কোনো সমস্যা থাকে, আমাদের বলতে পারে। এয়ারপোর্টে যাওয়ার সময় ফোনে বলে দেয়া, এটা হয় না। হঠাৎ করে একেকটা চমক দেয়া, এটা করে কী লাভ হচ্ছে, কেন করছে। তবে অনেকে পছন্দ করে, আমাদের দেশে অনেকে পছন্দ করে।

 

মানসিকভাবে সাকিব খেলার মতো অবস্থায় নেই— এ বিষয়টি নিয়ে বিসিবি সভাপতি বললেন, মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হলে আইপিএল খেলতে চাচ্ছিল কেন? মানসিকভাবে বিপর্যস্ত থাকলে তো বলতো আমি আইপিএলও খেলব না। আমি বুঝতে পারছি না, মেলাতে পারছি না। ধরুন আইপিএলে ওকে নেয়া হলো, তখন কি মানসিকভাবে বিপর্যস্ত বলতো? জিনিসটা আমার মাথায়ই ঢুকছে না।

 

বিসিবি সভাপতি হয়তো সাকিবের ‘মন খারাপ’ এর আসল কারণটা ধরতে পেরেছেন। আইপিএলে দল না পাওয়ার সঙ্গে সাকিবের মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়ার বিষয়টি অনেকটাই সম্পর্কিত এবং বিপিএল চলাকালেই তা দৃশ্যমান হয়েছে। ১২ ও ১৩ ফেব্রুয়ারির আইপিএল নিলামে সাকিবের দল না পাওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত হয়। ১১ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত সাকিব ছিলেন এবারের বিপিএলের একাধিপতি এবং ফরচুন বরিশালের হয়ে টানা পাঁচ ম্যাচে ‘ম্যান অব দ্য ম্যাচ’ হওয়ার কীর্তি গড়েন তিনি। অনবদ্য পারফরম্যান্সে তিনি বরিশালকে পয়েন্ট টেবিলের এক নম্বরে রেখে তুলে নেন প্রথম কোয়ালিফায়ার ম্যাচে। কিন্তু এরপর আকস্মিক পতন!

 

আইপিএল নিলাম শেষে ১৪ ফেব্রুয়ারি কোয়ালিফায়ার ম্যাচে কুমিল্লা ভিক্টোরিয়ানসের বিপক্ষে বরিশাল জিতলেও সাকিব ছিলেন ‘ফ্লপ’। ব্যাট হাতে ১ রান, আর বল হাতে ২৭ রানে উইকেটশূন্য।

 

১৮ ফেব্রুয়ারির ফাইনালে উত্তেজনাপূর্ণ লড়াই শেষে কুমিল্লার কাছে ১ রানে হেরে যায় সাকিবের বরিশাল। এ ম্যাচে তিনি বল হাতে ৩০ রানে এক উইকেট নিলেও ব্যাট হাতে করেন মাত্র ৭ রান। যে সাকিব বরিশালকে প্রায় একাই টেনে এনেছেন ফাইনাল পর্যন্ত, সেই সাকিবের অনুজ্জ্বলতায়, নিষ্প্রভতায় শিরোপার কাছাকাছি গিয়েও ব্যর্থ হয় দলটি।

এরপর আফগানিস্তানের বিপক্ষে তিন ম্যাচের ওয়ানডে ও দুই ম্যাচের টি২০ সিরিজেও সাকিব ছিলেন অচেনা। তিন ওয়ানডেতে ৬০ রান করেন, উইকেট নেন ৫টি। টি২০তে দুই ম্যাচে ১৪ রান, বল হাতে ২ উইকেট নেন তিনি। বিশ্বসেরা অলরাউন্ডারকে যেন খুঁজেই পাওয়া যায়নি। ফলে ওয়ানডে সিরিজটা কোনোমতে জিতলেও টি২০ সিরিজের ট্রফিটা ভাগাভাগি করতে হয়েছে আফগানিস্তানের সঙ্গে। 

 

আফগান সিরিজ শেষেই তিনি প্রোমোশনাল কাজে দুবাই উড়াল দেন এবং বিমানবন্দরে সাংবাদিকদের বলে যান, দক্ষিণ আফ্রিকায় আসন্ন ওয়ানডে সিরিজটা তিনি খেলতে চান। তার সম্মতিতেই স্কোয়াডে রাখা হয় সাকিবকে। এখন তিনি মত পাল্টানোয় ভীষণ ক্ষুব্ধ হলেন বিসিবি সভাপতি।

 

সাকিবের ‘ছুটির কাহিনী’ এই প্রথম নয়। গত ডিসেম্বরে নিউজিল্যান্ড সফরে শুরুতে তাকে দলে রাখা হলেও পরে পারিবারিক কারণে তিনি ছুটি নেন। গত বছর শ্রীলংকায় টেস্ট সিরিজ খেলেননি আইপিএল খেলবেন বলে। ২০১৭ সালে দক্ষিণ আফ্রিকা সফরে টেস্ট সিরিজ খেলতে যাননি সাকিব। তখনো তার এ সিদ্ধান্ত নিয়ে বেশ বিতর্ক হয়েছিল। আরেকবার বিতর্কে দেশসেরা খেলোয়াড়। 

 

সাকিব যতবার জাতীয় দল থেকে ছুটি নিয়েছেন ততবারই প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে বোর্ড আর জাতীয় দলের প্রতি সাকিবের কমিটমেন্ট। সর্বশেষ এ বিষয়টি নিয়ে ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া জানালেন পাপন। তার মতে, সাকিবকে নিয়ে বারবার অনিশ্চয়তার কারণে বিপাকে পড়তে হচ্ছে দল সংশ্লিষ্টদের। তিনি বলেন, ঝামেলা হচ্ছে টিম ম্যানেজমেন্টের, ঝামেলা কোচিং স্টাফদের, ঝামেলা অধিনায়কদের। অধিনায়ক আর কোচ তো জানেই না সাকিবের এই কাহিনী, আমি নিশ্চিত।

 

এখানেই থামেননি পাপন। তিনি সাকিবসহ প্রত্যেক ক্রিকেটারকে সতর্ক করে দিয়ে বললেন, সাকিব বা কোনো ক্রিকেটার কোনো সংস্করণে খেলতে না চাইলে বোর্ডের কোনো আপত্তি নেই।