নতুন মালিক পেতে যাচ্ছে ইংলিশ প্রিমিয়ার লিগের ক্লাব এভারটন। বর্তমান মালিক ফরহাদ মশিরি তার ৯৪ শতাংশ শেয়ার আমেরিকান ইনভেস্টমেন্ট ফান্ড ‘৭৭৭ পার্টনার্স’-এর কাছে বিক্রিতে সম্মত হয়েছেন। এর মধ্য দিয়ে এভারটনে ফরহাদ মশিরির অধ্যায়ের সমাপ্তি হতে চলেছে। ব্রিটিশ-ইরানি এ ব্যবসায়ী ২০১৬ সালে এভারটনে প্রথম বিনিয়োগ করেন। যদিও তার সময় লিভারপুল শহরের ক্লাবটি বেশ টালমাটাল অধ্যায় পার করে।

দুই পক্ষের মধ্যে আলাপ-আলোচনা শেষ পর্যায়ে। মালিকানা হস্তান্তর এখন সময়ের ব্যাপার মাত্র। প্রিমিয়ার লিগ, ফুটবল অ্যাসোসিয়েশন ও ফাইন্যান্সিয়াল কনডাক্ট অথরিটির অনুমোদন পেলেই এভারটন ক্লাব বিক্রির চুক্তি চূড়ান্ত হবে। চুক্তি সম্পন্ন হলে এটা নিশ্চিত হয়ে যাবে, ইংলিশ প্রিমিয়ার লিগে ২০টি ক্লাবের মধ্যে অর্ধেকের মালিকানা আমেরিকানদের হাতে। 

এক বিবৃতিতে মশিরি বলেছেন, ‘সাত বছর আগে আমি যখন এভারটনে বিনিয়োগ করি, তখন থেকে শীর্ষ ফুটবল ক্লাবের মালিকানার ধরন ও বিনিয়োগে এসেছে বিরাট পরিবর্তন। বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই সাধারণ মালিক/হিতকারীদের দিন ফুরিয়ে আসছে এবং এখন মালিকানায় আসছে প্রাইভেট ইকুইটি ফার্ম, বিশেষ করে ক্রীড়ায় বিনিয়োগে বিশেষজ্ঞ কিংবা রাষ্ট্র নিয়ন্ত্রিত কোম্পানি ও ফান্ডগুলো।’

এভারটনের মালিকানা নেয়ার পর ক্লাবটির জন্য বিশ্বকাপের একটি স্টেডিয়াম নির্মাণ করতে চায় ৭৭৭ পার্টনার্স। 

নতুন মৌসুমে প্রথম চার ম্যাচ থেমে মাত্র ১ পয়েন্ট সংগ্রহ করে টেবিলের ১৮তম স্থানে অবস্থান করছে এভারটন। গত দুটি মৌসুমেই যাচ্ছেতাই পারফর্ম করে দলটি এবং কোনোভাবে রেলিগেশন এড়াতে সক্ষম হয়। সর্বশেষ মৌসুমে শেষ দিন শেষ ম্যাচ জিতে প্রিমিয়ার লিগে টিকে থাকে ক্লাবটি। 

আগামী মাসেই স্বাধীন কমিশনের মুখোমুখি হতে হবে এভারটনকে। তাদের বিরুদ্ধে প্রিমিয়ার লিগের ফাইন্যান্সিয়াল ফেয়ার প্লে নিয়ম ভাঙার অভিযোগ উঠেছে। যদিও ক্লাবটির পক্ষ থেকে কোনো ধরনের অপরাধ করার কথা অস্বীকার করা হয়েছে।

গত মার্চে ক্লাবটি টানা পঞ্চম মৌসুমের মতো আর্থিকভাবে লোকসানের ঘোষণা দেয়। এ সময় ক্লাবটির মোট লোকসান দাঁড়িয়েছে ৪৩ কোটি পাউন্ড (প্রায় ৫ হাজার ৯০০ কোটি টাকা)। 

এরই মধ্যে ক্লাবটি ব্র্যামলে-মুর ডকে নতুন স্টেডিয়াম নির্মাণের পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে, যাতে ব্যয় হবে ৭৬ কোটি পাউন্ড। গত বছর খরচের যে কোটেশন দেয়া হয়েছিল এখন তার চেয়ে ২৬ কোটি বেশি খরচ হবে।

স্টেডিয়াম নির্মাণের উদ্যোগ নিয়ে মশিরি বলেন, ‘নতুন বিনিয়োগ আসার ক্ষেত্রে আমি খুবই খোলামনের এবং সব সময়ই চেয়েছি ক্লাবের নতুন একটি স্টেডিয়াম হোক। তাই তো মার্সি নদীর তীরের ব্র্যামলে-মুর ডকে স্টেডিয়াম নির্মাণের উদ্যোগ নিয়েছি। আমি অনেককে ফোন দিয়েছি এবং অনেকের সঙ্গে আলাপ করেছি। যদিও আমার কাছে ৭৭৭ পার্টনার্সকে এভারটন ক্লাবের জন্য সেরা অংশীদার মনে হয়েছে, যাদের হাত ধরে ক্লাবটি তার লক্ষ্যপূরণে সামনে এগিয়ে যেতে পারবে।’

গত অক্টোবর মাসে বোর্নমাউথের মালিকানায় আসেন আমেরিকান ব্যবসায়ী বিল ফোলি। তাতে ইংলিশ প্রিমিয়ার লিগের দশম ক্লাব হিসেবে আমেরিকান মালিকানায় চলে যায় বোর্নমাউথ। ২০২২-২৩ মৌসুমে প্রিমিয়ার লিগ থেকে অবনমিত হয়ে যায় লিডস ইউনাইটেড। আমেরিকান মালিকানার নয়টি দল টিকে থাকে তখন। কিন্তু এ ‘শূন্যতা’ দ্রুতই পূরণ হতে চলেছে। এভারটনের মালিকানা হস্তান্তর হলেই আবার প্রিমিয়ার লিগের ১০টি ক্লাবের মালিকানা যাবে আমেরিকানদের হাতে। 

ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড, ম্যানচেস্টার সিটি (আংশিক), লিভারপুল, চেলসি, আর্সেনালের মতো সবক’টি বড় ক্লাবেই আমেরিকান বিনিয়োগ। এছাড়া বর্তমানে প্রিমিয়ার লিগে খেলে এমন ক্লাবের মধ্যে আমেরিকান বিনিয়োগে চলছে অ্যাস্টন ভিলা, ফুলহ্যাম, বোর্নমাউথ ও ক্রিস্টাল প্যালেস। এ তালিকায় শিগগিরই যুক্ত হতে চলেছে এভারটন। 

ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডের মালিক যুক্তরাষ্ট্রের গ্লেজার পরিবার। তারা এখান থেকে বিনিয়োগ গুটিয়ে নিতে চায়। কাতারি ব্যাংকার শেখ জসিম, ব্রিটিশ ধনকুবের স্যার জিম র‍্যাটক্লিফসহ একাধিক আগ্রহী ক্রেতা রয়েছেন। এ ক্লাবটি বিক্রি হয়ে গেলেও আরো আমেরিকানরা ইংলিশ প্রিমিয়ার লিগে আসতে পারেন। 

লাস ভেগাসের ধনকুবের ফোলি মাত্র ১৮ কোটি ৫০ লাখ পাউন্ডে কিনেছেন বোর্নমাউথ ক্লাব। তিনি মেজর লিগ সকারের একটি দল কিনতে চেয়েছিলেন। যদিও তাতে প্রায় ১০০ কোটি পাউন্ড লেগে যেত বলে তিনি সিদ্ধান্ত পাল্টে পরবর্তী সময়ে বোর্নমাউথের দিকে হাত বাড়ান। তিনি অনেকটা সস্তায় প্রিমিয়ার লিগে ক্লাব পেয়েছেন। তার তুলনায় অনেক অনেক বেশি বিনিয়োগ করেছেন গ্লেজার পরিবার (ম্যানইউ), টড বোহলি (চেলসি) কিংবা জন হেনরি (লিভারপুল)। গুঞ্জন রয়েছে, ম্যানইউর জন্য ৭২০ কোটি পাউন্ড দর হাঁকাচ্ছে দ্য গ্লেজার! তবে শেখ জসিম ৪৭০ কোটি পাউন্ড এবং র‍্যাটক্লিফের চেয়ে কম দর প্রস্তাব করেছেন বলে জানায় ডেইলি মেইল। 

গ্লেজার পরিবার ২০০৫ সালে ম্যানইউর মালিকানায় আসে। তারাই প্রথম আমেরিকান হিসেবে প্রিমিয়ার লিগে নাম লেখায়। তাদের দেখাদেখি এরপর প্রায় এক ডজন আমেরিকান বিনিয়োগকারী প্রিমিয়ার লিগে নাম লেখান।  

ইংলিশ প্রিমিয়ার লিগে আমেরিকান মালিকদের মধ্যে সবচেয়ে ধনী আর্সেনালের স্ট্যান ক্রোয়েঙ্কে। এ রিয়েল এস্টেট মোগল ২০০৭ সালে ৯ দশমিক ৯ শতাংশ শেয়ার কিনে আর্সেনালে নাম লেখান। পরে ক্লাবের পুরো মালিকানা নিয়ে নেন। তিনি প্রায় ১ হাজার ২৯০ কোটি ডলারের মালিক। এছাড়া ফুলহ্যামের শহীদ খান ১ হাজার ২১১ কোটি ডলার, ক্রিস্টাল প্যালেসের জস হ্যারিস ৬২০ কোটি পাউন্ড, চেলসির টড বোহলি ৫৩০ কোটি ডলার, গ্লেজার পরিবার ৪৭০ কোটি ডলার, অ্যাস্টন ভিলার মালিক ওয়েস ইডেনস ৪৩০ কোটি ডলার, জন হেনরি ৪০০ কোটি ডলার, বোর্নমাউথ মালিক বিল ফোলি ১২০ কোটি ডলারের মালিক।

বিবিসি ও ডেইলি মেইল