ভারতে চলমান ত্রয়োদশ ওয়ানডে বিশ্বকাপের মধ্যপথে এরই মধ্যে দু-দুবার দ্রুততম সেঞ্চুরির রেকর্ড ভাঙা ও গড়া হলো। দিল্লিতে ৭ অক্টোবর শ্রীলংকার বিপক্ষে ৪৯ বলে তিন অংক ছুঁয়ে বিশ্বকাপের দ্রুততম সেঞ্চুরির কীর্তি গড়েছিলেন দক্ষিণ আফ্রিকার ডানহাতি ব্যাটার এইডেন মার্করাম। ১৮ দিন পর সেই রেকর্ডও ভাঙল। কাকতালীয়ভাবে গত বুধবার সেই একই মাঠে মাত্র ৪০ বলে সেঞ্চুরি করেছেন অস্ট্রেলিয়ার গ্লেন ম্যাক্সওয়েল। তার কীর্তির দিন নেদারল্যান্ডসের বিপক্ষে ৯৩ বলে ১০৪ রানের ইনিংস খেলেন ডেভিড ওয়ার্নার। এছাড়া স্টিভ স্মিথ ও মার্নুষ লাবুশেন করেন ফিফটি। ডাচদের বিপক্ষে ৫০ ওভারে ৮ উইকেটে ৩৯৯ রানের সৌধ গড়ে অজিরা। পরে ডাচ শিবির মাত্র ৯০ রানে গুটিয়ে গেলে রেকর্ড ৩০৯ রানের স্মরণীয় জয় পায় পাঁচবারের বিশ্ব চ্যাম্পিয়নরা।

টানা দুই হারের পর অস্ট্রেলিয়ার টানা তিন ম্যাচ জিতে সেমিফাইনালের রেসে ফেরে। গতকাল বিকালের ম্যাচে তারা মুখোমুখি হয় নিউজিল্যান্ডের। এ ম্যাচে জিতে থাকলে তারা উঠে যাবে টেবিলের তিনে।

 বুধবার বিশ্বকাপের দ্রুততম ও ওয়ানডের চতুর্থ দ্রুততম সেঞ্চুরি করে সংবাদ শিরোনাম হন ৩৫ বছর বয়সী ম্যাক্সওয়েল। তিনি বিশ্বকাপে মার্করামের রেকর্ডটা কেড়ে নিলেন এক আসরের মধ্যেই। মার্করাম ভেঙেছিলেন ১২ বছরের পুরনো রেকর্ড। ২০১১ সালে বেঙ্গালুরুতে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে ৫০ বলে সেঞ্চুরি ইংল্যান্ডের বিপক্ষে আয়ারল্যান্ডকে জিতিয়েছেন কেভিন ও’ব্রায়েন। তিনি ৬৩ বলে ১১৩ রানে দলকে ৩২৮ রানের টার্গেট ছুঁয়ে ফেলতে সাহায্য করেছিলেন। ১২ বছর পর তিনি রেকর্ডটা হারালেন মার্করামের কাছে। সেই রেকর্ডটা মার্করাম হারালেন এবার ম্যাক্সওয়েলের কাছে। কে জানে, হয়তো এ আসরেই আবারো ভাঙবে দ্রুততম সেঞ্চুরির রেকর্ডটা।

এছাড়া বিশ্বকাপে ম্যাক্সওয়েল ২০১৫ সালে শ্রীলংকার বিপক্ষে ৫১ বলে, প্রোটিয়া তারকা এবি ডি ভিলিয়ার্স ২০১৫ বিশ্বকাপে ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে ৫২ বলে ও ইংল্যান্ডের ইয়োন মরগান ২০১৯ সালের আসরে আফগানিস্তানের বিপক্ষে ৫৭ বলে সেঞ্চুরি করার কৃতিত্ব দেখান। চলতি বিশ্বকাপে আরো তিনটি ঝড়ো সেঞ্চুরি করেন দক্ষিণ আফ্রিকান হাইনরিখ ক্লাসেন (৬১ বল), ভারতের রোহিত শর্মা (৬৩ বল) ও শ্রীলংকার কুশল মেন্ডিস (৬৫ বল)। বিশ্বকাপে ৭০ বলের নিচে সেঞ্চুরি আছে ম্যাথু হেইডেন (৬৬ বল), জন ডেভিসন (৬৭ বল), কুমার সাঙ্গাকারা (৭০ বল) ও পল স্টার্লিংয়ের (৭০ বল)।

ওয়ানডে ক্রিকেট ইতিহাসে দ্রুততম সেঞ্চুরির রেকর্ডটা এখনো দক্ষিণ আফ্রিকার এবি ডি ভিলিয়ার্সের রয়ে গেছে। ২০১৫ সালে জোহানেসবার্গে ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে ৩১ বলে সেঞ্চুরি করেছিলেন তিনি। এছাড়া নিউজিল্যান্ডের কোরি অ্যান্ডারসন ৩৬ বলে ও পাকিস্তানের শহিদ আফ্রিদির ৩৭ বলে সেঞ্চুরির কীর্তি আছে। ওই তিনজনের পরই নিজের নামটি লিখিয়ে নিলেন ম্যাক্সওয়েল। এটা ওয়ানডেতে ১৩৪ ম্যাচে তার তৃতীয় সেঞ্চুরি। 

১৯৯৬ সালে কেনিয়ার নাইরোবিতে অভিষেকের পরের ম্যাচে ৩৭ বলে সেঞ্চুরি করে ক্রিকেট বিশ্বকে তাক লাগিয়ে দিয়েছিলেন শহিদ আফ্রিদি। তার সেই রেকর্ডটি টিকে ছিল ১৮ বছর। ২০১৪ সালে আফ্রিদির রেকর্ড ভাঙেন নিউজিল্যান্ডের কোরি অ্যান্ডারসন। কুইন্সটাউনে ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে ৩৬ বলে সেঞ্চুরি করেন তিনি। এক বছর পরই ডি ভিলিয়ার্সের কাছে রেকর্ডটি হারান অ্যান্ডারসন। প্রোটিয়া ব্যাটিং সুপারস্টার ২০১৫ সালে জোহানেসবার্গে সেই ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষেই ৩১ বলে সেঞ্চুরি করে সবাইকে ছাড়িয়ে যান। 

‘৩৬০ ডিগ্রি’ ব্যাটসম্যান খ্যাত ডি ভিলিয়ার্সের ৩১ বলের সেঞ্চুরির রেকর্ডটা এখনো বহাল আছে। তবে চলতি বিশ্বকাপে যেভাবে রেকর্ড ভাঙা-গড়ার খেলা চলছে, তাতে ভিলিয়ার্সের রেকর্ডও এখন হুমকির মুখে পড়ল কি? 

ওয়ানডেতে এছাড়া দক্ষিণ আফ্রিকার মার্ক বাউচার ৪৪ বলে, ওয়েস্ট ইন্ডিজের ব্রায়ান লারা ৪৫ বলে, শহিদ আফ্রিদি ৪৫ বলে, নিউজিল্যান্ডের জেসি রাইডার ৪৬ বলে, ইংল্যান্ডের জস বাটলার ৪৬ ও ৪৭ বলে (দুটি), শ্রীলংকার সনাথ জয়সুরিয়া ৪৮ বলে ও এইডেন মার্করাম ৪৯ বলে সেঞ্চুরি করেছেন। 

ডাচদের বিপক্ষে ওপেনিংয়ে নেমে ৯১ বলে সেঞ্চুরি পূর্ণ করেন ওয়ার্নার। এটা তার ব্যাক টু ব্যাক সেঞ্চুরি। এর আগে পাকিস্তানের বিপক্ষেও সেঞ্চুরি করেন তিনি। ছয়টি সেঞ্চুরি করে বিশ্বকাপে দ্বিতীয় স্থানে ওয়ার্নার। একটি সেঞ্চুরি বেশি নিয়ে এক নম্বরে রোহিত শর্মা। 

পাকিস্তানের বিপক্ষে আরেক সেঞ্চুরিয়ান মিচেল মার্শ বুধবার ৯ রান করে সাজঘরে ফেরার পর ওয়ার্নার দ্বিতীয় উইকেটে স্টিভ স্মিথকে নিয়ে ১৩২ রান ও তৃতীয় উইকেটে মার্নুস লাবুশেনকে নিয়ে ৮৪ রানের জুটি গড়েন। ছয় নম্বরে নামা ম্যাক্সওয়েলের সঙ্গে ওয়ার্নারের জুটি মাত্র এক রানের। তখন খেলা বাকি ১১.৫ ওভারের। কে ভেবেছিল, এটুকু সময়ের মধ্যেই সেঞ্চুরি তুলে নেবেন ম্যাক্সওয়েল। কিন্তু অরুন জেটলি স্টেডিয়ামে ঝড় তুলে ৯ চার ও ৮ ছক্কায় সেঞ্চুরি পূর্ণ করেন এ ডানহাতি ব্যাটার।

ম্যাক্সওয়েলের এতটা বিস্ফোরক হওয়ার কারণও স্পষ্ট। আইপিএলের নিয়মিত মুখ হওয়ার কারণে ভারতের স্টেডিয়ামগুলো তার হাতের তালুর মতোই চেনা। তাই তিনি দিল্লিতে চার-ছক্কার ফুলঝুরিতে প্রতিপক্ষকে নাজেহাল করেন। ম্যাক্সওয়েলকে সুযোগ্য সঙ্গ দেন অধিনায়ক প্যাট কামিন্স। এ দুজন মাত্র ৪৪ বলে ১০৩ রানের জুটি গড়েন। এর মধ্যে কামিন্সের অবদান মাত্র ৮, আর ম্যাক্সওয়েলের ৯১! এটাই প্রমাণ করছে, কতটা বিস্ফোরক ছিলেন ম্যাক্সওয়েল। 

ম্যাক্সওয়েল ঝড়েই শেষ ১০ ওভারে ১৩১ রান তুলেছে অস্ট্রেলিয়া। আগের দিন মুম্বাইতে বাংলাদেশের বিপক্ষে শেষ ১০ ওভারে ১৪৪ রান তুলেছিল দক্ষিণ আফ্রিকা। 

শুধু সেঞ্চুরির রেকর্ডই নয়, এদিন আরো বেশকিছু রেকর্ড হয়েছে। ডাচ পেসার বাস ডি লিডি ১১৫ রানে দুটি উইকেট নেন। তিনি ওয়ানডে ক্রিকেট ইতিহাসে সবচেয়ে ব্যয়বহুল বোলিংয়ের রেকর্ড গড়লেন এদিন। অস্ট্রেলিয়ার পেসার মিক লুইস ২০০৬ সালে দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে ১০ ওভারে ১১৩ ও একই দেশের স্পিনার অ্যাডাম জাম্পা এ বছর দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে ১১৩ রান খরচ করেন।