ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রি মানেই গ্ল্যামার। সিনেমা থেকে আসে প্রচুর টাকা। সিনেমা স্টারদের আমরা বিলাসী জীবনযাপন করতেই দেখি। এর মাঝে কখনো আবার তাদের কথা কৌতুকের মতোও শোনায়। যেমন রণবীর সিং একবার বলেন, তার ছেলেবেলায় পরিবারের কাছে যথেষ্ট অর্থ ছিল না। তার কাছে এ ‘যথেষ্ট’
অর্থ ইউরোপে গ্রীষ্মকালীন ছুটি কাটানোর জন্য প্রয়োজনীয় অর্থের সমান। অন্যদিকে হর্ষবর্ধন কাপুর একটি ল্যাম্বরগিনি কিনে উঠতে পারছেন না। লকডাউন শুরু হলে জ্যেষ্ঠ অভিনেত্রী সারিকা জানান তার সঞ্চিত অর্থ ফুরিয়ে গিয়েছে। তাই তাকে অভিনয়ে ফিরতেই হবে। থিয়েটার কাজ করে ২ হাজার থেকে ২ হাজার ৭০০ রুপিই পাওয়া যায়। কতটা অর্থ ‘যথেষ্ট’
তা ব্যক্তিভেদে পরিবর্তিত হয়। কিন্তু বলিউডে বহু শিল্পী শূন্য থেকে কোটিপতি হয়েছেন, অনেকে আবার হারিয়েছেন
শূন্য থেকে শুরু
শূন্য থেকে শুরু করা শিল্পীদের মধ্যে শাহরুখ খানের নাম প্রথমেই আসে। প্রথমে যখন তিনি বম্বে আসেন, তার হাতে ছিল মাত্র ১ হাজার ৫০০ রুপি। ২০১৩ সালে ম্যানেজমেন্ট স্টুডেন্টদের সামনে তিনি খোলাখুলিভাবে কথা বলেন। তিনি সবসময় ব্যর্থতা থেকে দূরে থাকতে চাইতেন। তিনি বলেন, ‘একটি নিম্ন-মধ্যবিত্ত পরিবারের সদস্য হওয়ায় আমি অনেক ব্যর্থতা দেখেছি। ভাড়া দিতে পারিনি বলে বাড়ি থেকে বের করে দেয়া হয়েছিল আমাদের।’
ভিকি কৌশলও প্রথম জীবনে অর্থনৈতিক সংকটে ছিলেন। ‘আমি একটা ১০ বাই ১০ ফুটের ঘরে বসবাস করেছি। অন্যদের সঙ্গে সেখানে কমন বাথরুম ব্যবহার করতে হতো। একজন স্টান্টম্যান হিসেবে ক্যারিয়ার দাঁড় করানোর জন্য বাবা অনেক পরিশ্রম করেছেন।’
ওটিটি যুগে এসে পঙ্কজ ত্রিপাঠির জনপ্রিয়তা খুব দ্রুত বেড়েছে। অথচ একটা লম্বা সময় তিনি বলিউডের সিনেমায় ছোট ছোট চরিত্র করে গেছেন। খুব সাধারণ জীবনযাপন করেছেন পঙ্কজ ত্রিপাঠি। তিনি বলেন, ‘আমি বিহারের এক কৃষকের ছেলে। অর্থসম্পদ জীবনে আসলে দেখিনি। ছোটবেলা থেকেই অর্থের ভালো ও মন্দ দিকটা বুঝতে পেরেছি এবং মনে করি এ সম্পর্কে আমার ধারণা সহজে বদলাবে না।’
এদিক থেকে আয়ুষ্মান খুরানার অভিজ্ঞতা তুলনামূলক ভালো। তিনি একজন রেডিও জকি হিসেবে যখন কাজ শুরু করেন তখন ৬০ হাজার রুপি বেতনে চুক্তিবদ্ধ হয়েছিলেন। কিন্তু সেটা তার জন্য অনেক বড় একটি অংক ছিল। আয়ুষ্মানের তত্কালীন প্রেমিকা (বর্তমানে স্ত্রী) আয়ুষ্মানের কথা শুনে সহজে বিশ্বাস করতে পারেননি।
কপালের ফের
কবে কার ভাগ্য খারাপ হয় কেউ জানে না। জীবন উত্থান-পতনের মধ্য দিয়ে যায়। ফারাহ খানের জীবনের নানা বাঁক পরিবর্তন দেখেছেন। তার বাবার পরিচালিত একটি সিনেমা ফ্লপ করলে তাদের অর্থনৈতিক অবস্থা পড়ে যায়। এক সাক্ষাত্কারে তিনি বলেছিলেন, ‘রাতারাতি আমরা গরিব হয়ে গেলাম। এরপর প্রায় ১৫ বছর ওই অবস্থায় পার করি।’ ফারাহ বলেছেন একটা স্টোররুমে কেটেছে তার ছেলেবেলা। টেলিভিশন অভিনেত্রী সোনালি গাঙ্গুলীর গল্পটাও অনেকটা এমন। তার বাবা অনীল গাঙ্গুলী তাদের বাড়ি বিক্রি করতে বাধ্য হন।
হিরো নাম্বার ওয়ান বলে পরিচিত গোবিন্দ একটা সময় একের পর এক হিট সিনেমা উপহার দিয়েছেন। তার সিনেমার গানে নাচত বলিউড। কিন্তু টানা তিন চার বছর কোনো কাজের প্রস্তাব পাননি তিনি। সালমান খানের সঙ্গে পার্টনার সিনেমায় কাজ করার পর তার অবস্থা ফেরে। বর্ষীয়ান অভিনেতা জ্যাকি শ্রফ বহুদিন কোনো কাজ পাননি। সাজিদ নাদিয়াদওয়ালার কাছ থেকে ২০০৮ সালে নেয়া ঋণ শোধ করা সম্ভব হচ্ছিল না। তিনি তার রিয়েল এস্টেট প্রপার্টি বিক্রি করতে বাধ্য হন। প্রীতি জিনতা ২০১৩ সালে ইশক ইন প্যারিস দিয়ে বলিউডে ফিরেছিলেন। সিনেমাটি তিনি নিজেই প্রযোজনা করেন। কিন্তু সেটি এতটাই খারাপ করে যে প্রীতির আর্থিক অবস্থা সংকটাপন্ন হয়ে ওঠে।
সম্প্রতি বলিউড ও দক্ষিণ ভারতের অন্যতম পরিচিত মুখ আর মাধবন তার জীবন বাস্তবতার কথা জানিয়েছেন। এককালের রোমান্টিক বয় এবং থ্রি ইডিয়টস সিনেমার ফারহান চার বছর কোনো সিনেমায় কাজ পাননি। তার ভাষায়, ‘গত চার বছরে ১ টাকাও আয় করিনি।’
কভিড-১৯ এবং এর পরবর্তী সময়ে মন্দা যাচ্ছে অনেকেরই।
অর্থনৈতিক সংকট ও মানসিক স্বাস্থ্য
অর্থনৈতিক অবস্থার সঙ্গে সামাজিক অবস্থান জড়িত। অর্থনৈতিক সংকটে সামাজিক অবস্থানের অবনতির সঙ্গে সঙ্গে মানসিক স্বাস্থ্যে প্রভাব পড়ে। শোলের বিখ্যাত গব্বর সিং চরিত্রে অভিনয় করা আমজাদ খান একটা সময় এত খারাপ অবস্থায় ছিলেন যে স্ত্রীকে হাসপাতাল থেকে ছাড়িয়ে নেয়ার মতো টাকা তার ছিল না। তিনি সে সময় পালিয়ে বেড়াতেন। জনি লিভার একটা সময় দুরবস্থার মধ্য দিয়ে গেছেন। প্রায় ১২ বছর তিনি কোনো কাজ পাননি। তিনি বলেন, ‘শোবিজে আমাদের কাজটা স্থায়ী নয়। এখানে প্রতিনিয়ত নতুন শিল্পী, নতুন প্রযুক্তি আসে। আমাদের সরিয়ে দেয়া কঠিন কিছু নয়। তাই বুদ্ধিমত্তার কাজ হলো সঞ্চয়, বিনিয়োগ ও জমিজমা কিনে রাখা, যেন দুঃসময়ে কাজে লাগে। শিল্পীদের বোঝা প্রয়োজন ক্যারিয়ারে নানা উত্থান পতন থাকে।’
এ সময় মানসিক সমস্যা তৈরি হতে পারে। ভেঙে না পড়ে নিজেকে কোনো না কোনো কাজে ব্যস্ত রাখার পরামর্শ দিয়েছেন জনি লিভার। নিজের অভিজ্ঞতা থেকে তিনি বলেন, ‘১২ বছর ধরে আমি কোনো সিনেমায় সুযোগ পাইনি। এ সময় ধরে আমি হোমওয়ার্ক করেছি। অন্য শিল্পীদের কাজ দেখেছি।’
গোলমাল দিয়ে নতুন করে ফেরার আগ পর্যন্ত তিনি ছোটখাটো শো করে নিজেকে ব্যস্ত রেখেছেন।
শিল্পীদের এসব অভিজ্ঞতা ও বক্তব্য থেকে শেখার আছে অনেক কিছু। রুপালি জগতে অর্থের অভাব না থাকলেও যেকোনো সময় একজন শিল্পী দুরবস্থায় পড়তে পারেন। সে সময়ের জন্য নিজেকে প্রস্তুত করতে হবে। সাধারণত শোবিজের মানুষ প্রচুর অর্থ খরচ করেন। এতটা বিলাসী জীবনযাপন না করে অসময়ের জন্য সঞ্চয় করাই উপযুক্ত। কেননা খারাপ সময়ে ওই সঞ্চয় তাকে সাহায্য করবে ঘুরে দাঁড়াতে। আর শাহরুখ খান তো বলেছেন—হার কার জিতনে ওয়ালে কো বাজিগর কেহতে হ্যায়।
সূত্র: টাইমস অব ইন্ডিয়া










