ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো আর লিওনেল মেসি মাঠে নামা মানেই নিত্যনতুন রেকর্ড গড়ার হাতছানি। গত মঙ্গলবার রাতে বিশ্বকাপ বাছাইপর্বে সবচেয়ে বেশি গোলের রেকর্ড গড়েন পর্তুগিজ সুপারস্টার রোনালদো। পরদিন পুয়ের্তো রিকোর বিপক্ষে দুটি গোলে অ্যাসিস্ট করে রেকর্ড গড়েন মেসিও। তিনি আন্তর্জাতিক ফুটবলে সর্বোচ্চ ৬০ গোলে অ্যাসিস্ট করেছেন।

লিসবনে হাঙ্গেরির সঙ্গে ২-২ গোলে ড্র করে পর্তুগাল। ম্যাচে একটি গোল করে রেকর্ড গড়েছেন ৪০ বছর বয়সী ফরওয়ার্ড। বিশ্বকাপ বাছাইপর্বের ইতিহাসে তিনিই এখন সর্বোচ্চ ৪১ গোলের মালিক। এ পথে তিনি পেছনে ফেলে আসেন গুয়াতেমালার কার্লোস রুইজকে (৩৯ গোল)। এছাড়া আর্জেন্টিনার লিওনেল মেসি ৩৬ গোল, ইরানের আলী দায়েই ৩৫ গোল ও পোল্যান্ডের রবার্ট লেভানডভস্কি ৩২ গোল করেছেন।

অষ্টম মিনিটে আত্তিলা সালাই গোল করে হাঙ্গেরিকে এগিয়ে দেন। ২২ মিনিটে কাছ থেকে নেয়া শটে গোল করে ম্যাচে সমতা আনেন ফুটবল ইতিহাসেরই অন্যতম সেরা খেলোয়াড় রোনালদো। এরপর প্রথমার্ধের যোগ করা সময়ে তিনি করেন দলের দ্বিতীয় ও বাছাইপর্বে নিজের ৪১তম গোল। এর মধ্য দিয়ে নাম লেখান রেকর্ড বুকে। বিশ্বকাপ বাছাইপর্বে ৫১ ম্যাচ খেলে তিনি করেন ৪১ গোল। ছেলেদের আন্তর্জাতিক ফুটবল ম্যাচে সবচেয়ে বেশি (১৪৩) গোলের মালিকও তিনি।

৭৮ মিনিটে রোনালদো মাঠ ছাড়ার সময় ২-১ গোলে এগিয়ে ছিল পর্তুগাল। এরপর যোগ করা সময়ে ডমিনিক সবোলাই গোল করলে সমতা আনে হাঙ্গেরি। এর ফলে দুই ম্যাচ হাতে রেখে বিশ্বকাপের টিকিট পাওয়া হলো না পর্তুগালের। এখন তাদের অপেক্ষা করতে হবে পরের ম্যাচ পর্যন্ত। এ ড্রয়ের পরও ‘এফ’ গ্রুপে দ্বিতীয় স্থানধারী হাঙ্গেরির চেয়ে পাঁচ পয়েন্টে এগিয়ে রয়েছে পর্তুগাল।

সম্প্রতি বলছিলেন, ফুটবল ক্যারিয়ারে এক হাজার গোল করার পর তিনি সিদ্ধান্ত নেবেন, কবে নাগাদ বুটজোড়া তুলে রাখবেন। জাতীয় দল ও ক্লাব ফুটবল মিলিয়ে তিনি এখন ৯৪৮ গোলের মালিক। নিশ্চিতভাবেই এক হাজার গোলের স্বপ্নপূরণের দিকে ছুটবেন। সেই সঙ্গে ২০২৬ সালের বিশ্বকাপেও তাকে যে শক্তিশালী রূপেই দেখা যাবে, সেই বার্তাও দিলেন ৪০ বছর বয়সী সুপারস্টার।

২২ বছরের আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারে পর্তুগালকে ২০১৬ সালে ইউরোপিয়ান চ্যাম্পিয়নশিপ ও দুবার উয়েফা নেশন্স লিগ জিততে সাহায্য করেছেন রোনালদো। বিশ্বকাপ জয়ের স্বপ্নপূরণে সবচেয়ে কাছাকাছি পৌঁছেছিলেন ২০০৬ সালে। সেবার সেমিফাইনালে ফ্রান্সের কাছে হেরেছিল পর্তুগাল।

রেকর্ড গড়েও তিনি পুরোপুরি খুশি নন। তার লক্ষ্য, যত তাড়াতাড়ি সম্ভব পর্তুগালকে বিশ্বকাপের মূল পর্বে নিয়ে যাওয়া। এ নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তিনি লিখেছেন, ‘জাতীয় দলের প্রতিনিধিত্ব করাটা যে আমার কাছে বিরাট ব্যাপার, তা আর গোপন কিছু নয় এবং এ কারণেই আমি পর্তুগালের হয়ে মাইলফলকে পৌঁছতে পেরে গর্বিত। যারা আমাকে সাহায্য করেছেন তাদের সবার প্রতি কৃতজ্ঞতা। আশা করি নভেম্বরে আমরা বিশ্বকাপের টিকিট নিশ্চিত করব এবং সে সময় আপনাদের সঙ্গে দেখা হবে।’

১৩ নভেম্বর ডাবলিনে আয়ারল্যান্ডের মুখোমুখি হবে পর্তুগাল।

এদিকে, বুধবার সকালে মায়ামিতে পুয়ের্তো রিকোর বিপক্ষে আর্জেন্টিনা ৬-০ গোলের জয় তুলে নেয়। এ ম্যাচে গোল না করলেও দুটি অ্যাসিস্ট করে রেকর্ড বুকে নাম লেখান ৩৮ বছর বয়সী মেসি। গোল না করলেও আলবিসেলেস্তেদের জয়ের অন্যতম কারিগর তিনি। গ্যাব্রিয়েল মন্তিয়েলকে দিয়ে দলের দ্বিতীয় ও লাউতারো মার্টিনেজকে দিয়ে দলের চতুর্থ গোল করান মেসি। সব মিলিয়ে আন্তর্জাতিক ফুটবলে তিনি ৬০ গোলে অ্যাসিস্ট করেছেন। গোল করায় ইতিহাসের অন্যতম সেরা হওয়ার পাশাপাশি প্লেমেকার হিসেবেও তিনি অন্যতম সেরা হিসেবে স্মরণীয় হয়ে থাকবেন।

অ্যাসিস্টের সংখ্যায় আর্জেন্টিনার অন্য সুপারস্টারদের তুলনায় মেসি অনেক এগিয়ে। অ্যাঞ্জেল ডি মারিয়া ২৮টি ও দিয়েগো ম্যারাডোনা ২৬টি গোলে অ্যাসিস্ট করেছেন। আর্জেন্টিনার জার্সিতে তার মতো আক্রমণাত্মক ফুটবলার গত দুই দশকে আর আসেনি।

ইউরোপের বাইরের লিগে খেললেও মেসি আগের মতোই ক্ষুরধার। তার সৃষ্টিশীলতা, টাইমিং আর নির্ভুল পাস আর্জেন্টিনার আক্রমণের গতিপথ তৈরি করে দেয়। এটা প্রমাণ করে, সত্যিকারের মান বয়সে বিবর্ণ হয় না।

ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো মঙ্গলবার রাতে বিশ্বকাপ বাছাইপর্বে গোলের রেকর্ড গড়ার কয়েক ঘণ্টা পরই মেসি গড়েন গোলে সহায়তার রেকর্ড। এ দুজনের প্রতিদ্বন্দ্বিতা দুই দশক পরও জীবন্ত, যা সীমান্ত আর প্রজন্ম পেরিয়ে ছুটে চলেছে অবিরত।

২০০৫ সালে অভিষেকের পর জাতীয় দলের আক্রমণ কিংবা নেতৃত্ব প্রদান নতুনভাবে সংজ্ঞায়িত করেছেন মেসি। তিনি দেশকে বিশ্বকাপ ও কোপা শিরোপা জয়ে নেতৃত্ব দিয়েছেন, এবার আন্তর্জাতিক ফুটবলে গোলে সবচেয়ে বেশি অ্যাসিস্টের রেকর্ড গড়লেন। এর মধ্য দিয়ে নিজের মহিমা ও শ্রেষ্ঠত্ব সুসংহত করলেন তিনি।

মেসির সমসাময়িক অনেকেই অবসর নিয়েছেন, আর তিনি এখনো সগৌরবে ছুটছেন তার মেধা, ফিটনেস আর নেতৃত্বগুণ দিয়ে। কেউ তাকে এভাবে সংজ্ঞায়িত করতে পারেন: মেসি রেকর্ডের পিছে ছোটেন না, রেকর্ডই মেসিকে তাড়া করে।