এ বছর বিশ্ব ফুটবলে ঘটেছে অনেক বড় পরিবর্তন। ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো ইউরোপের পাঠ চুকিয়ে নাম লিখিয়েছেন সৌদি আরবের ক্লাব আল নাসেরে। তার চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী লিওনেল মেসিও একই বছর ইউরোপ ছেড়ে নাম লেখান যুক্তরাষ্ট্রের মেজর লিগ সকারে। ব্রাজিলিয়ান সুপারস্টার নেইমার নাম লেখান সৌদি আরবের ক্লাব আল হিলালে। তিন সুপারস্টারের ইউরোপ ছেড়ে অপেক্ষাকৃত নিচু লিগে নাম লেখানোর মতো বড় পরিবর্তন এলেও বিশ্ব ফুটবলে আয়ের তালিকাটা যেন রয়ে গেছে আগের মতোই। এখনো এ তিনজনই আধিপত্য করছেন এ তালিকায়।
প্যারিস সেন্ট জার্মেই (পিএসজি) ছেড়ে আল হিলালে নাম লেখাতে রাজি করাতে ব্রাজিলিয়ান সুপারস্টারকে ফুটবল রাজার মতোই সুযোগ-সুবিধা আর সম্মানী দিতে হচ্ছে ক্লাবটিকে। সংবাদ মাধ্যম বলছে—সৌদি আরবের ক্লাবে নাম লেখানোর শর্তে তাকে স্টাফসহ একটি সুরম্য বাড়ি, একাধিক অভিজাত গাড়ি, প্রাইভেট বিমান সুবিধা দেয়া হয়েছে। এছাড়া তিনি পাবেন নানা ধরনের বোনাস। যেমন দলটি জিতলে ও তাকে নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পোস্ট দিলে সেখান থেকেও বোনাস পাবেন তিনি। আর প্রেমিকাকে নিয়ে সেখানে বসবাসের অনুমতি, যা ইসলামী শরিয়ায় নিষিদ্ধ। সব মিলিয়ে এ মৌসুমে অন-ফিল্ড খাত থেকে ৮ কোটি ডলার আয় করবেন নেইমার।
নেইমারকে এত সুযোগ-সুবিধা দেয়ার সক্ষমতা সৌদি ক্লাবটির আছে। ক্লাবটি পাবলিক ইনভেস্টমেন্ট ফান্ডের (পিআইএফ) আওতাধীন ক্লাব। পিআইএফের রয়েছে ৭০০ বিলিয়ন ডলারের সম্পদ এবং এর রয়েছে ক্রীড়ায় উচ্চাভিলাষী অনেক প্রকল্প। পিআইএফ সৌদি আরবকে বিশ্ব ফুটবলের প্রাণকেন্দ্র হিসেবে গড়ে তুলতে চায় এবং সেটি করতে গিয়ে এমন সুপারস্টারের পেছনে কোটি কোটি ডলার খরচ করতে তারা পিছপা হবে না। সৌদি আরবের প্রিন্স মোহাম্মদ বিন সালমান তো বলেই দিয়েছেন, স্পোর্টসওয়াশিং যদি তার দেশের জিডিপি ১ শতাংশ বাড়িয়ে দেয়, তবে তিনি এটি করতে দ্বিধা করবেন না।
ডেলোয়েট এক সমীক্ষায় বলেছেন, ২০২৩ সালের গ্রীষ্মকালীন দলবদলে ৯৪ জন বিদেশী খেলোয়াড় কিনতে ১০০ কোটি ডলারেরও বেশি খরচ করেছে সৌদি আরবের পেশাদার লিগের ক্লাবগুলো।
এখানে কিন্তু কিলিয়ান এমবাপ্পে কিংবা লিওনেল মেসির মতো খেলোয়াড় এলে সংখ্যাটি চোখ ধাঁধানোই হতো। কেননা এমবাপ্পেকে পিএসজি থেকে আনতে ১১০ বিলিয়ন ডলারের বিশেষ প্যাকেজের প্রস্তাব দিয়েছিল আল হিলাল। আবার ক্লাবটি আর্জেন্টাইন সুপারস্টার লিওনেল মেসির জন্য সাড়ে তিন বছরে ১৬০ কোটি ডলার খরচ করতেও রাজি ছিল। যদিও এমবাপ্পে পিএসজিতেই থেকে যান, আর আর্জেন্টিনার বিশ্বকাপজয়ী অধিনায়ক পিএসজি ছেড়ে নাম লিখিয়েছেন মিয়ামির সাউথ বিচের ক্লাব ইন্টার মিয়ামিতে।
ফুটবলে সৌদির এ বিপ্লবের পর ২০২৩ সালে বিশ্বের শীর্ষ আয়কারী মোট ১১ জন ফুটবলার ৯৯ কোটি ৫০ লাখ পাউন্ড আয় করবেন। কর ও এজেন্ট ফির মধ্যে অন্তর্ভুক্ত। এর মধ্যে পাঁচজনই নয় ফিগার অতিক্রম করেছেন। ফুটবলারদের আয় গত বছরের চেয়ে এবার ৫৩ শতাংশ বেড়েছে! সৌদির পেশাদার লিগভিত্তিক চার খেলোয়াড় ২০২৩ সালের মোট আয়ের অর্ধেকেরও বেশি নিজেদের মধ্যে রেখেছেন। মূলত তাদের আকর্ষণীয় অন-ফিল্ড চুক্তিই এগিয়ে রাখছে।
তালিকার ১ নম্বরে আছেন আল নাসরে খেলা ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো। তিনি এ বছর ২৬ কোটি ডলারেরও বেশি আয় করবেন বলে ধারণা করা হচ্ছে। ইংলিশ জায়ান্ট ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডের সঙ্গে সংকট তৈরি হলে তিনি বেছে নেন আল নাসেরকে। এতে দুই পক্ষই লাভবান হয়। সৌদি আরব তার মতো সুপারস্টারকে লুফে নিতে একটুও দেরি করেনি। আর রোনালদো এখানে নাম লিখিয়ে ধনী থেকে আরো ধনী হওয়ার পথ পেয়ে গেছেন।
সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে, শুধু মাঠের চু্ক্তি থেকেই ২০ কোটি ডলার আয় করবেন ৩৮ বছর বয়সী সুপারস্টার রোনালদো। তার ছবিস্বত্বের একটি অংশও কিনে নিয়েছে আল নাসের। এছাড়া নাইকি, জ্যাকব অ্যান্ড কোং-এর মতো খ্যাতিমান কোম্পানির সঙ্গে এনডোর্সমেন্ট চুক্তি থেকে তিনি অন্তত ৬ কোটি ডলার আয় করবেন।
২০২৩ সালে আয়ে রোনালদোর পরেই আছেন লিওনেল মেসি (১৩৫ মিলিয়ন ডলার), নেইমার (১১২ মিলিয়ন ডলার), এমবাপ্পে (১১০ মিলিয়ন ডলার), করিম বেনজেমা (১০৬ মিলিয়ন ডলার), আর্লিং হালান্ড (৫৮ মিলিয়ন ডলার), মোহাম্মদ সালাহ (৫৩ মিলিয়ন ডলার), সাদিও মানে (৫২ মিলিয়ন ডলার), কেভিন ডি ব্রুইন (৩৯ মিলিয়ন ডলার), হ্যারি কেন (৩৬ মিলিয়ন ডলার) ও রবার্ট লেভানডোভস্কি (৩৪ মিলিয়ন ডলার)।
২০১৪ সাল থেকে আয়ে রোনালদোই কর্তৃত্ব করে আসছেন। গত ১০ বছরে তিনি মোট ছয়বার সর্বোচ্চ আয়কারী ফুটবলার হয়েছেন। এছাড়া মেসি সর্বোচ্চ আয়কারী ছিলেন তিনবার, বাকি একবার এমবাপ্পে। গত ১০ বছরে তালিকাটা এ রকম—২০২২ সালে কিলিয়ান এমবাপ্পে (১২৮ মিলিয়ন ডলার), ২০২১ সালে রোনালদো (১২৫ মিলিয়ন ডলার), ২০২০ সালে মেসি (১২৬ মিলিয়ন ডলার), ২০১৯ সালে মেসি (১২৭ মিলিয়ন ডলার), ২০১৮ সালে মেসি (১১১ মিলিয়ন ডলার), ২০১৭ সালে রোনালদো (৯৩ মিলিয়ন ডলার), ২০১৬ সালে রোনালদো (৮২ মিলিয়ন ডলার), ২০১৫ সালে রোনালদো (৭৯ মিলিয়ন ডলার) ও ২০১৪ সালে রোনালদো (৭৩ মিলিয়ন ডলার)।
ফুটবলারদের আয় এতটাই ঈর্ষণীয় পর্যায়ে চলে গেছে যে তা নিয়ে অনেকে এখন শঙ্কিত। এটা ইউরোপের ফুটবলকে চিন্তায় ফেলে দিচ্ছে। কেননা অর্থের প্রলোভনে পড়ে অনেক মেধাবী খেলোয়াড় এখন অপেক্ষাকৃত অখ্যাত লিগে নাম লেখাচ্ছেন। আবার এমন দেদার খরচ করে সৌদি আরবের ফুটবল ভবিষ্যৎইবা কী? তাদের আর্থিক মডেল কতটা টেকসই?
চাইনিজ সুপার লিগ এভাবেই খরচ করে সাড়া তুলেছিল। ২০১৫ ও ২০১৬ সালের দলবদলে প্রায় ১০০ কোটি ডলার খরচ করেছিল চাইনিজ সুপার লিগ। এ সময় তারা ব্রাজিলের অস্কার ও হাল্ক, আর্জেন্টিনার কার্লোস তেভেজের মতো তারকাকে উড়িয়ে এনেছিল। কিন্তু শি জিনপিংয়ের ফুটবল মডেলটা এক দশকের মধ্যেই মুখ থুবড়ে পড়ে। চীনের অর্থনীতি খারাপ অবস্থায় পতিত হয়, বিনিয়োগকারীরা আগ্রহ হারায়, পৃষ্ঠপোষকরা ফুটবল থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয়, ক্লাবগুলোর বেতন ঝুলে পড়ে, বিদেশী খেলোয়াড় ও কোচরা বিদায় নেন। পরিশেষে চলে আসে কভিড-১৯ মহামারী। ২০২২ সালে এসে চীনের ক্লাবগুলো সাকল্যে দলবদলে খরচ করে মাত্র ৩০ মিলিয়ন ডলার! ফোর্বস










