গত কয়েকদিন ধরেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে
ভাইরাল হয়—‘সবসময়ই আমাদের লক্ষ্য পরের বিশ্বকাপ’ লেখাটি। ক্রিকেটারদের মানসিকতা,
নিবেদন, দেশের প্রতি অঙ্গীকারের ঘাটতি আর বোর্ড কর্মকর্তাদের নিয়েই মূলত কটাক্ষ
করেন ক্রিকেট সমর্থকরা। ভারতে চলমান বিশ্বকাপে আফগানিস্তানের বিপক্ষে জয় দিয়ে
বিশ্বকাপ শুরু বাংলাদেশ দলের। এরপর টানা চার হারে দলের সেমিফাইনাল যখন অনিশ্চিত,
তখন ফেসবুকসহ বিভিন্ন মাধ্যমে ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া জানান সমর্থকরা। কিন্তু এবার
ঘটল না নজিরবিহীন। শনিবার ইডেন গার্ডেনসের গ্যালারিতে সমর্থকের প্ল্যাকার্ডে চোখ
আটকে গেল সবার। তাতে লেখা ‘সবসময়ই আমাদের লক্ষ্য পরের বিশ্বকাপ’!
আইসিসির সহযোগী দেশ নেদারল্যান্ডসের কাছে ৮৭
রানে হারের পূর্বক্ষণে ক্ষুব্ধ সমর্থকরা এই প্ল্যাকার্ড প্রদর্শন করেন।
ম্যাচের আগে এক সমর্থকের হাতে থাকা পোস্টারে
লেখা ছিল, ‘প্লে লাইক টাইগার্স, রোর লাইক টাইগার্স’। বাংলাদেশের জার্সি গায়ে
চাপিয়ে রঙিন সাজে মাঠে আসা এই সমর্থকের মনে অবস্থাটা ম্যাচের শেষে কোথায় গিয়ে
দাঁড়িয়েছিল, সেটি নিশ্চিতভাবেই অনুধাবণ করা কঠিন নয়। তিনি যে টাইগারদের নন্দনকাননে
লড়তে দেখেছেন, সে টাইগার নখদন্তহীন। তারা কমলা-ঝড়ে এলোমেলো।
নেদারল্যান্ডস
ম্যাচের আগে আকস্মিক সফরে ঢাকায় আসেন সাকিব। শৈশবের কোচ নাজমুল আবেদিন ফাহিমের
কাছে টোটকা নিতে আসনে বলে দাবি তার। এ সময় মিরপুর শেরেবাংলা স্টেডিয়ামে সমর্থকের
দুয়ো শুনতে হয় তাকে। সেই টোটকা কোনো কাজেই আসেনি। ইডেনে শনিবার ১৪ বলে ৫ রান করে আউট
হয়ে ড্রেসিংরুমে ফেরার পথেও দুয়ো শুনেছেন তিনি। এই ঘটনা যেন গোটা দলেরই প্রতীক হয়ে
সামনে এলো।
২০১৯ বিশ্বকাপে ছয়শর বেশি রান আর ১১ উইকেট শিকার করা সাকিবের যেন স্বর্গ থেকে পতন। তার চোখে, দর্শকদের এই হতাশা স্বাভাবিক। ম্যাচ শেষে সাকিব বলেছেন, ‘হতাশাজনক। তারা (দর্শকরা) আসলে প্রত্যাশা করে ভালো কিছু। স্বাভাবিকভাবে সেটা না হলে তাদেরও অধিকার আছে, তাদের মতো করে বলার। তাদের প্রতি আমার কোনো অভিযোগ নেই। আমি মনে করি যেভাবে আমরা খেলেছি, এটা (দুয়োধ্বনি) আমরা ডিজার্ভ করি।’
বাংলাদেশের ক্রিকেট সমর্থকদের এই ব্যথা বুঝতে
পারেন পাকিস্তানের কিংবদন্তি ফাস্ট বোলার ওয়াসিম আকরামও। বাংলাদেশের ম্যাচের পর
পাকিস্তানের এক টিভি চ্যানেলের অনুষ্ঠানে তিনি বলেছেন, ‘বাংলাদেশের সমর্থকদের জন্য
আমার খারাপ লাগে।’
ভারতের ক্রিকেট ধারাভাষ্যকার হার্শা ভোগলে,
ভারতের সাবেক ক্রিকেটার ইরফান পাঠান, পাকিস্তানের সাবেক ক্রিকেটার মঈন খানসহ আরো
অনেকে বাংলাদেশের পারফরম্যান্স নিয়ে হতাশা ব্যক্ত করেছেন। কেউবা আবার দুঃসময়ে দলের,
বিশেষ করে তরুণ ক্রিকেটারদের পাশে থাকার পরামর্শ দিয়েছেন।
বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের খবর অনুযায়ী, ইডেনে
বাংলাদেশের খেলা দেখতে ১০ হাজারেরও বেশি সমর্থক কলকাতায় গেছেন। তাদের মধ্যে অনেকেই
আবার ৩১ অক্টোবর এই মাঠে পাকিস্তানের বিপক্ষে ম্যাচ দেখে তবেই দেশে ফিরবেন। কিন্তু
এখন হয়তো অনেকেই সিদ্ধান্ত পাল্টাবেন। কারণটা পরিষ্কার—বাংলাদেশের সেমিফাইনালে
খেলার আর কোনো সম্ভাবনা নেই। ৬ ম্যাচের ৫টিতে হেরে বর্তমানে টেবিলের নয় নম্বরে
সাকিবের দল। যেকোনো মুহূর্তেই টেবিলের তলানিতে নেমে যাবে বাংলাদেশ। তার ওপর, পরের
প্রতিপক্ষ পাকিস্তান, শ্রীলংকা ও অস্ট্রেলিয়া বলে আরেকটি জয় পাওয়ার সম্ভাবনাও
ক্ষীণ।
২৮ অক্টোবর দেশের রাজনৈতিক অঙ্গন
যখন উত্তপ্ত, সর্বত্র অস্থিরতা, অনিশ্চয়তা আর হাহাকার; তখন সাধারণ মানুষ একটু
স্বস্তির খোঁজে চোখ রাখে টেলিভিশনের পর্দায়। প্রত্যাশা ছিল— হারের বৃত্ত থেকে
বেরিয়ে কলকাতার ইডেন গার্ডেনসে জয়ের আনন্দে ভাসবে বাংলাদেশ ক্রিকেট দল। কিন্তু
সেখান থেকেও আসে দুঃসংবাদ। নেদারল্যান্ডসের কাছে ৮৭ রানে হেরে যায় সাকিব আল
হাসানের দল। এই হারে সেমিফাইনালে খেলার ‘স্বপ্ন’ও শেষ হলো।
বিশ্বকাপে আপনার লক্ষ্য কী? বিশ্বকাপের
আগে মিরপুর শেরেবাংলা স্টেডিয়ামে জনাকীর্ণ সংবাদ সম্মেলনে সাংবাদিকের এমন এক
প্রশ্নের জবাবে যে লিটন দাস উত্তর দিয়েছিলেন ‘ভালো খেলা’, তার পারফরম্যান্সেও
নিশ্চিতভাবে দেশের প্রতি অঙ্গীকার, দায়িত্ববোধের ঘাটতি থাকবে সেটিই স্বাভাবিক।
মাঠেও তা দৃশ্যমান।
২৩ রানে ৪ উইকেট নিয়ে ডাচদের
জয়ের নায়ক পেস বোলার পল ফন মিকিরেন। কিন্তু ম্যাচের আসল নায়ক তো স্কট এডওয়ার্ডস।
ম্যাচের ফলও নির্ধারণ হয়ে যায় ডাচদের ইনিংসেই। ২২৯ রান করে লড়াইয়ের পুঁজিই শুধু
পায়নি ডাচরা, পেয়েছে লড়াইয়ের আত্মবিশ্বাসও। তাদের তো আরো আগেই, আরো অল্প রানেই
অলআউট করে দিতে পারতো বাংলাদেশ। ১৬তম ওভাবে ডাচদের স্কোর যখন ৬৩/৪ তখন দু দুবার
জীবন পান এডওয়ার্ডস। ১৫.২ ওভারে মুস্তাফিজের বলে স্লিপে ক্যাচ দেন ডাচ অধিনায়ক,
যদিও তা হাত থেকে ফেলে দেন লিটন দাস। তিনি কি ম্যাচটাই ফেলে দিলেন না?
এই হতাশা না কাটতেই আবার ক্যাচ
ড্রপ। এবার মুশফিকুর রহিম। ওই ওভারের চতুর্থ বলে আবার উইকেটের পেছনে ক্যাচ দেন
এডওয়ার্ডস। তা তালুবন্দি করতে ব্যর্থ অভিজ্ঞ উইকেটকিপার। এভাবে তিন বলের মধ্যে
দুবার জীবন পেয়ে শেষ পর্যন্ত ফিফটি আদায় করে ম্যাচের ভাগ্যটাই লিখে দিলেন
এডওয়ার্ডস।
এরপর ২৩০ রানের সাদামাটা টার্গেট
তাড়া করতে নেমে ১৪২ রানে শেষ বাংলাদেশ। পল ফন মিকিরেন একাই নিলেন নাজমুল শান্ত,
সাকিব ও মুশফিকের মতো দলের তিন সেরা ব্যাটারকে, আর শেষ দিকে তাসকিন আহমেদকে। সব
মিলে ২৩ রানে তার শিকার চার ‘টাইগার’। বাস ডি লিডি ২৫ রানে নেন দুটি উইকেট।
এই লিডির কথা না বললেই নয়। আগের
ম্যাচে অস্ট্রেলিয়ার কাছে রেকর্ড রানে হারের পথে তিনি ১০ ওভারে দিয়েছিলেন
বিশ্বরেকর্ড ১১৫ রান। ইডেনে নিজের পরে ম্যাচে তার বলে খেই হারালেন মেহেদী হাসান
মিরাজ ও মাহমুদউল্লাহ।
৩০৯ রানের লজ্জাজনক হারের পর
ডাচরা ফিরল। হতাশায় মুষড়ে না পড়ে ফিরলেন ডি লিডিও। কিন্তু টাইগাররা কেন ফিরতে পারে
না? তারা কি কোটি ক্রিকেট অনুরাগীর মনে আকুতি বুঝতে পারেন না?
আগের ছয়টি বিশ্বকাপের মধ্যে
বাংলাদেশের সবচেয়ে খারাপ কেটেছে ২০০৩ আসর। দক্ষিণ আফ্রিকায় অনুষ্ঠিত সেই আসরে
কানাডা ও কেনিয়ার মতো দলের কাছেও হেরেছে খালেদ মাসুদ পাইলটের দল। জয়হীন দল দেশে
ফেরে সেবার। এবার শুরুতে আফগানদের হারালেও পরের পাঁচটিতেই হেরেছেন সাকিবরা। বাকি
তিন ম্যাচের ফল যা-ই হোক না কেন, টানা পাঁচ হারে সমর্থকদের হৃদয় ভেঙে চূর্ণবিচূর্ণ।
তারা চরম আশাহত।
২০০৩ ও ২০২৩ সাল কি এক? মাঝে
কেটে গেছে ২০ বছর। এ সময় ক্রিকেটে এসেছে অনেক পরিবর্তন। বাংলাদেশ টেস্ট পরিবারের
নিয়মিত মুখ। বিশ্বকাপেও। এমনকি গত পাঁচ-ছয় বছর ধরে ওয়ানডেতে নিজেদের মাঠে একটি
শক্তি হিসেবে আবির্ভুত হয়েছে টাইগাররা। ভারত, ইংল্যান্ডসহ অনেক বড় দলকে ঘরের মাঠে
ওয়ানডে সিরিজে হারিয়েছে বাংলাদেশ। বাংলাদেশে এসে টি২০ সিরিজে ধরাশায়ী হয়েছে
অস্ট্রেলিয়া ও নিউজিল্যান্ডের মতো পরাশক্তি।
তামিম ইকবালের নেতৃত্বে বাংলাদেশ
দল এ বছর জুন পর্যন্ত আইসিসি সুপার লিগ টেবিলে তিনে ছিল, সেকথা নিশ্চয়ই খুব আগের
নয়। সুপার লিগ টেবিলে দাপট দেখিয়ে বাংলাদেশ বিশ্বকাপে জায়গা পায়। তারা ২৪ ম্যাচের
মধ্যে ১৫টি জয় পায়। বিশ্ব এলিটদের চোখে চোখ রেখে লড়া সেই টাইগারা কি এই টাইগার?
নিশ্চিতভাবেই না। তামিমের নেতৃত্বে যে দল সুপার লিগ টেবিলের একের পর এক দলকে ধরাশায়ী করেছে, সেই দলের মধ্যে যে ঐক্য আর সুর ছিল, তা কেটে গেছে। এখন দলের মধ্যে হাহাকার আর দ্বন্দ্বের খবর। তার সূচনা হয় অধিনায়ক সাকিবের হাত ধরেই। বিশ্বকাপের আগে তামিম ইকবালকে স্কোয়াডে না রাখা নিয়ে দেশের ক্রিকেটে বড় ঝড় বয়ে যায়। ‘আনফিট’ কোনো খেলোয়াড়কে দলে নিতে অনীহা প্রকাশ করেন সাকিব, ফলে তামিমমে রাখেননি নির্বাচকরা। এ নিয়ে পরে আরো অনেক নাটক হয়।
তামিম হেরেছেন কিংবা জিতেছেন, সেটি পরের কথা।
সাকিব কিন্তু হেরে গেছেন। সেটি দলকে নেতৃত্ব দেয়ার বেলায় যেমন, নিজের
পারফরম্যান্সেও। আবার তামিমকে বাদ দেয়ার ক্ষেত্রে তিনি যে কলকাঠি নেড়েছেন বলে
অভিযোগ, বাংলাদেশের ভরাডুবির পর সেই কূটনীতিতেও তিনি সমর্থকের কাঠগড়ায় উঠতে চলেছেন।
কলকাতার সংবাদ প্রতিদিনের ক্রীড়া সাংবাদিক
রাজর্ষি গঙ্গোপাধ্যায় ম্যাচের দুদিন আগে সাকিবের ঢাকা-কলকাতা আসা যাওয়ার খবর ও
দলের বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে লিখেছিলেন, ‘ওয়াকিবহাল মহলের অনেকের বক্তব্য হলো, বাংলাদেশ
টিমের অন্দরমহলের দশা বেশ গুরুগম্ভীর। ক্রিকেটাররা নাকি সব বিচ্ছিন্ন দ্বীপের মতো একাকী
ভাসমান। খেলা বাদে কেউ কারও সঙ্গে খুব একটা কথা বলেন না।’
বাংলাদেশ দলের ড্রেসিংরুমের বর্তমান দশা যে
সত্যিই সুখকর নয়, সেটি দিবালোকের মতোই পরিষ্কার।
কমলা-ঝড়ের
কবলে পড়ে সেমিফাইনাল স্বপ্নের সমাধির পর এবার সাকিবের আশা, টুর্নামেন্টটা ভালোভাবে
শেষ করা। ম্যাচ শেষে সংবাদ সম্মেলনে তিনি বলেছেন, ‘ধরুন, র্যাংকিংয়ে আটের ভেতর থাকতে
হবে, যদি চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফি খেলতে হয়। সেই জায়গা থেকেও এখনো তিনটি ম্যাচ আছে। এই অবস্থা
থেকে ঘুরে দাঁড়ানো কঠিন। তবে আমাদের চেষ্টা করতেই হবে এবং এই ১৫ জনকেই চেষ্টা করতে
হবে।’ তিনি আরো বলেন, ‘আমরা দল হিসেবে এতটা খারাপ নই। এটা হয়তো বিশ্বকাপের মতো বড়
আসরে প্রত্যাশার চাপের কারণেই হচ্ছে।’
সাকিবের
মতোই সমর্থকরাও চাইবেন, টাইগাররা যেন ফিরে আসে। তবে তার আগে এটা অনুধাবন করা বিশেষ
প্রয়োজন, ক্রিকেটাররা যেন দেশের প্রতি নিজেদের অঙ্গীকারের কথাটি ভুলে না যায়।










