২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলা মামলায় বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানসহ সব আসামিকে খালাস দিয়ে হাইকোর্ট যে রায় দিয়েছিলেন, তা বহাল রেখেছেন আপিল বিভাগ। হাইকোর্টের রায়ের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রপক্ষের করা আপিল সর্বসম্মতিতে খারিজ করে প্রধান বিচারপতি সৈয়দ রেফাত আহমেদের নেতৃত্বাধীন ছয় সদস্যের আপিল বিভাগ গতকাল এ রায় দেন।

আদালতে তারেক রহমান ও বাবরের পক্ষে শুনানি করেন অ্যাডভোকেট এসএম শাহজাহান ও অ্যাডভোকেট মোহাম্মদ শিশির মনির। রাষ্ট্রপক্ষে ছিলেন অ্যাটর্নি জেনারেল মো. আসাদুজ্জামান, অতিরিক্ত অ্যাটর্নি জেনারেল অনীক আর হক, আব্দুল জব্বার ভূঁইয়া ও ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল আবদুল্লাহ আল মাহমুদ মাসুদ।

রায় ঘোষণার সময় আদালতে বিএনপির আইনজীবীদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন জ্যেষ্ঠ আইনজীবী জয়নুল আবেদীন, ব্যারিস্টার মাহবুব উদ্দিন খোকন, ব্যারিস্টার কায়সার কামাল, ব্যারিস্টার রুহুল কুদ্দুস কাজল, অ্যাডভোকেট গাজী কামরুল ইসলাম সজল, অ্যাডভোকেট আমিনুল ইসলাম, অ্যাডভোকেট মাকসুদ উল্লাহ, অ্যাডভোকেট মোহাম্মদ ছিদ্দিক উল্লাহ মিয়া, অ্যাডভোকেট জাকির হোসেন, অ্যাডভোকেট আনিসুর রহমান রায়হান বিশ্বাস,অ্যাডভোকেট সামসুল ইসলাম মুকুল ও আজমল হোসেন খোকন।

বিচারপতি একেএম আসাদুজ্জামান ও বিচারপতি সৈয়দ এনায়েত হোসেনের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ এর আগে গত বছরের ১ ডিসেম্বর দণ্ডপ্রাপ্ত সব আসামিকে খালাস দেন। রাষ্ট্রপক্ষ ওই রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করেছিল।

রাজধানীর বঙ্গবন্ধু এভিনিউয়ে ২০০৪ সালের ২১ আগস্ট আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনার সমাবেশে গ্রেনেড হামলা হয়। এতে ২৪ জন নিহত হন। আহত হন শতাধিক নেতাকর্মী। এ ঘটনায় মতিঝিল থানায় হত্যা ও বিস্ফোরক দ্রব্য আইনে দুটি মামলা হয়। মামলার তদন্ত নিয়ে তখন নানা বিতর্ক উঠেছিল।

এক-এগারোর পটপরিবর্তনের পর ২০০৭ সালে তৎকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে নতুনভাবে মামলার তদন্ত শুরু করে সিআইডি। সংস্থাটি ২২ জনকে আসামি করে পরের বছর আদালতে অভিযোগপত্র দেয়। তবে ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর অধিকতর তদন্তে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানসহ আরো ৩০ জনকে আসামির তালিকায় যুক্ত করা হয়।

বিচারিক কার্যক্রম শেষে ২০১৮ সালের ১০ অক্টোবর ঢাকার দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনাল-১-এর বিচারক শাহেদ নূর উদ্দিন আলোচিত এ মামলার রায় দেন। ওই রায়ে সাবেক স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী লুৎফুজ্জামান বাবর ও সাবেক শিক্ষা উপমন্ত্রী আবদুস সালাম পিন্টুসহ ১৯ জনকে মৃত্যুদণ্ড দেয়া হয়। এছাড়া রায়ে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানসহ ১৯ জনকে যাবজ্জীবন এবং আরো ১১ জনকে দেয়া হয় বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ড।

বিচারিক আদালতে এ রায়ের দেড় মাসের মাথায় অর্থাৎ ২০১৮ সালের ২৭ নভেম্বর মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্তদের ডেথ রেফারেন্সসহ মামলার নথি হাইকোর্টে আসে। ২০২২ সালের ৫ ডিসেম্বর ডেথ রেফারেন্স এবং আসামিদের আপিল ও জেল আপিল শুনানি শুরু হয়।

বিচারপতি সহিদুল করিম ও বিচারপতি মো. মোস্তাফিজুর রহমানের হাইকোর্ট বেঞ্চে শুনানি চলছিল। তবে আন্দোলনের মুখে গত বছরের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকার পতনের পর হাইকোর্ট বেঞ্চ পুনর্গঠন হলে শুনানি শেষে গত ১ ডিসেম্বর হাইকোর্ট এ মামলার সব আসামিকে খালাস দিয়ে রায় দেন।

এদিকে ২১ অগাস্ট গ্রেনেড হামলা মামলার বিচার শেখ হাসিনা নিজেই চাননি বলে মন্তব্য করেছেন বিএনপির আইনবিষয়ক সম্পাদক ব্যারিস্টার কায়সার কামাল। আপিল বিভাগের রায়ের পর তিনি আদালত চত্বরে সাংবাদিকদের বলেন, ‘শেখ হাসিনা প্রকৃত অর্থে ২১ অগাস্ট গ্রেনেড হামলা মামলার বিচার চাননি। যদি শেখ হাসিনা প্রকৃত অপরাধীদের বিচার চাইতেন, আইভী রহমান হত্যার বিচার চাইতেন তাহলে হয়তো রাজনৈতিক জিঘাংসার বশবর্তী হয়ে তারেক রহমানকে এ মামলায় অন্তর্ভুক্ত করতেন না।’

ব্যারিস্টার কায়সার কামাল বলেন, ‘সর্বোচ্চ আদালতের রায়ে প্রমাণ হয়েছে তারেক রহমান নির্দোষ। শেখ হাসিনা তার ব্যক্তিগত ক্ষোভের কারণেই এ মামলায় বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানকে আসামি করেছিলেন।’