ম্যাথেউস কুনহার জোড়া গোল আর ভিনিসিয়ুস জুনিয়রের এক গোল ও এক অ্যাসিস্টে শুধু স্বস্তির জয়ই পায়নি সেলেসাওরা, দেখা মিলেছে আত্মবিশ্বাসী, সৃজনশীল ও প্রাণবন্ত এক ব্রাজিলেরও। খেলা দেখে মনে হয়েছে, ব্রাজিল কেবল ম্যাচ জিততে মাঠে নামেনি; খুঁজে ফিরেছে নিজেদের ফুটবলীয় ঐতিহ্য। আর সেই পথচলায় সবচেয়ে বড় কারিগর ভিনিসিয়ুস ও কুনহা। তাদের যুগলবন্দিতেই নতুন করে ছন্দ খুঁজে পাচ্ছে কার্লো আনচেলত্তির ব্রাজিল।
তবে স্কোরলাইন যতটা স্বস্তির, ম্যাচের শুরুটা তেমন ছিল না। বরং প্রথম কয়েক মিনিটে ব্রাজিলকে দেখে মনে হচ্ছিল, তারা এখনো মরক্কো ম্যাচের ছায়া থেকে পুরোপুরি বের হতে পারেনি। বল ছিল তাদের কাছে, কিন্তু ছন্দ ছিল না। সেখান থেকে ব্রাজিলকে উদ্ধার করলেন ম্যাথেউস কুনহা।
প্রথম গোলটি ছিল কিছুটা সৌভাগ্য ও তীক্ষ্ণ উপস্থিত বুদ্ধির ফল। ভিনিসিয়ুসের শট গোলরক্ষক ঠেকানোর পর হ্যানেস ডেলক্রোয়ার ক্লিয়ারেন্সের চেষ্টা গিয়ে লাগে কুনহার পায়ে, সেখান থেকেই বল জালে। কিন্তু দ্বিতীয় গোলটি ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন। লুকাস প্যাকেতা মাঝমাঠে বল কাড়লেন। মুহূর্তের মধ্যে বল পৌঁছাল ভিনিসিয়ুস জুনিয়রের কাছে। তিনি সামনে ছুটলেন। হাইতির রক্ষণভাগ পিছিয়ে যেতে লাগল। সেই সময় কুনহার দৌড় ছিল অভিজ্ঞ শিকারির মতো। তিনি সরাসরি গোলের দিকে না গিয়ে তির্যকভাবে এগোলেন, যাতে রক্ষণভাগের ভারসাম্য নষ্ট হয়। ভিনিসিয়ুস সেটি বুঝলেন। একটি নিখুঁত পাস। তারপর যা ঘটল, সেটিকে শিল্প বললে অত্যুক্তি হবে না।
বল নিয়ন্ত্রণের সময় কুনহার শরীরের ভারসাম্য প্রায় নষ্ট হয়ে গিয়েছিল। সাধারণ কোনো ফরওয়ার্ড হয়তো বল থামিয়ে নতুন করে আক্রমণ সাজাতেন। কিন্তু কুনহা যেন অন্য ধাতুতে গড়া। মাটিতে পড়ে যেতে যেতে বাঁ পায়ে এমন এক শট নিলেন, যা সোজা গিয়ে আঘাত হানে জালে।
কুনহার গোলের পর বদলে যায় ম্যাচের চেহারা। হাইতির বিপক্ষে প্রথমার্ধের শেষ ১০ মিনিটে চিরচেনা সাম্বা ফুটবলের কিছু ঝলক দেখা গেছে।
কুনহার দ্বিতীয় গোলের পর ভিনিসিয়ুস জুনিয়র যেন আরো স্বাধীন হয়ে ওঠেন। তার গতি, ড্রিবলিং, জায়গা খুঁজে নেয়ার ক্ষমতা—সবকিছু একসঙ্গে কাজ করতে শুরু করে। তৃতীয় গোলটির সময় প্যাকেতার পাসটি যেমন চমৎকার ছিল, তেমনি অসাধারণ ছিল ভিনিসিয়ুসের সিদ্ধান্ত। তিনি তাড়াহুড়ো করেননি। গোলরক্ষক জনি প্লাসিদের অবস্থান দেখেছেন, সময় নিয়েছেন, তারপর দুই পায়ের মাঝ দিয়ে বল জালে পাঠিয়েছেন।
ব্রাজিলের হয়ে একবিংশ শতাব্দীতে বিশ্বকাপের প্রথম দুই ম্যাচে অন্তত তিনটি গোল অবদানে নাম লেখানো খেলোয়াড়ের তালিকায় এর আগে ছিলেন শুধু রিভালদো ও এলানো। এখন সেখানে যোগ হয়েছে ভিনিসিয়ুসের নাম।
ম্যাচের আরেকটি তাৎপর্যপূর্ণ দিক ছিল ব্রাজিলের রক্ষণভাগ। মরক্কোর বিপক্ষে মাঝমাঠ ও ডিফেন্সের ফাঁক নিয়ে ব্যাপক সমালোচনা হয়েছিল। কিন্তু হাইতি ম্যাচের প্রথমার্ধে কোনো শটই নিতে পারেনি। ১৯৯০ সালে স্কটল্যান্ডের বিপক্ষে ম্যাচের পর এই প্রথম বিশ্বকাপে কোনো প্রতিপক্ষকে প্রথমার্ধে শটবিহীন রাখতে পারল ব্রাজিল।
ব্রুনো গিমারাইস অসাধারণ খেলেছেন। বল পুনরুদ্ধার, জায়গা বন্ধ করা, আক্রমণ গড়ে দেয়া—সব ক্ষেত্রেই তার অবদান ছিল। প্যাকেতাও ছিলেন সৃষ্টিশীল। যদিও কাসেমিরো নিজের সেরা ছন্দে ছিলেন না।
তবে দ্বিতীয়ার্ধে উজ্জ্বলতা ধরে রাখতে পারেনি সেলেসাওরা। পুরো দ্বিতীয়ার্ধে মাত্র দুটি শট নিয়েছে তারা। ১৯৬৬ সালের পর বিশ্বকাপের কোনো অর্ধে ব্রাজিল এত কম শট নেয়নি। যা দেখিয়ে দিয়েছে, এখনো অনেক উন্নতির জায়গা রয়ে গেছে। আনচেলত্তিও ম্যাচ শেষে সেটিই স্বীকার করেছেন। তিনি বলেন, ‘ম্যাচ থেকে আমি যা আশা করেছিলাম, সেটাই পেয়েছি। ভুল কম ছিল, আক্রমণে আমরা বেশি কার্যকর ছিলাম এবং রক্ষণেও বেশ নিয়ন্ত্রণ ছিল। এটি ভালো একটি ম্যাচ ছিল, তবে অবশ্যই আমাদের আরো উন্নতি করতে হবে।’
ম্যাচে নজর কেড়েছে দুই তরুণের উপস্থিতি। রায়ান এবং এন্দ্রিক একসঙ্গে মাঠে নামার মধ্য দিয়ে ব্রাজিল ১৯৫৮ সালের পর প্রথমবার বিশ্বকাপে একই ম্যাচে ২০ বছরের কম বয়সী দুই খেলোয়াড়কে খেলাল। ১৯৫৮ সালে ছিলেন পেলে ও আলতাফিনি। এন্দ্রিক গোলও পেয়েছিলেন, যদিও অফসাইডের কারণে সেটি বাতিল হয়। কিন্তু তার উপস্থিতি, দৌড়, আত্মবিশ্বাস সবকিছুই দর্শকদের উচ্ছ্বসিত করেছে। এছাড়া হাইতির বিপক্ষে গোল করে ব্রাজিল বিশ্বকাপ ইতিহাসে নিজেদের গোলসংখ্যা ২৪১-এ উন্নীত করেছে। এর মাধ্যমে তারা জার্মানিকে পেছনে ফেলে আবারো বিশ্বকাপের সর্বোচ্চ গোলদাতা দল হয়েছে। হাইতির জন্য অবশ্য রাতটি ছিল বিদায়ের। ১৯৭৪ সালের পর প্রথমবার বিশ্বকাপে ফিরে আসা দলটি লড়াই করেছে, তবে তাদের বিশ্বকাপ যাত্রা এখানেই শেষ।
তবে জয়ের রাতেও ব্রাজিলের বড় অস্বস্তি রাফিনিয়ার চোট। প্রথম ৩৫ মিনিটে ডান প্রান্ত দিয়ে দারুণ সক্রিয় ছিলেন তিনি; অফসাইডের কারণে একটি গোলও বাতিল হয়। কিন্তু ৪০ মিনিটে সন্দেহজনক হ্যামস্ট্রিং চোটে মাঠ ছাড়তে হয় বার্সেলোনা উইঙ্গারকে। ম্যাচ শেষে আনচেলত্তি জানান, ‘রাফিনিয়ার অবস্থা মূল্যায়ন করতে হবে। কাল দেখা যাবে। আপাতত কী হয়েছে, আমরা জানি না।’ তবু ফিলাডেলফিয়ার রাত ব্রাজিলকে অন্তত এটুকু বিশ্বাস ফিরিয়ে দিয়েছে—আনচেলত্তির দল আবার ছন্দ খুঁজে পাচ্ছে, আর সেই পথে আলো দেখাচ্ছেন ভিনিসিয়ুস ও কুনহা।










