রাজেশ খান্নার সিনেমার জন্য চিত্রনাট্য লিখতে গিয়ে তৈরি হয়েছিল একটি জুটি। সে জুটি ভেঙে যায় অমিতাভ বচ্চনের সিনেমার জন্য চিত্রনাট্য লেখার সময়। জুটি তৈরির পেছনে রাজেশ খান্নার অবদান ছিল, তবে ভাঙার পেছনে অমিতাভ বচ্চনের প্রভাব ছিল না। জুটি ভেঙেছিল সময়ের দাবিতে। ব্যান্ড যেমন ভাঙে এর সদস্যদের পরিকল্পনা, ধারণা ও দর্শন বদলে যাওয়ার কারণে, বলিউডের এ কিংবদন্তি চিত্রনাট্যকার জুটিও ভেঙেছিল তেমনই এক কারণে। বেশকিছু হিট ও দর্শকনন্দিত সিনেমা উপহার দেয়ার পর একদিন জাভেদ আখতারের মনে হয়েছিল, তিনি আলাদাভাবেই কাজ করতে চান। তারপর ভেঙে গিয়েছিল সেলিম খান ও জাভেদ আখতারের কিংবদন্তি জুটি।
সিনেমা জগতে সেলিম-জাভেদ জনপ্রিয় নাম। তাদের চিত্রনাট্য মানেই হিট সিনেমা। এ জনপ্রিয়তার মধ্যেই জাভেদ আখতার চাইলেন নিজের নামে পরিচিত হতে। এর পেছনে ছিল চিন্তাধারার ভিন্নতা। সেলিম খানের সঙ্গে জাভেদ আখতারের বয়সের পার্থক্য ছিল ১০ বছর। জাভেদ ভাবতেন সময়ের সঙ্গে। কিছুটা পিছিয়ে ছিলেন সেলিম। বিষয়টি সামনে আসার আগে দুজন একসঙ্গে বসে চিত্রনাট্য নিয়ে ভেবেছেন, কেটেছেন, শুরু করেছেন নতুন করে। কিন্তু একটা সময় ভাবনার ভিন্নতা বড় হয়ে উঠেছিল। অনিতা পাণ্ডে মারাঠি ভাষায় লেখা তার ‘ইয়ে রাঙ্গ, ইয়ে রুপ’ বইয়ের জন্য সেলিম খানের দীর্ঘ সাক্ষাৎকার নিয়েছিলেন। সেখানে এ বিচ্ছেদ সম্পর্কে নানা তথ্য দিয়েছেন সেলিম খান।
মিস্টার
ইন্ডিয়ার জন্য প্রথমে অমিতাভের কাছে গিয়েছিলেন এ জুটি। কিন্তু
অমিতাভের ভাষ্য ছিল, দর্শক হলে আসবে তাকে দেখতে। তিনি অদৃশ্য থাকলে সে সিনেমা করার
কোনো অর্থ থাকে না। অনিতার বই অনুসারে, এ
ঘটনার পর জাভেদ অমিতাভের
ওপর ক্ষেপে গিয়েছিলেন। তিনিই সেলিমকে বলেন, অমিতাভের সঙ্গে আর সিনেমা করা
উচিত হবে না। কিন্তু পরবর্তী সময়ে অমিতাভের হোলির পার্টিতে জাভেদ তাকে বলেছিলেন যে সেলিম খান
তার (অমিতাভ) সঙ্গে কাজ করতে আর আগ্রহী নন।
এ দ্বিচারিতার কোনো উত্তর অবশ্য অনিতা খুঁজতে যাননি।
জাভেদ আখতার তখন গানও লিখছিলেন, বিশেষত যশ চোপড়ার ‘সিলসিলা’ থেকে তা শুরু হয়। জাভেদ আখতার সেলিম খানকে বলেছিলেন, ‘চিত্রনাট্যের মতো গীতিকার হিসেবেও দুজনের নামই দেয়া হোক।’ কিন্তু সেলিম খান রাজি হননি। তার মতে, ‘যে কাজ আমি করিনি, তার জন্য কৃতিত্ব নিতে আমি রাজি নই।’ এরপর গীতিকার হিসেবে জাভেদ আখতারের সুনাম কেবল বেড়েই গেছে। এরপরই একদিন জাভেদ নিজ থেকে বলেন, তাদের আলাদা হয়ে যাওয়াই ভালো।
সেলিম খানের ভাষ্য অনুসারে, একদিন সব কাজ শেষ করে ফিরে যাওয়ার সময় জাভেদ তাকে বলেন, ‘আমি ভাবছিলাম, আমাদের আলাদা হয়ে কাজ করা উচিত।’ তখন একমুহূর্ত ভেবে নিয়ে সেলিম বলেন, ‘তুমি যখন বলছ, আমি জানি, সব ভেবে মনস্থির করেই বলেছ। আমার কোনো কথায় সিদ্ধান্ত বদলাবে না।’ এ কথা বলে সেলিম নিজের গাড়ির দিকে হাঁটতে শুরু করেন এবং অভ্যাসবশত জাভেদ সেলিমের পাশে হাঁটছিলেন। সেদিকে ফিরে রাগত সেলিম বলেছিলেন, ‘নিজের খেয়াল রাখার মতো যথেষ্ট বয়স আমার হয়েছে।’ এখানেই শেষ হয়ে যায় সেলিম-জাভেদ জুটি।
পরবর্তী সময়ে জাভেদ আখতার নিয়মিত কাজ করে যাচ্ছিলেন। চিত্রনাট্য রচনা, গান লেখা সবই চলছিল দ্রুতগতিতে। থেমে গিয়েছিল সেলিম খানের ক্যারিয়ারের চাকা। তিনি বলেন, ‘বহুদিন আমি টেলিফোনের পাশে বসে ছিলাম। কোনো ফোন আসেনি। একটু পরপর দেখতাম ফোন কাজ করছে কিনা।’ দুজনের মধ্যে এক ধরনের তিক্ততা তৈরি হয়েছিল। আশির দশকের শেষ দিকে তিনি আবার নতুন করে ফিরে আসেন। এ সময় জাভেদ আখতারের সিনেমা সম্পর্কে তিনি নেতিবাচক মন্তব্যও করেছেন।
তবে তিক্ততা বেশিদিন থাকেনি। তিক্ততা থেকে তারা একটি সাধারণ হৃদ্যতার সম্পর্ক তৈরি করেন। তাদের বিভিন্ন অনুষ্ঠানে একসঙ্গে দেখা গেলেও খুব বেশি কথা কখনো বলতেন না। এখন আর তিক্ততা নেই। কিন্তু পূর্বের সে হৃদ্যতাও নেই। তার চেয়েও বড় কথা, এ বিচ্ছেদে বলিউড হারিয়েছে অনেক জনপ্রিয় চিত্রনাট্যের সম্ভাবনা।
স্ক্রল ডট ইন অবলম্বনে মাহমুদুর রহমান










