প্রতিটি পেশার সঙ্গেই কিছু শব্দের যোগাযোগ থাকে। সাংবাদিকতার ক্ষেত্রে কয়েকটি শব্দ হলো—স্কুপ, বিট, বাইট, কোট, স্টোরি, বাইলাইন ইত্যাদি। এর মধ্যে স্কুপ খুবই প্রচলিত ও জনপ্রিয়। সাংবাদিকতা সম্পর্কে যারা তেমন কিছু জানেন না, তারাও কখনো না কখনো স্কুপ শব্দটি শুনেছেন। আজকের দিনের হিসেবে স্কুপ একটু পুরনো শব্দ। এ কালে ব্রেকিং নিউজ যতটা পরিচিত, এককালে স্কুপ ততটাই পরিচিত ছিল। তবে ব্রেকিং নিউজ যতটা সর্বব্যাপী, স্কুপ ততটা ছিল না। কেননা এটি অনেকটাই সাংবাদিকতার টেকনিক্যাল টার্ম। আইসক্রিমের স্কুপ বলতে একটি নির্দিষ্ট পরিমাণ বোঝায়, খবরের ক্ষেত্রে স্কুপ হলো একটি খবর বা ঘটনা সম্পর্কে বিশেষ কোনো তথ্য, যা তখন পর্যন্ত অন্য কোনো প্রতিষ্ঠানের জানা নেই।
স্ক্যাম ১৯৯২-এর পর হানসল মেহতা নিয়ে এসেছেন খবরের পেছনে থাকা নানা ঘটনার গল্প। স্কুপ মূলত এ শতকের দ্বিতীয় দশকের সাংবাদিকতার গল্প। অবশ্য সেটা মুম্বাইকেন্দ্রিক। ২০১১ সাল নাগাদ একজন সাংবাদিকের সঙ্গে ঘটে যাওয়া সত্য ঘটনার ওপর নির্ভর করে তিনি এর গল্প সাজিয়েছেন। স্কুপের পেছনে ঘুরতে থাকা এক নারী সাংবাদিক কেমন করে খবরের পেছনে থাকা জটিলতার জালে জড়িয়ে পড়েন, সে গল্পই বলেছে স্কুপ। আর এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে মুম্বাইয়ের অপরাধ জগৎ, পুলিশ, সাধারণ মানুষ, বাইকুল্লা জেল ও ভারতের গণমাধ্যম। ছয় পর্বের এ সিরিজের মাধ্যমে হানসল মেহতা কিছু না-বলা গল্প বলতে চেয়েছেন, যেখানে খবরের পাশাপাশি উঠে এসেছে নারী সচেতনতা ও নিরাপত্তার প্রসঙ্গ।
সিরিজ শুরু হয় জাগরুতি পাঠক নামে এক সাংবাদিকের যাত্রার মধ্য দিয়ে। ইস্টার্ন এজ পত্রিকার ক্রাইম রিপোর্টার তিনি। একাধিক স্কুপ দিয়েছেন, দিতে চান আরো বেশি। এডিটর ইন চিফ ইমরান তার সমর্থনে থাকেন সবসময়। এর অন্যতম কারণ জাগরুতির সংবাদ বস্তুনিষ্ঠ। তিনি অকারণে কাউকে অভিযুক্ত করেন না। একাধিক সোর্স থেকে খবর নিশ্চিত করেই উপস্থাপন করেন। এর বাইরে জাগরুতির আছে পেশাদারি মনোভাব, যা তাকে তার ক্যারিয়ারে সাহায্য করেছে। সাত বছরের ক্যারিয়ারে তিনি ক্রাইম রিপোর্টার থেকে পেয়েছেন ডেপুটি ব্যুরো চিফের দায়িত্ব। এর মধ্যে একদিন তিনি পেয়ে যান ছোটা রাজনের ফোন কল। একটি এক্সক্লুসিভ ইন্টারভিউ বদলে দেয় তার জীবন।
জাগরুতির ক্যারিয়ার আরো এগিয়ে যাওয়ার কথা ছিল, কিন্তু শেষ পর্যন্ত তার জায়গা হয় জেলে। এর কারণ আরেকজন সিনিয়র রিপোর্টারের মৃত্যু। নিউজ ডের সিনিয়র রিপোর্টার জয়দেব সেনের মৃত্যু হয় সন্ত্রাসীর গুলিতে। বলা হয় এ হত্যার পেছনে ছোটা রাজনকে তথ্য দিয়ে সাহায্য করেছিলেন জাগরুতি। এরপর তার নয় মাসের জীবন কেটেছিল বাইকুল্লা জেলে। সে সময় সিটি মিরর নামে আরেকটি পত্রিকাসহ অন্যান্য মিডিয়া জাগরুতি সম্পর্কে যে বিষয়গুলো তুলে ধরে, তা নিয়েই এগোতে থাকে সিরিজ। হানসল আমাদের দেখান, মিডিয়ার জটিল ও কঠিন বাস্তবতা। এর সঙ্গে যুক্ত হয় মুম্বাই পুলিশের নিজস্ব এজেন্ডা। যে কারণে জাগরুতিকে জেল থেকে বের করা কঠিন থেকে কঠিনতম হতে থাকে। তার বিরুদ্ধে নতুন নতুন অভিযোগ আনার পাশাপাশি মিডিয়াই তার সম্পর্কে প্রচার শুরু করে নানা মিথ্যা তথ্য।
হানসল মেহতা তার ‘স্কুপ’ তৈরি করেছেন জিগনা ভোরার গল্প থেকে। ২০১১ সালে জ্যোতির্ময় দে হত্যাকাণ্ডের পর জিগনাকে গ্রেফতার করা হয়। তার জায়গা হয়েছিল বাইকুল্লা জেলে। এরপর তিনি জেলজীবন নিয়ে লিখেছেন ‘বিহাইন্ড দ্য বারস ইন বাইকুল্লা: মাই ডেজ ইন প্রিজন’। সে বইকে আধার হিসেবে ধরেই ‘স্কুপ’ তৈরি করেছেন হানসল। এ সিরিজে প্রায় প্রতিটি চরিত্র বাস্তব। কারিশমা তান্না অভিনয় করেছেন জিগনার চরিত্রে। ইমরান চরিত্রে জিশান আইয়ুব আসলে ‘ডংরি টু দুবাই’-এর লেখক হোসেইন জাইদিকে উপস্থাপন করেছেন। হারমান বাওয়েজার হর্ষবর্ধন শ্রফের চরিত্রটি মহারাষ্ট্র পুলিশের এডিজিপি হিমাংশু রায়ের আদলে লিখিত।
সিরিজ হিসেবে স্কুপ উতরে গেছে। কেননা যে গল্প বলতে চেয়েছেন হানসল, তা তিনি বলেছেন। তবে উপস্থাপনে হানসলের আগের কাজগুলোর (শহীদ, আলীগড়, স্ক্যাম: ১৯৯২) তুলনায় একটু পিছিয়ে থাকবে। কেননা সিরিজ দেখতে গিয়ে মনে হবে, হানসল কেন যেন অনেক কিছু বলতে পারছেন না। কারিশমা ভালো অভিনয় করলেও ক্রাইম রিপোর্টার তাকে মনে হচ্ছিল না। অপরাধ সাংবাদিকের ধাঁচটি যেন কিছুটা হারিয়েছে। তবে জায়গাটি পুষিয়ে দিয়েছেন জিশান আইয়ুব। পুরো সিরিজে ইমরান চরিত্রে তিনি যেন একটা নীতি ধরে রেখেছিলেন। হারমানও অনেকদিন পর ফিরে ভালো অভিনয় করেছেন। তবে সিরিজটি একটি কারণে হলেও এ সময়ে গুরুত্বপূর্ণ। খবরের আড়ালে থাকা যে চোরাবালির কথা হানসল বলেছেন, তা বলা প্রয়োজন ছিল।










