ডিআর কঙ্গোর বিপক্ষে ড্রয়ের পর যখন পর্তুগাল ও তাদের অধিনায়ককে নিয়ে নানা প্রশ্ন উঠছিল, তখন উজবেকিস্তানের বিপক্ষে বিশ্বকাপ মঞ্চে ইতিহাস গড়ে জবাব দিলেন ৪১ বছর বয়সী মহাতারকা। গতকাল রাতে হিউস্টনে জোড়া গোল করে দু দুটি বিশ্বরেকর্ড গড়েন তিনি। এ ম্যাচে একপেশে ফুটবলে প্রতিপক্ষকে ৫-০ গোলে হারিয়ে নকআউটের কাছাকাছি পৌঁছে গেল পর্তুগিজরা।

রোনালদোর জোড়া গোলের সঙ্গে নুনো মেন্দেস ও রাফায়েল লিয়াও একবার করে লক্ষ্যভেদ করেন, আর আত্মঘাতী হিসেবে এসেছে একটি গোল। এ জয়ে দুই ম্যাচ থেকে ৪ পয়েন্ট নিয়ে টেবিলের শীর্ষে উঠে যায় পর্তুগাল। আজ সকালে ‘কে’ গ্রুপের আরেক ম্যাচে ডিআর কঙ্গোর মুখোমুখি হয় কলম্বিয়া, যারা এক ম্যাচে ৩ পয়েন্ট নিয়ে টেবিলের দুইয়ে। নিজেদের শেষ ম্যাচে কলম্বিয়ার মুখোমুখি হবে পর্তুগাল।

গতকাল ম্যাচের ষষ্ঠ মিনিটেই লক্ষ্যভেদ করে বিশ্বকাপের ছয়টি ভিন্ন আসরে গোল করা প্রথম ফুটবলার হয়েছেন রোনালদো। ৩৯ মিনিটে আরেকটি গোল যোগ করে নিজের বিশ্বকাপ গোলসংখ্যা নিয়ে যান ১০-এ।

শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত ম্যাচে আধিপত্য দেখানো রবার্তো মার্তিনেজের দল শুধু জয়ই পায়নি, নকআউট পর্বে ওঠার দাবিও আরো জোরালো করেছে। অন্যদিকে প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপে খেলা উজবেকিস্তান পর্তুগিজ শক্তির সামনে প্রায় অসহায়ই ছিল।

হিউস্টনে ম্যাচের শুরু থেকেই আক্রমণাত্মক ছিল পর্তুগাল। দ্বিতীয় মিনিটেই ব্রুনো ফার্নান্দেজের শট থেকে সতর্কবার্তা দেয় তারা। এরপর ষষ্ঠ মিনিটে আসে কাঙ্ক্ষিত গোল। ডান প্রান্ত দিয়ে জোয়াও ক্যানসেলোর দুর্দান্ত দৌড়ের পর দেয়া নিচু ক্রস থেকে সামনে থাকা ডিফেন্ডারকে ফাঁকি দিয়ে বল জালে পাঠান রোনালদো। এ গোলের মধ্য দিয়ে বিশ্বকাপের ছয়টি ভিন্ন আসরে গোল করা প্রথম ফুটবলার হয়েছেন রোনালদো। ২০০৬, ২০১০, ২০১৪, ২০১৮, ২০২২ এবং ২০২৬—টানা ছয় বিশ্বকাপেই গোল করার অনন্য কীর্তি গড়লেন সিআরসেভেন। এছাড়া ৪১ বছর ১৩৮ দিন বয়সে গোল করে বিশ্বকাপ ইতিহাসে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ বয়সী গোলদাতাও হয়েছেন পর্তুগিজ অধিনায়ক। এ তালিকায় তার ওপরে আছেন শুধু ক্যামেরুনের কিংবদন্তি রজার মিলা।

১৭তম মিনিটে আসে ম্যাচের অন্যতম আকর্ষণীয় মুহূর্ত। বক্সের ঠিক বাইরে ফ্রি-কিক পায় তারা। সবাই ধরে নিয়েছিল শট নিতে যাচ্ছেন রোনালদো। স্বভাবসুলভ ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে ছিলেনও তিনি। কিন্তু রেফারির বাঁশি বাজতেই সবাইকে চমকে দিয়ে অন্য পাশ থেকে ছুটে এসে নিচু শটে উজবেক দেয়াল ভেদ করে বল জালে জড়ান নুনো মেন্দেস।

২-০ ব্যবধানে পিছিয়ে পড়ার পর কিছুটা ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করে উজবেকিস্তান। ২৯তম মিনিটে গনিয়েভের দূরপাল্লার দুর্দান্ত শট জালে জড়ালেও ভিএআরে দেখা যায়, আক্রমণের শুরুতে ফাইজুল্লায়েভ ফাউল করেছিলেন ক্যানসেলোকে। ফলে গোলটি বাতিল হয়ে যায়।

সে ধাক্কা সামলে ওঠার আগেই আবার আঘাত হানে পর্তুগাল। ৩৯তম মিনিটে ব্রুনো ফার্নান্দেজের নিখুঁত থ্রু পাস ধরে ডান দিক থেকে এগিয়ে এসে ঠাণ্ডা মাথায় বল জালে পাঠান রোনালদো। এটা ম্যাচে তার দ্বিতীয় ও বিশ্বকাপে দশম গোল। জোড়া গোলে লিওনেল মেসির রেকর্ড কেড়ে নেন রোনালদো। উজবেকিস্তানের বিপক্ষে ৪১ বছর ১৩৮ দিন বয়সে জোড়া গোল করেছেন পর্তুগিজ অধিনায়ক। বিশ্বকাপে সবচেয়ে বেশি বয়সী খেলোয়াড় হিসেবে এক ম্যাচে জোড়া গোলের রেকর্ড গড়লেন তিনি। সোমবার রাতেই অস্ট্রিয়ার বিপক্ষে জোড়া গোলের ম্যাচে মেসির বয়স ছিল ৩৮ বছর ৩৬৩ দিন। একদিনের ব্যবধানে রেকর্ডটা নিজের করে নিলেন পাঁচবারের ব্যালন ডি’অরজয়ী খেলোয়াড়।

প্রথমার্ধের শেষ দিকে হ্যাটট্রিকের কাছেও চলে গিয়েছিলেন রোনালদো। ক্যানসেলোর কাটব্যাক থেকে তার চিপ করা শট গোললাইন থেকে ক্লিয়ার করেন আবদুখোদির খুসানোভ। ফলে বিরতিতে ৩-০ ব্যবধানেই সন্তুষ্ট থাকতে হয় পর্তুগিজ অধিনায়ককে।

পুরো প্রথমার্ধে বলের দখল, আক্রমণ এবং সুযোগ তৈরিতে একচ্ছত্র আধিপত্য ছিল পর্তুগালের, যা দ্বিতীয়ার্ধেও ধরে রাখে রবার্তো মার্টিনেজের দল। পর্তুগিজ আক্রমণের মুখে ৬০ মিনিটে নিজেদেরই জালে বল জড়িয়ে দেন আব্দুভোহিদ নেমাতভ। ৮৭ মিনিটে ব্যবধান ৫-০ করে দেন রাফায়েল লিয়াও। নেলসন সেমেদোর ডান প্রান্ত থেকে বাড়ানো পাসে জোরালো শটে লক্ষ্যভেদ করেন লিয়াও।

কঙ্গোর বিপক্ষে হতাশাজনক ড্রয়ের পর যে দলটি সমালোচনার মুখে পড়েছিল, সেই পর্তুগাল এবার দেখাল তাদের প্রকৃত শক্তি। আর সেই শক্তির কেন্দ্রে ছিলেন সেই পুরনো নাম—রোনালদো। বয়স ৪১ হলেও বিশ্বকাপের সবচেয়ে বড় মঞ্চে ইতিহাস লেখা যে এখনো শেষ হয়নি, সেটাই আবার মনে করিয়ে দিলেন তিনি।

এদিকে এমবাপ্পে-অলিসে যুগলবন্দি যত এগোচ্ছে, ততই ভয়ংকর হয়ে উঠছে ফ্রান্স। গতকাল ভোরে ফিলাডেলফিয়ায় এমবাপ্পের জোড়া গোলে ইরাককে ৩-০ গোলে হারিয়ে টানা দ্বিতীয় জয় তুলে নিয়েছে দিদিয়ের দেশমের দল। গ্রুপ পর্বের দুই ম্যাচে ছয় গোল করে ফরাসিরা শুধু নকআউটে ওঠেনি, শিরোপার অন্যতম দাবিদার হিসেবেও নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করেছে। একই গ্রুপে নরওয়ের কাছে ৩-২ গোলে হেরেছে সেনেগাল। টানা দুই হারে আফ্রিকার দলটি এখন বিদায়ের শঙ্কায়। অন্যদিকে গ্রুপ ‘জে’-তে জর্ডানকে ২-১ গোলে হারিয়ে নকআউটের আশা বাঁচিয়ে রেখেছে আলজেরিয়া। দুই ম্যাচে ৩ পয়েন্ট নিয়ে তারা এখন দ্বিতীয় স্থান দখলের লড়াইয়ে রয়েছে। বিপরীতে টানা দুই হারে টুর্নামেন্ট থেকে বিদায় নিশ্চিত হয়েছে জর্ডানের।

ফ্রান্সকে নিয়ে বিশ্বকাপের শুরু থেকেই প্রত্যাশা ছিল আকাশছোঁয়া। তবে দুই ম্যাচ শেষে বলা যায়, প্রত্যাশার চেয়েও বেশি কিছু উপহার দিচ্ছে কিলিয়ান এমবাপ্পে ও মাইকেল অলিসের দল। সেনেগালের বিপক্ষে ৩-১ গোলের জয়ের পর এবার ইরাককে ৩-০ গোলে উড়িয়ে দিয়েছে ফরাসিরা। দুই ম্যাচে ছয় গোল, বিপরীতে হজম মাত্র একটি।

ইরাকের বিপক্ষে ম্যাচটিতে বজ্রঝড়ের কারণে দীর্ঘ সময় খেলা বন্ধ ছিল। ফ্রান্স যেন বিরতির পর আরো বেশি ধারালো হয়ে ওঠে। উসমান দেম্বেলে ম্যাচের প্রথম গোল করে পথ দেখান। এরপর মঞ্চ দখল করেন এমবাপ্পে। ফরাসি অধিনায়কের জোড়া গোলে নিশ্চিত হয় বড় জয়। বিশ্বকাপের দুই ম্যাচে এমবাপ্পের গোলসংখ্যা এখন চার। সেনেগালের বিপক্ষে জোড়া গোলের পর ইরাকের বিপক্ষেও দুইবার জালের দেখা পেয়েছেন তিনি।

গ্রুপের অন্য ম্যাচে নরওয়ে ও সেনেগাল উপহার দিয়েছে দারুণ লড়াই। আক্রমণ-পাল্টা আক্রমণে ভরা ম্যাচে শেষ পর্যন্ত ৩-২ গোলের জয় পায় নরওয়েজিয়ানরা। গতকাল সকালে জোড়া গোল করা আর্লিং হালান্ডের দল শুরু থেকেই আক্রমণাত্মক ফুটবল খেলেছে। সেনেগালও লড়াই করেছে শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত। কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তে সুযোগ কাজে লাগাতে না পারায় পরাজয় নিয়েই মাঠ ছাড়তে হয়েছে আফ্রিকার প্রতিনিধিদের।

এ হারে গ্রুপ ‘আই’-এর দুই ম্যাচে শূন্য পয়েন্ট নিয়ে তলানিতে নেমে গেছে সেনেগাল।