একাডেমি অ্যাওয়ার্ডসের ৯৫তম আসরের সব আলো কেড়ে নিল এশিয়া। সায়েন্স ফিকশন ঘরানার এভরিথিং এভরিহোয়্যার অল অ্যাট ওয়ান্স জিতে নিয়েছে সেরা সিনেমার পুরস্কার। এর বাইরেও সিনেমাটি আরো ছয় বিভাগে পুরস্কৃত হয়েছে। এছাড়া সেরা অভিনেত্রী, সেরা পরিচালক (ড্যানিয়েল কোয়ান ও ড্যানিয়েল শেইনার্ট), সেরা পার্শ্ব অভিনেতা, সেরা সম্পাদনা ও সেরা চিত্রনাট্য বিভাগেও পুরস্কৃত করা হয়েছে। বললে ভুল হবে না যে ৯৫তম অস্কারের আসরটি ছিল মূলত এ সিনেমার। ১১টি মনোনয়নের মধ্যে সাত বিভাগে পুরস্কৃত হয়ে সিনেমাটি সেরার সেরা হয়েছে।
এবার অস্কার ছিল এশিয়ার জন্য বিশেষ। কেননা এভরিথিং এভরিহোয়্যার অল অ্যাট ওয়ান্স সেরা সিনেমা হওয়ার পাশাপাশি সেরা অভিনেত্রীর পুরস্কার পেয়েছেন মিশেল ইয়ো। তিনি প্রথম এশিয়ান হিসেবে অস্কারে সেরা অভিনেত্রী হলেন। মার্শাল আর্ট ও অ্যাকশনভিত্তিক সিনেমায় তার দীর্ঘ ক্যারিয়ারের পর অস্কারের মতো সম্মান লাভ করলেন। তিনি এ পুরস্কারপ্রাপ্তিকে এশিয়ানদের বলে সম্মান জানান। অস্কার ভাষণে মিশেল বলেন, ‘আমার মতো দেখতে ছেলেমেয়েদের (এশিয়ান) বলছি, এ পুরস্কার তোমাদের জন্য আশা ও সম্ভাবনার আলো দেখাচ্ছে।’ এছাড়া নারীদের উদ্দেশ্য করে বলেন, ‘আপনার সেরা সময় পার হয়ে গেছে, এ কথা বলার সুযোগ কাউকে দেবেন না।’
সেরা সময় পার হয়ে কেউ ফুরিয়ে যায় না বা ফুরিয়ে যাওয়ার আগেও জ্বলে উঠতে পারেন। এ কথার প্রমাণ দিলেন ব্রেন্ডন ফ্রেজার। নব্বইয়ের দশকের এ অভিনেতা হারিয়েই গিয়েছিলেন। কিন্তু ফিরে এসেই বাজিমাত করলেন। দ্য হোয়েল সিনেমায় অভিনয় করে তিনি জিতে নিয়েছেন সেরা অভিনেতার পুরস্কার। তিনি বলেন, ‘আমি ৩০ বছর এ পেশায় আছি। কোনোকিছুই সহজে আসেনি। তবে সুযোগ যতক্ষণ না হারিয়েছে, ততক্ষণ আমি তার মূল্য বুঝতে পারিনি।’
সেরা পার্শ্ব অভিনেতার পুরস্কার পেয়েছেন আমেরিকান-ভিয়েতনামের অভিনেতা কে হুয়ে কোয়ান। তিনিও এ পুরস্কার পেয়েছেন এভরিথিং এভরিহোয়্যার অল অ্যাট ওয়ান্সে অভিনয়ের জন্য। তার পাশাপাশি এ সিনেমায় অভিনয়ে সেরা পার্শ্ব অভিনেত্রী হয়েছেন জেমি লি কার্টিস।
এশিয়ার ক্ষেত্রে এবারের অস্কারে চমক দিয়েছে ভারত। আরআরআর সিনেমার নাটু নাটু নিয়ে অনেক আশা ছিল এবং আশাহত হয়নি ভারত। গানটি বেস্ট অরিজিনাল সং বিভাগে পুরস্কার জিতে নিয়েছে। পাশাপাশি অস্কার মঞ্চে ছিল নাটু নাটুর পারফরম্যান্স। নাটু নাটু পুরস্কার পেয়ে যাবে এমন ধারণা কম বেশি সবার ছিল, তবে চমকে দিয়েছে সেরা ডকুমেন্টারি শর্ট ফিল্ম। দি এলিফ্যান্ট হুইসপারারস এ বিভাগে সেরা হয়েছে। কার্তিকি গনজালভেস ও গুণিত মোঙ্গার নির্মাণে তথ্যচিত্রটি ভারতের ঐতিহ্য ও সংস্কৃতিকে তুলে ধরে। অন্যদিকে অস্কার হাতে এমএম কিরাবানি বলেন, ‘আমার মনে শুধু একটাই আশা ছিল। আরআরআরকে জিততে হবে। এটা সব ভারতীয়র আশাবাদ। আমার মনে হচ্ছে আমি পৃথিবীর শীর্ষে আছি।’ এবার অস্কারের মঞ্চে ভারতের আরেকটি অংশগ্রহণ ছিল। অস্কার প্রেজেন্টার হিসেবে ছিলেন দীপিকা পাড়ুকোন। তবে উপস্থাপক জিমি কিমেল আরআরআরকে বলিউড সিনেমা হিসেবে উল্লেখ করায় ভারতের বিশেষত দক্ষিণের, দর্শকরা ক্ষুব্ধ হয়েছেন।
অস্কার কারা পাবে, তা নিয়ে নানা আলোচনাই হয়েছে। পূর্বাভাস মিলেছে জার্মান সিনেমা অল কোয়ায়েট অন দ্য ওয়েস্টার্ন ফ্রন্টের ক্ষেত্রে। সিনেমাটি চার বিভাগে পুরস্কার জিতেছে। এর মধ্যে আছে অরিজিনাল স্কোর, সেরা সিনেমাটোগ্রাফি, বেস্ট ইন্টারন্যাশনাল ফিচার ও বেস্ট প্রডাকশন ডিজাইন। পুরস্কার পেয়েছে অ্যাভাটার ও টপ গান ম্যাভেরিক। ২০২২ সালের সেরা ব্যবসা করা সিনেমা দুটোকে বাদ দেয়নি একাডেমির জুরি। টপ গান পেয়েছে বেস্ট সাউন্ড ও অ্যাভাটার: দ্য ওয়ে অব ওয়াটার পেয়েছে সেরা ভিজুয়াল ইফেক্টের পুরস্কার। অ্যাঞ্জেলা ব্যাসেট এবার সেরা পার্শ্ব অভিনেত্রী হবেন এমনও গুঞ্জন ছিল। কিন্তু সেরা কস্টিউম ডিজাইনের পুরস্কারই কেবল পেল ওয়াকান্ডা ফরএভার।
তবে গিয়ের্মো দেল তোরো পরিচালিত পিনোকিও পেয়েছে সেরা অ্যানিমেশন সিনেমার পুরস্কার। সেরা তথ্যচিত্রে নাভালনি পুরস্কার জিতে অনেককেই অবাক করেছে। তবে এ রকমই হয়ে থাকে অস্কারের মঞ্চে। শেষ মুহূর্তে বদলে যায় অনেক হিসাব। যেমন গত বছর এক কাণ্ড করেছিলেন উইল স্মিথ। সেই থাপ্পড় কাণ্ডের রেশ এখনো কাটেনি। বিষয়টি নিয়ে এবারের আসরেও উপস্থাপক মজা করেছেন। তবে এর মধ্যে ছিল হুঁশিয়ারি। যেন এমন ঘটনা মঞ্চে আর না ঘটে।
এক নজরে বিজেতারা
সেরা সিনেমা: এভরিথিং এভরিহোয়্যার অল অ্যাট ওয়ান্স
সেরা অভিনেতা: ব্রেন্ডন ফ্রেজার
সেরা অভিনেত্রী: মিশেল ইয়ো
সেরা পরিচালক: ড্যানিয়েল কোয়ান ও ড্যানিয়েল শেইনার্ট
সেরা সম্পাদনা: পল রজার্স
সেরা মৌলিক গান: নাটু নাটু
সেরা শব্দ (বেস্ট সাউন্ড): টপ গান: ম্যাভেরিক
সেরা রূপান্তরিত চিত্রনাট্য: সারাহ পলি (উইমেন টকিং)
সেরা মৌলিক চিত্রনাট্য: এভরিথিং এভরিহোয়্যার অল অ্যাট ওয়ান্স
সেরা ভিজুয়াল ইফেক্ট: অ্যাভাটার: দ্য ওয়ে অব ওয়াটার
সেরা মৌলিক স্কোর: অল কোয়ায়েট অন দ্য ওয়েস্টার্ন ফ্রন্ট
সেরা প্রডাকশন ডিজাইন: অল কোয়ায়েট অন দ্য ওয়েস্টার্ন ফ্রন্ট
সেরা অ্যানিমেটেড শর্ট ফিল্ম: দ্য বয়, দ্য মোল, দ্য ফক্স অ্যান্ড দ্য হর্স
সেরা স্বল্পদৈর্ঘ্য তথ্যচিত্র: দি এলিফ্যান্ট হুইসপারস
সেরা ইন্টারন্যাশনাল ফিচার: অল কোয়ায়েট অন দ্য ওয়েস্টার্ন ফ্রন্ট
সেরা কস্টিউম ডিজাইন: ওয়াকান্ডা ফরএভার
সেরা মেকআপ ও হেয়ার স্টাইলিং: দ্য হোয়েল
সেরা সিনেমাটোগ্রাফি: অল কোয়ায়েট অন দ্য ওয়েস্টার্ন ফ্রন্ট
সেরা লাইভ অ্যাকশন শর্ট: অ্যান আইরিশ গুডবাই
সেরা ডকুমেন্টারি ফিচার: নাভালনি
সেরা পার্শ্ব অভিনেতা: কে হুয়ে কোয়ান
সেরা পার্শ্ব অভিনেত্রী: জেমি লি কার্টিস
সেরা অ্যানিমেটেড ফিচার: গিয়ের্মো দেল তোরো’স পিনোকিও
ভ্যারাইটি অবলম্বনে মাহমুদুর রহমান










