দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ সবে শেষ হয়েছে। বিধ্বস্ত রোম। যেদিকে চোখ যায়, শুধু ধ্বংসস্তূপ। বাস্তুহারা অগণিত মানুষ। নতুন বসতি তৈরি মাত্র শুরু হয়েছে। শহরে বেকারের ছড়াছড়ি। তাদেরই একজন অ্যান্টনিও। কোনোভাবে সে একটি চাকরি জোগাড় করে ফেলে। দেয়ালে দেয়ালে বিজ্ঞাপন লাগানো। এ কাজে তার সঙ্গী একটি সাইকেল। ভাগ্যের পরিহাস! একদিন অ্যান্টনিওর সবেধন নীলমণি সাইকেলটি চুরি হয়ে যায়। সাইকেল খোঁজার জন্য পাগলের মতো ছুটে বেড়ায় সে। সঙ্গে থাকে তার শিশুপুত্র ব্রুনো। বাবা-ছেলের চমৎকার রসায়নের মাধ্যমে এগিয়ে যেতে থাকে সিনেমার গল্প।

পাঠক এতক্ষণে নিশ্চয় বুঝে ফেলেছেন কোন সিনেমার কথা বলা হচ্ছে। হ্যাঁ, সিনেমাটির নাম ‘বাইসাইকেল থিভস’। সাধারণ একটি গল্প। সাদামাটা উপস্থাপনা। কোনো অতিরঞ্জন নেই। আর এটিই সিনেমাটিকে আলাদা বিশেষত্ব দিয়েছে। সব মিলিয়ে ‘বাইসাইকেল থিভস’-কে যতটা সিনেমা মনে হয়, তার চেয়ে বেশি মনে হয় ডকুমেন্টারি।

‘বাইসাইকেল থিভস’ সিনেমাটি ১৯৪৮ সালে মুক্তি পেয়েছিল। পরিচালক ভিত্তোরিও ডি সিকা। মুক্তির পর থেকেই ইতালিয়ান সিনেমাটি প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে পরিচালক, অভিনয়শিল্পী ও সিনেমাটোগ্রাফারদের প্রভাবিত করছে। ঠাঁই করে নিয়েছে সর্বকালের সেরা সিনেমাগুলোর তালিকায়। ইতালির সিনেমায় এটি অন্যতম মাইলফলক। পেয়েছে ক্ল্যাসিকের মর্যাদা। এর কারণ কী?

‘বাইসাইকেল থিভস’ সিনেমাটি নিও-রিয়ালিজমের প্রতিনিধিত্ব করে। নিও-রিয়ালিজম আন্দোলনে প্রভাবিত সিনেমাগুলোয় শহরে বসবাসরত শ্রমিক ও প্রান্তিক মানুষের দৈনন্দিন চ্যালেঞ্জগুলোকে ফুটিয়ে তোলা হয়েছিল। ‘বাইসাইকেল থিভস’ সিনেমাটিও এর ব্যতিক্রম নয়। ভিত্তোরিও ডি সিকা ইতালিতে নিও-রিয়ালিজমের প্রবক্তা নন। তিনি অপেশাদার অভিনেতাদের দিয়ে কাজ করিয়েছেন। দারিদ্র্যের আবেগীয় মূল্য তুলে ধরেছেন তার সিনেমায়। নির্দিষ্ট সেটের বাইরে গিয়ে কাজ করেছেন। কিন্তু এর কোনোটিতেই তিনি প্রথম নন। তার আগে অনেকেই এসব পরীক্ষা-নিরীক্ষা করেছেন। তথাপি, মুক্তি পাওয়ার পর ৭৫ বছর পেরিয়ে গেলেও এ সিনেমা এখনো বিশ্বব্যাপী সমাদৃত। এর আবেদন যেন ফুরোবার নয়। যতই দিন যাচ্ছে, আরো বেশি দর্শক সিনেমাটি দেখছে। সিনেমাটিতে মানবজীবনের অনিশ্চয়তা শৈল্পিকভাবে উপস্থান করেছেন ডি সিকা। এর অভাবনীয় শক্তি ও অনবদ্য সৌন্দর্যের সঙ্গে খুব কম সিনেমাই তুলনীয় হতে পারে। 

‘বাইসাইকেল থিভস’-এর সিনেমাটোগ্রাফার ছিলেন কার্লো মনটোরি। সাইকেল চোর ধরার অভিযানে ছুটে চলা বাবা-ছেলে অ্যান্টনিও ও ব্রুনোর যন্ত্রণাকাতর চেহারা নিখুঁতভাবে তার ক্যামেরায় বন্দি হয়। একই সঙ্গে রোমের শহরতলি, বাজার ও পুরনো সাইকেলের দোকানের সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম বয়ান তিনি ফুটিয়ে তুলেছেন দারুণ মুনশিয়ানায়। সাইকেল পেয়েছে মনে করে বাবা ও ছেলের সে দৌড় কার্লো এত চমৎকারভাবে ধারণ করেছেন যে দর্শকমাত্রই সে দৃশ্য কখনো ভুলতে পারবেন না। সর্বোপরি, ‘বাইসাইকেল থিভস’-এ জীবন ও সিনেমা এতটাই একাকার হয়ে গেছে যে এ দুটিকে আলাদা করা সম্ভব নয়। আর এ বিষয়ই সিনেমাটিকে অন্যান্য সিনেমা থেকে স্বতন্ত্র করেছে।

‘বাইসাইকেল থিভস’ সিনেমায় অপেশাদার অভিনেতাদের ব্যবহার সিনেমাটিকে আরো বেশি জীবনঘনিষ্ঠ করে তুলেছে। প্রধান দুই চরিত্র অ্যান্টোনিও ও ব্রুনোকে ডি সিকা একটি ভিড়ের মধ্যে আবিষ্কার করেছিলেন। চলার পথে তারা যেসব সুখ-দুঃখ, হাসি-কান্নার অভিজ্ঞতা লাভ করেছিলেন, ঠিক সেটিই তারা সিনেমায় প্রকাশ করেছেন। আলাদা করে তাদের কোনো প্রচেষ্টা চালাতে হয়নি। সে কারণে তাদের অভিনয়কে কোনোভাবেই মেকি মনে হয়নি। সেগুলো একেবারেই নিখাদ। যাপিত জীবনের অভিজ্ঞতার আলোকে হৃদয়ের গভীর থেকে উৎসারিত। আর অ্যান্টোনিওর মতো অসংখ্য মানুষকে বুকে ধারণ করা রোম নিজেই এ সিনেমার এক জীবন্ত চরিত্রে পরিণত হয়েছে। 

‘বাইসাইকেল থিভস’ সিনেমায় সহমর্মিতা দেখানো হয়েছে। উপস্থাপিত হয়েছে জীবনের রূঢ় বাস্তবতা। আর আছে অসহায় ও নিপীড়িত মানুষের অন্তর্গত রাগের প্রচ্ছন্ন প্রকাশ, যেটি অনবরত তার অস্তিত্বের জানান দিতে থাকে। ‘বাইসাইকেল থিভস’ মুক্তির অনতিকাল পরই ক্ল্যাসিকের মর্যাদা লাভ করে। অদ্যাবধি সে আসন এতটুকু টলেনি। বরং তা আরো পোক্ত হয়েছে। 

স্ক্রল ডট ইন অবলম্বনে নিজাম আশ শামস