প্রখ্যাত নির্মাতা অমিতাভ রেজা চৌধুরী। বিজ্ঞাপন, টিভি নাটক, চলচ্চিত্র, ওয়েব সিরিজ নির্মাণে নিজের মুনশিয়ানা দেখিয়েছেন ‘আয়নাবাজি’খ্যাত এ নির্মাতা। শিক্ষার্থীদের কোটা সংস্কার ও সরকার পতনের এক দফা আন্দোলনে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেছিলেন তিনি। সাম্প্রতিক সময়ে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের বন্যা, শিক্ষার্থীদের আন্দোলন ও তার কাজ নিয়ে কথা বলেছেন বণিক বার্তার সঙ্গে। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন অহিদুর রহমান
কেমন আছেন?
সুস্থ আছি, কাজকর্ম শুরু করেছি।
বন্যার্তদের সাহায্যার্থে আপনাদের দৃশ্যমাধ্যম শিল্পীসমাজের কোনো উদ্যোগ ছিল কী?
আমরা এরই মধ্যে লক্ষ্মীপুরে ৫০০ মানুষের জন্য এক ট্রাক খাবার পাঠিয়েছি। টিএসসিতেও এক ট্রাক পাঠিয়েছি। আরো কিছু খাবার জোগাড় হচ্ছে। এছাড়া পাহাড়ে টাকা পাঠিয়েছি আমরা। আরো টাকা জোগাড় করছি, দৃশ্যমাধমের কর্মীরা অক্লান্ত পরিশ্রম করে যাচ্ছেন।
শিক্ষার্থীদের আন্দোলনে আপনাকে সক্রিয় দেখা গেছে। রাস্তায়ও নেমেছেন বারবার। এ আন্দোলন আপনাকে তাড়িত করল কেন?
আমরা রাজনৈতিক ভয়ে অনেক কিছুই বলতে পারছিলাম না। শিক্ষার্থীদের আন্দোলনটা রাজনৈতিক না হলেও আমি বলব, এটা একটা ভাবাদর্শিক আন্দোলনে নিয়ে গেছে তারা। এ আন্দোলনটা ছিল ন্যায্যতার আন্দোলন। তারা ইনসাফের জন্য লড়াই করেছে। হত্যা-নিপীড়ন রাষ্ট্র ও সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে আন্দোলন করেছে। শিক্ষার্থীদের সঙ্গে এই সময় থাকাটা আমার কাছে তখন নৈতিক দায়িত্ব মনে হয়েছে। সেখান থেকেই আমি তাদের সঙ্গে অংশগ্রহণ করি।
শিক্ষার্থীদের আন্দোলনে শিল্পীদের দুভাগে বিভক্ত হতে দেখা গেছে, এটি কীভাবে দেখেন?
তারা তাদের কোনো উদ্দেশ্য কিংবা স্বার্থের জন্য হয়তো দাঁড়িয়েছে, এটা বলতে পারব না, তাদের পছন্দ। তারা ঠিক করেছে নাকি ভুল করেছে, এটা সময় বলে দেবে।
অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠনের পর যে যার মতো দাবি নিয়ে বিভিন্ন জায়গায় রাস্তা আটকাচ্ছে। বিষয়টা আপনি কীভাবে দেখেন?
বিষয়টা একেবারে স্বাভাবিক। যখন রাষ্ট্রের প্রতিটি সেক্টরে অরাজকতা, অনিয়ম, দুর্নীতি বহু বছর ধরে চলতে থাকে। এরপর যখন একটা ফ্যাসিস্ট শক্তি পুরোপুরি ধসে যায়, সে সময় মানুষ রাস্তায় নামে দাবি আদায়ের জন্য, যা মানুষের দীর্ঘদিনের জমানো ক্ষোভের ফল। যখন মানুষ ন্যায্যতার সুযোগ পায়, সবাই যার যার মতো করে দাবি করে এবং তারা মনে করে দাবিটি করলে মনে হয় এখনই আদায় হয়ে যাবে। কিন্তু এটা বুঝতে হবে, রাষ্ট্র কাঠামো অনেক কঠিন। এখনো দেশের আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়নি। তবে যারা দাঁড়াচ্ছে তাদের কিছু দাবি হয়তো যৌক্তিক। আর কিছুটা উস্কানিও আছে।
এতদিন যাদের চাকরি চলে গেছে কিংবা পদোন্নতি হয়নি তাদের মধ্যে ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। মানুষের মধ্যে এ ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ একসঙ্গে হচ্ছে। যেকোনো বিপ্লব কিংবা গণ-অভ্যুত্থানের পর এ ধরনের পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়। তবে অরাজকতার ঘটনা ইতিহাসের তুলনায় আমাদের কমই হয়েছে।
শিক্ষার্থীদের আন্দোলন থেকে শুরু করে বন্যায়ও প্রতিটি মানুষ হাতে হাত মিলিয়ে কাজ করছে, এ বিষয়কে কীভাবে দেখেন?
অবশ্যই বাংলাদেশের মানুষ এ মুহূর্তে একতাবদ্ধ হয়েছে। সবচেয়ে সুন্দর ও অদ্ভুতভাবে তারা একত্রে কাজ করছে। জাতি, ধর্ম, বর্ণ নির্বিশেষে সবাই মিলিত হয়েছে এবং বন্যার্তদের পাশে দাঁড়িয়েছে। খুব গুরুত্বপূর্ণ কথা, এর আগে কোনোদিন মানুষ মানুষের পক্ষে এত সহজে দাঁড়ায়নি। কারণ কখনো এ দেশটাকে তাদের নিজের মনে হয়নি। এই প্রথমবার দেশটাকে তাদের নিজের মনে হচ্ছে। মনে হয়েছে এ দেশকে গড়া তাদের নিজ দায়িত্ব। সে কারণেই মানুষ এক হয়েছে।
এরই মধ্যে উপদেষ্টা নাহিদ ইসলাম বলেছেন সেন্সর বোর্ড সংস্কার করবেন, এ বিষয় নিয়ে আপনার অভিমত কী?
এখন এটা আলোচনা করার মতো বিষয় নয়, কারণ বন্যার্তদের পাশে দাঁড়ানোসহ আরো অনেক সমস্যা আছে। সংস্কার হলে সবকিছুই সংস্কার হবে। আমার মনে হয়, উপদেষ্টা নাহিদ সবার সঙ্গে বসে সবার পরামর্শ নিয়ে, বাংলাদেশের বেশির ভাগ মানুষের জন্য যেটা ঠিক মনে হয় এবং আমাদের সিনেমার জন্য যেটা ভালো হয় সে রকম একটা সিদ্ধান্ত নেবেন।
সেন্সর বোর্ড বাতিল নিয়ে আপনার মতামত কী?
সেন্সর বোর্ড থাকবে না, তবে সেন্সর সার্টিফিকেশন থাকবে এবং সেটার সংস্কার প্রয়োজন হবে। পৃথিবীর অনেক দেশে সেন্সর সার্টিফিকেশন সিস্টেম আছে। আমাদের দেশে এটা প্রয়োজন।
শিক্ষার্থীদের আন্দোলন কিংবা ছাত্র হত্যা নিয়ে কোনো সিনেমা বানানোর পরিকল্পনা আছে কিনা?
আসলে এ মুহূর্তে সিনেমা বানানোর কোনো পরিকল্পনা নেই। আমার পাইপলাইনে যে সমস্ত সিনেমা আছে, সেগুলোই আমি সামনে করার চেষ্টা করব। এ মুহূর্তে নতুন কোনো সিনেমা বানানোর আসলেই কোনো পরিকল্পনা নেই।
বেশ অনেকদিন হয়ে গেল সিনেমার শুটিং বন্ধ। সিনেমা ইন্ডাস্ট্রি আবার কোনো হুমকির দিকে পড়তে যাচ্ছে বলে আপনি মনে করেন?
সামনের দিকে আরো ভালো হবে। এ রকম একটা পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে আমরা যাচ্ছি, আমাদের কিছুটা ধৈর্য ধরতে হবে। এখন রাষ্ট্র বিনির্মাণের সময়। এখনই সবকিছু স্বাভাবিক যাবে এমনটা নয়। যুদ্ধ কখনো শেষ হয় না, যুদ্ধ চলমান। আর সেটা মেনে নিয়েই এ লড়াই, শিল্পীদেরও এটা মেনে নিতে হবে।










