আর্জেন্টাইন সুপারস্টার লিওনেল মেসিকে সই করানো যে ইন্টার মিয়ামি ফুটবল ক্লাবের ইতিহাসে সেরা সাফল্য সেটা চোখ বন্ধ করেই বলে দেয়া যায়। সাতবারের ব্যালন ডি’অরজয়ী ফুটবলারের আগমনে এরই মধ্যে আমেরিকান ফুটবলে জাগরণ সৃষ্টি হয়েছে। সম্প্রতি ইন্টার মিয়ামির প্রেসিডেন্ট জর্জ ম্যাস এল ক্লাব দেল দেপোরতিস্তাকে এক সাক্ষাৎকারে বলেছেন, মেসি যুক্তরাষ্ট্রের গোটা ক্রীড়া জগৎকেই বদলে দেবেন।

১৫০ মিলিয়ন ডলারে আড়াই বছরের জন্য মিয়ামি=র সঙ্গে চুক্তি করেছেন মেসি। এ চুক্তির সঙ্গে যুক্ত রয়েছে এডিডাস ও অ্যাপলের মতো খ্যাতিমান কোম্পানিও। যদিও এখানে মেজর লিগ সকার কোনো ভর্তুকি দিচ্ছে না। 

মাঠে ও মাঠের বাইরে থেকে মেসি যত আয় করেছেন, সেই হিসেবে ২০২৫ সালের পর তার ক্যারিয়ার আয় ১৬০ কোটি ডলারে পৌঁছাবে, যা তাকে ইতিহাসের শীর্ষ পাঁচে জায়গা করে দেবে। 

মিয়ামিতে বছরে ৫০ থেকে ৬০ মিলিয়ন ইউরো আয় করবেন মেসি। বার্সেলোনায় পেতেন ১০০ মিলিয়ন ইউরোর মতো। আর পিএসজিতে ৭০ মিলিয়ন ডলারের মতো। আবার সৌদি আরবে বছরে ৪০০ মিলিয়ন ডলারের লোভনীয় প্রস্তাব ছিল। কাজেই শুধু যে অর্থের জন্য মেসি যুক্তরাষ্ট্রে গেছেন, সেটি মোটেও সঠিক নয়। এখানে বরং কমই আয় করবেন। 

তবে মেসিকে আনতে অনেক পরিশ্রম করতে হয়েছে ইন্টার মালিক জর্জ ম্যাসকে। তিনি স্বীকারও করেন, এটা সহজ কাজ ছিল না। কিন্তু তাদের এ পরিশ্রমই আজ মেজর লিগ সকারকে (এমএলএস) বিশ্ব ফুটবলের মানচিত্রে জায়গা করে দিয়েছে। লিওনেল মেসির আগমনই এর কারণ। তার কারণেই আজ আলোচনায় এমএলএস। 

খ্যাতিমান ব্যবসায়ী জর্জ ম্যাস বলেন, ‘আমি সব সময়ই মেসিকে সই করানোর স্বপ্ন দেখতাম। আমি তাকে ইন্টারে আনার চেষ্টা করেছি বলে অনেকেই আমাকে পাগল বলেছে। ২০১৯ সালে আমি হোর্হে মেসির (লিওনেল মেসির বাবা) সঙ্গে একটি বৈঠকের আয়োজন করি। আমি ও ডেভিড বেকহ্যাম তাকে ৩ ঘণ্টা ধরে মিয়ামিতে আমাদের প্রকল্প সম্পর্কে ব্যাখ্যা দিয়েছি।’

তিনি মেসির আগমন ও এর প্রভাব নিয়ে বলছেন, ‘আমি আমেরিকান ফুটবলের ইতিহাসকে তিনটি ধাপে দেখি: ১৯৭২ সালে পেলের কসমসে আগমন, লস অ্যাঞ্জেলেস গ্যালাক্সিতে বেকহ্যামের আগমন ও মিয়ামিতে মেসির আগমন।’  

মেসির আগমনে যুক্তরাষ্ট্রের ফুটবলে রীতিমতো বিপ্লব ঘটে গেছে। এখন এ লিগটির দিকে অনেকের নজর, যে লিগের আরো বড় হওয়ার সুযোগ রয়েছে। জর্জ ম্যাস বলেন, ‘এমএলএস একটু ভিন্ন। যখনই আমরা অ্যাওয়েতে খেলি, স্টেডিয়াম পূর্ণ থাকে। লিওনেল মেসিকে যেভাবে স্বাগত জানানো হচ্ছে, তা নজিরবিহীন। নিউইয়র্কে ৩০ হাজার দর্শকের ৮০ ভাগই মেসির নাম ধরে গলা ফাটিয়েছেন। তাদের পরনে আর্জেন্টিনার জার্সি ও ইন্টার মিয়ামির গোলাপি জার্সি ছিল। আমি এতে হতবিহ্বল হয়েছি, এমনটি প্রত্যাশা ছিল না। লিওনেল মেসির প্রভাবেই এ লিগটি জেগে উঠেছে এবং এখন আমেরিকান লিগ দেখছে বিশ্বের মানুষ। নিশ্চিতভাবেই মেসির আগমনের আগে ও পরের চিত্রটা এক সময় মানুষ তুলনা করবে।’

পরিশেষে গোপনীয় কথাটি প্রকাশ করলেন জর্জ ম্যাস। তিনি লিওনেল মেসির বাবার সঙ্গে কথা বলে কীভাবে খেলোয়াড়টিকে রাজি করিয়েছিলেন সেই গল্পটিও শোনালেন। তার কথায়, ‘আমি তাকে (হোর্হে মেসি) বললাম, আপনার ছেলের সামনে নতুন একটি লিগ্যাসি সৃষ্টির সুযোগ এসেছে, কেননা সে এ দেশটির ক্রীড়াই পাল্টে দেয়ার সামর্থ্য রাখে এবং এটি খুব কম অ্যাথলেটই জীবনে পান।’

তিনি আরো বলেন, ‘আমি হোর্হের সঙ্গে ধারাবাহিকভাবে যোগাযোগ করে যাই। লিওনেল মেসি ও তার পরিবারকে রাজি করাতে আমাদের সাড়ে চার বছরের মতো সময় লেগে যায়। আমি এটা জানতে পারি, লিওনেল মেসি মিয়ামিতে আসতে চলেছেন। আমি লিওনেল মেসির সঙ্গে মিয়ামি, তার পরিবার, তার ভবিষ্যৎ নিয়ে কথা বলতে অনেক সময় ব্যয় করেছি এবং বুঝতে পেরেছি বিশ্বকাপের পর হয়তো এ ব্যাপারে কাছাকাছি চলে যাব আমরা।’

মেসিকে যখন মিয়ামি এয়ারপোর্টে দেখেন তখন নিজের কাছেই যেন বিশ্বাস হচ্ছিল না তা জর্জ ম্যাসের। তবু তিনি মনে মনে বলছিলেন, ‘উফ, এটা বাস্তব।’ তিনি বলেন, ‘মেসিকে নিয়ে এখন অনেক গল্প তৈরি হবে, ইতিহাস হবে। আসলে মেসি বার্সেলোনার সমর্থকদের বিদায় বলেও আসতে পারেননি। অথচ এ ক্লাবেই তিনি শৈশবে যোগ দেন এবং প্রায় আজীবন কাটিয়ে দেন। লিওনেল মেসিও প্রথমে মন থেকে ক্লাবটি ছাড়তে চাননি। আমি তাকে সব রকম প্রতিশ্রুতি দিয়েছি যে, তিনি যাতে বার্সার সমর্থকদের কাছ থেকে বিদায় নিতে পারেন, সেই সুযোগ আমি তাকে যেকোনো মূল্যেই করে দেব। ইন্টার মিয়ামি এমন ম্যাচ আয়োজনে সবকিছু করবে।’ 

সাতবারের ব্যালন ডি’অরজয়ী ও বর্তমান বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন মেসি চোটে পড়ে ইন্টার মিয়ামির হয়ে টানা চার ম্যাচ খেলতে পারেননি। সর্বশেষ শিকাগো ফায়ারের কাছে ১-৪ গোলে হেরেছে তার দল। এ হারে এমএলএসের প্লে-অফে ওঠার ক্ষীণ সম্ভাবনাও ধাক্কা খেল মিয়ামির। যদিও আশার কথা, শিগগিরই ফিরতে পারেন ৩৬ বছর বয়সী ফুটবলার। শনিবার (বাংলাদেশ সময় আজ ভোর ৫.৩০টা) ইস্টার্ন কনফারেন্স লিডার এফসি সিনসিনাটির মুখোমুখি হবে মিয়ামি। ইন্টার কোচ জেরার্ডো ‘টাটা’ মার্টিনো জানিয়েছেন, এ ম্যাচে কিছু সময় খেলবেন মেসি। মার্কা, স্পোর্টিকো 

আর্জেন্টিনার বিশ্বকাপ বাছাই ম্যাচের জন্যও তাকে ডাকা হয়েছে। আগামী সপ্তাহে তিনি দক্ষিণ আমেরিকা সফরে যাচ্ছেন। 

প্লে-অফ পজিশন থেকে পাঁচ পয়েন্ট দূরে মিয়ামি, তারা নবম স্থানধারী মন্ট্রিয়লের চেয়ে এক ম্যাচ কম খেলেছে। মিয়ামির বাকি আছে তিন ম্যাচ। এরপর তারা ব্যাক টু ব্যাক ম্যাচ খেলবে শারলট এফসির বিপক্ষে। প্লে-অফে জায়গা করে নিতে বাকি তিন ম্যাচেই জয় তুলে নিতে হবে মেসির দলকে। কাজেই তিনি না ফিরলে কাজটি কঠিনই হবে তাদের জন্য। 

সেপ্টেম্বরে বলিভিয়ার বিপক্ষে বিশ্বকাপ বাছাই ম্যাচে আর্জেন্টিনা ৩-০ গোলে জয়লাভ করে। ওই ম্যাচে অল্প সময়ের জন্য খেলেন মেসি। তখনই তার চোট নিয়ে গুঞ্জন ওঠে। যদিও চোট কী ধরনের, তা বলা হয়নি। পরে ২০ সেপ্টেম্বর টরন্টোর বিপক্ষে মিয়ামির হয়ে মাঠে ফিরলেও প্রথমার্ধেই তাকে মাঠ ছাড়তে হয়। সেই থেকে আর খেলেননি ফুটবলের এ সুপারস্টার।