নরওয়ের কাছে ৪-১ গোলের বড় ব্যবধানে পরাজয়টি হয়তো পরিসংখ্যানের পাতায় ইরাকের জন্য একটি আক্ষেপের দাগ হয়েই থাকবে। কিন্তু ম্যাচের ৩৯তম মিনিটে যখন ইরাকি স্ট্রাইকার আয়মান হুসেইনের মাথা ছুঁয়ে বলটি প্রতিপক্ষের জালের ঠিকানা খুঁজে নিল—এটা ছিল দীর্ঘ ৪০ বছরের দীর্ঘশ্বাস আর অপেক্ষার প্রহর শেষে বিশ্বকাপ মঞ্চে ফেরা এক যুদ্ধবিধ্বস্ত জাতির জন্য মাহেন্দ্রক্ষণ। বিশ্বকাপের মতো মহাযজ্ঞে এটি ইরাকের ইতিহাসের মাত্র দ্বিতীয় গোল। আর এ জাদুকরী মুহূর্তের রূপকার আয়মান হুসেইন যেন ধ্বংসস্তূপ থেকে উড়ে আসা এক ফিনিক্স পাখি, যে নিজের পুঞ্জীভূত শোকের ছাইভস্ম থেকে ডানা মেলেছে বিশ্বমঞ্চের উজ্জ্বলতম আলোয়।
আয়মানের এ উঠে আসার যাত্রাপথ আর দশজন সাধারণ ফুটবলারের মতো মসৃণ নয়। বারুদ আর রক্তে ভেজা, কান্নায় ভারী হয়ে থাকা ইরাকে তার বেড়ে ওঠা। যেখানে রাজনৈতিক অস্থিরতা, বোমার শব্দ আর প্রতিদিনের মৃত্যু সংবাদের মাঝেই ফুটবল ছিল সাধারণ মানুষের বেঁচে থাকার, একটু দম নেয়ার একমাত্র জানালা। ২০০৭ সালে এশিয়ান কাপে ইরাকের অবিস্মরণীয় জয় যখন পুরো দেশকে এক বিরল ঐক্যের উৎসবে ভাসিয়েছিল, সে আনন্দের বুকেও বিঁধেছিল বিষাদময় শোকের তীর। রাস্তায় নেমে আসা উন্মত্ত সমর্থকদের ওপর চালানো আত্মঘাতী হামলায় ঝরে গিয়েছিল অসংখ্য তাজা প্রাণ। সেই মৃত্যুপুরীর বিভীষিকায় দাঁড়িয়েই ফুটবলের প্রেমে পড়েছিলেন আয়মান। কিন্তু নিয়তির চিত্রনাট্য যে তার নিজের জীবনের জন্য আরো নির্মম এক ট্র্যাজেডি সাজিয়ে রেখেছিল, তা কে জানত। ২০০৮ সাল, আয়মানের বয়স তখন মাত্র ১২। আল কায়েদার সশস্ত্র সদস্যের নির্মম বুলেটের আঘাতে প্রাণ হারান তার বাবা। এর কয়েক বছর পর অপহৃত হন তার বড় ভাই, আজ পর্যন্ত যার কোনো খোঁজ মেলেনি।
সংসারের পাহাড়সম ভার এসে পড়ে কিশোর আয়মানের কাঁধে। ফুটবলার হওয়ার মায়া ত্যাগ করে পরিবারের মুখে অন্ন তুলে দেয়ার হাল ধরতে চেয়েছিলেন তিনি। সে ছেলেই একদিন নিজের দেশকে ৪০ বছর পর বিশ্বকাপে ফিরিয়ে আনবেন, এমন গল্প হয়তো কোনো চিত্রনাট্যকারও লিখতে সাহস করতেন না। কিন্তু ফুটবল মাঝে মাঝে বাস্তবকেও কল্পনার চেয়ে বেশি নাটকীয় করে তোলে। ইরাকের আয়মান হুসেইনের গল্পটি তেমনই।
এই তো কদিন আগে, স্বপ্নের বিশ্বকাপে পা রাখার ঠিক আগমুহূর্তেও এক অচেনা লড়াইয়ের মুখোমুখি হতে হয় তাকে। শিকাগোর বিমানবন্দরে পৌঁছার পর টানা ৭ ঘণ্টা তাকে আটকে রেখে কঠোর জিজ্ঞাসাবাদ করেন মার্কিন ইমিগ্রেশন কর্মকর্তারা। বিশ্বকাপের আগে নিজের ক্লাব আল-কারমায় পুরো মৌসুমজুড়েই ভুগেছেন একের পর এক শারীরিক চোটে। কিন্তু কোনো বাধাই, কোনো অপমানই মেসোপটেমিয়ার এ অদম্য সিংহকে দমাতে পারেনি। বিশ্বকাপ বাছাইপর্বে এক ডজন গোল করে তিনি প্রমাণ করেছেন, পেনাল্টি বক্সের ভেতর তিনি কতটা ভয়ংকর এক শিকারি। বলিভিয়ার বিপক্ষে তার সেই চোখ ধাঁধানো জয়সূচক গোলটিই তো ইরাকের কোটি মানুষের হাতে তুলে দিয়েছিল স্বপ্নের বিশ্বকাপের টিকিট।
নরওয়ের বিপক্ষে ইরাকের বিশ্বকাপ অভিষেক ম্যাচের স্কোরলাইন হয়তো নিরেট অক্ষরে চিরকাল লিখে রাখবে যে তারা ১-৪ গোলে হেরেছে। ম্যাচের একেবারে শেষ লগ্নে এসে হুসেইনের পা ছুঁয়ে নিজেদের জালে জড়িয়ে যাওয়া সেই দুর্ভাগ্যজনক আত্মঘাতী গোলটিও যেন পরাজয়ের ক্ষতকে করে তুলেছে আরো বেশি তিক্ত। কিন্তু আয়মান হুসেইনের এ গল্প শুধু হার-জিতের ছকে বাঁধা নয়। তার রক্তক্ষরা জীবনযুদ্ধ গোটা বিশ্বকে আজন্ম এক অমোঘ সত্য প্রমাণ করে দিয়ে গেছে যে যুদ্ধ, স্বজন হারানোর অবর্ণনীয় বেদনা আর হাজারো প্রতিবন্ধকতার পথ পেরিয়েও কেবল অদম্য ইচ্ছাশক্তির জোরে মানুষ সর্বোচ্চ চূড়ায় পৌঁছতে পারে। তিনি প্রমাণ করেছেন, স্বপ্নের পথ যতই বন্ধুর হোক, বিশ্বাস আর অধ্যবসায় থাকলে একদিন সে পথই বিশ্বের সবচেয়ে বড় মঞ্চে গিয়ে মিশতে পারে।










