প্রিমিয়ার লিগের ছয়টি ক্লাব মাঠে নামলেও জয় পায়নি কেউই। ড্র করেছে দুই দল, হেরেছে বাকি চারটি। ফলে ইউরোপজুড়ে শুরু হয়েছে নতুন বিতর্ক—ইংলিশ দলগুলো কি অতিরিক্ত ক্লান্ত, নাকি ইউরোপের শীর্ষ দলগুলোর তুলনায় তারা দক্ষতায় পিছিয়ে?

প্রিমিয়ার লিগের ফুটবল অনেক বেশি কাঠামোবদ্ধ এবং শারীরিক শক্তির দাবিও সেখানে বেশি। আর্সেনাল বা ম্যানচেস্টার সিটির মতো দলগুলো মাঠে এমন এক নিয়ন্ত্রিত কাঠামোয় খেলে, যা লিগ পর্যায়ে সফল হলেও চ্যাম্পিয়ন্স লিগে বার্সেলোনা বা পিএসজির মতো প্রতিপক্ষের বিপক্ষে অকার্যকর হয়ে পড়ছে। ইউরোপের দলগুলো যখন বল পায়ে পায়, তারা তাদের সহজাত বুদ্ধিমত্তাকে কাজে লাগিয়ে মাঝমাঠের দখল নেয়। অন্যদিকে ইংলিশ ক্লাবগুলো এমন এক কঠোরভাবে তৈরি ‘মেশিন’-এর মতো কাঠামোয় বন্দি থাকে, যেখানে পান থেকে চুন খসলেই ছন্দপতন হওয়া সম্ভব।

ম্যানচেস্টার সিটির ৩-০ ব্যবধানে হার এর বড় প্রমাণ। পেপ গার্দিওলা যখন বার্নাব্যুতে চারজন আক্রমণাত্মক খেলোয়াড়কে একসঙ্গে নামালেন, তখন রদ্রি ও বার্নার্দো সিলভাকে একাই মাঝমাঠ সামলাতে হয়েছিল। রিয়াল মাদ্রিদের ফেদেরিকো ভালভার্দের মতো খেলোয়াড়রা যখন দ্রুতগতির ট্রানজিশনাল ফুটবল খেলে, তখন এই পাতলা রক্ষণভাগ তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়ে। প্রিমিয়ার লিগে অনেক দলই হাই পজিশনে বল ধরে রাখতে অভ্যস্ত। কিন্তু চ্যাম্পিয়ন্স লিগে রক্ষণভাগ খোলা রেখে মাঝমাঠের নিয়ন্ত্রণ হারানো মানেই হলো গোল হজম করা।

চেলসি ও টটেনহ্যামের সাম্প্রতিক পারফরম্যান্সে স্পষ্ট, রেকর্ড পরিমাণ অর্থ ব্যয় করলেও স্কোয়াডের গভীরতা নিয়ে বড় ঘাটতি রয়েই গেছে। খেলোয়াড়দের চোটে পড়ার হার এবং গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচের জন্য বিকল্প খেলোয়াড় না থাকাটাও দৃশ্যমান। চেলসির গোলরক্ষক ফিলিপ ইয়ুর্গেনসেন বা টটেনহ্যামের সামগ্রিক রক্ষণভাগ দেখাচ্ছে, কেবল অর্থই খরচ হয়েছে কিন্তু সঠিক পজিশনে সঠিক খেলোয়াড় আনা হয়নি। অথচ বায়ার্ন মিউনিখ বা রিয়াল মাদ্রিদের মতো দলগুলোর রিক্রুটিংয়ে প্রতিটি পজিশনের জন্য ভারসাম্য বজায় থাকে।

কথা আসতে পারে, ক্লান্তির অজুহাত আদৌ যৌক্তিক কিনা। কারণ ‘ক্লান্তি’ শব্দটিকে অজুহাত হিসেবে ব্যবহারের সময় এসেছে। বায়ার্ন মিউনিখ বা অ্যাটলেটিকো মাদ্রিদও গ্রীষ্মকালীন ক্লাব বিশ্বকাপে খেলেছে, তাদেরও ইনজুরি সমস্যা আছে। কিন্তু তারা মাঠের মানসিকতায় এগিয়ে। প্রিমিয়ার লিগের দলগুলো যেন মাঠের প্রতিটি মুহূর্তকে একটি ‘ব্যাটল’ বা যুদ্ধ হিসেবে দেখে, যেখানে ইউরোপের সেরা ক্লাবগুলো একেকটি মুহূর্তকে দেখে ‘গেম’ হিসেবে। এই মানসিক পার্থক্যের কারণেই ইংলিশ ক্লাবগুলো শেষ ১৫-২০ মিনিটে অতিরিক্ত গোল খেয়ে বসে বা বেড়ে যাচ্ছে হারের ব্যবধান।

এক্ষেত্রে বাভারিয়ানদের আধিপত্যের মডেল বা উদাহরণের দিকে তাকানো যাক। এ মুহূর্তে বায়ার্ন মিউনিখ কেন সেরা? তাদের একটি স্পষ্ট কৌশলগত সুবিধা আছে—বুন্দেসলিগায় তারা ১১ পয়েন্টে এগিয়ে থাকায় চ্যাম্পিয়ন্স লিগের নকআউট পর্বে পূর্ণ মনোযোগ দিতে পারছে। জামাল মুসিয়ালা ও আলফনসো ডেভিসের মতো গতিশীল ফুটবলারদের সঙ্গে হ্যারি কেন বা মাইকেল ওলিসের মতো ফিনিশারের মিশ্রণ তাদের আক্রমণভাগকে করে তুলেছে অপ্রতিরোধ্য। তারা আটালান্টার মতো দলকেও তাদের ‘ম্যান টু ম্যান’ প্রেসের ফাঁদে ফেলে চূর্ণ করতে পারে। অন্যদিকে প্রিমিয়ার লিগের লড়াই এতটা তীব্র ও শারীরিক শক্তির দাবিদার যে দলগুলো ঘরোয়া লিগের প্রতিটি ম্যাচ জিততে গিয়ে নিজেদের সব শক্তি ও মনোযোগ উজাড় করে দেয়। ফলে চ্যাম্পিয়ন্স লিগের গুরুত্বপূর্ণ নকআউট পর্বে নামার আগেই খেলোয়াড়রা শারীরিকভাবে ক্লান্ত ও মানসিকভাবে স্থবির হয়ে পড়ে।

প্রিমিয়ার লিগের ক্লাবগুলো কি তবে ভুল পথে হাঁটছে? না। কিন্তু তাদের খেলার ধরনের বিবর্তনের প্রয়োজন। শুধু শারীরিকভাবে শক্তিশালী হওয়া বা লিগে আধিপত্য বিস্তার করাই ইউরোপ জয়ের জন্য যথেষ্ট নয়। চ্যাম্পিয়ন্স লিগের এই নকআউট পর্যায়ে জিততে হলে প্রয়োজন রক্ষণভাগে নমনীয়তা, মাঝমাঠে গতির সঙ্গে বুদ্ধিমত্তার মেলবন্ধন এবং সবচেয়ে বড় কথা—ছকে বসানো ফুটবলের জায়গায় অননুমেয় ফুটবল খেলার মানসিকতাও থাকা দরকার।

দ্বিতীয় লেগের লড়াইয়ে যদি ইংলিশ ক্লাবগুলো তাদের রক্ষণভাগের ভুলগুলো সংশোধন করতে না পারে এবং নিজেদের সহজাত খেলার স্টাইল থেকে কিছুটা বেরিয়ে এসে প্রতিপক্ষের কৌশলের সঙ্গে মানিয়ে নিতে না পারে, তবে চ্যাম্পিয়ন্স লিগের শিরোপা এবারো ইংল্যান্ডের বাইরেই থাকার সম্ভাবনা প্রবল।

মঙ্গলবার ম্যানসিটি, আর্সেনাল ও চেলসি ঘরের মাঠে দ্বিতীয় লেগের ম্যাচ খেলবে। পরদিন লিভারপুল ও টটেনহ্যাম ঘরের মাঠে খেললেও নিউক্যাসেল যাবে বার্সেলোনার মাঠে।