বর্ষায় ক্ষতিগ্রস্ত ১৪২ কিলোমিটার সড়ক, স্ল্যাব ও নিরাপত্তা বেষ্টনী মেরামতে অর্থ সংকটে পড়েছে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন (চসিক)। বর্ষার প্রকোপ কমে এলেও সড়ক মেরামতের কাজ শুরু করতে পারেনি সংস্থাটি। এ অবস্থায় স্থানীয় সরকার বিভাগের কাছে ৫০০ কোটি টাকার বিশেষ বরাদ্দ চেয়েছে চসিক।

চসিকের প্রকৌশল বিভাগের তথ্যমতে, ছয়টি অঞ্চলের মোট ১৪২ দশমিক ২৮১ কিলোমিটার সড়ক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এসব সড়ক মেরামতে ৪২৬ কোটি ৮৪ লাখ ২২ হাজার ৭১০ টাকার ব্যয় প্রস্তাব করা হয়েছে, যা স্থানীয় সরকার ও প্রকৌশল অধিদপ্তরের দর অনুযায়ী প্রস্তুত। তবে পর্যাপ্ত অর্থ না থাকায় ৫০০ কোটি টাকার বিশেষ বরাদ্দের আবেদন জানানো হয়েছে।

গত আগস্টের মাঝামাঝি স্থানীয় সরকার বিভাগের সচিবকে দেয়া এক চিঠিতে মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন উল্লেখ করেন, চসিক প্রতি বছর নিজস্ব তহবিল থেকে নগরীর পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা, খাল-নালা খনন ও পুনঃখনন, সড়ক সংস্কার, সড়ক বাতি স্থাপন, স্বাস্থ্য ও শিক্ষা কার্যক্রমে বিপুল অর্থ ব্যয় করে। এবার রেকর্ড বৃষ্টিপাতে নগরীর বহু সড়ক ভেঙে বড় গর্ত সৃষ্টি হয়েছে, যা জলাবদ্ধতা ও দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়িয়েছে। সাম্প্রতিক অতিবৃষ্টির কারণে নগরীর সড়ক, ব্রিজ-কালভার্ট ও নালা মেরামত এবং খালের নিরাপত্তা বেষ্টনী স্থাপনের জন্য বিশেষ বরাদ্দ প্রয়োজন।

চসিক জানায়, অতিবৃষ্টির ফলে নগরীর গুরুত্বপূর্ণ সড়কগুলো মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। দেশের প্রধান বাণিজ্যিক নগরী চট্টগ্রামে প্রতিদিন বন্দরের লরি, কাভার্ড ভ্যান, ট্রাকসহ বিভিন্ন সেবা সংস্থার যানবাহন চলাচল করে। কিন্তু সড়কের দুরবস্থায় জরুরি পণ্য সরবরাহ, চিকিৎসাসেবা ও সামগ্রিক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড ব্যাহত হচ্ছে। এছাড়া খালের পাশে পর্যাপ্ত নিরাপত্তা বেষ্টনী না থাকায় দুর্ঘটনার ঝুঁকি বেড়েছে। সম্প্রতি বেশ কয়েকটি দুর্ঘটনায় হতাহতের ঘটনাও ঘটেছে।

চসিকের প্রকৌশল বিভাগের পরিকল্পনা অনুযায়ী, সড়ক ছাড়াও ১৮ হাজার ৬৬৩ বর্গমিটার নালা-নর্দমার স্ল্যাব ও ২১ হাজার ২৯৪ মিটার নিরাপত্তা বেষ্টনী মেরামত ও স্থাপন করা হবে। স্ল্যাব সংস্কারে ব্যয় হবে ৯ কোটি ৩৩ লাখ ১৫ হাজার ও নিরাপত্তা বেষ্টনীতে ২১ কোটি ২৯ লাখ ৩৭ হাজার টাকা। তবে এখনো কোনো বরাদ্দের নিশ্চয়তা না থাকায় বর্ষা-পরবর্তী সড়ক মেরামত চলছে ধীরগতিতে।

চসিক কর্মকর্তারা জানান, চলতি মৌসুমে বর্ষার ব্যাপকতা ছিল তীব্র। বরাদ্দ না থাকায় নগরীর গুরুত্বপূর্ণ ভাঙা সড়কগুলো ইট-বালি দিয়ে কোনো রকমে যান চলাচলের উপযোগী রাখা হচ্ছে। এতে তীব্র যানজট ও দুর্ঘটনার হার বাড়ছে। বিশেষ করে ভারী যানবাহন চলাচল করা সড়কগুলো সবচেয়ে নাজুক অবস্থায় পৌঁছেছে।

তথ্য অনুযায়ী, ১৪২ কিলোমিটার ক্ষতিগ্রস্ত সড়কের মধ্যে ২ নম্বর সড়ক অঞ্চলে ২৮ দশমিক ৪৮ কিলোমিটার, ৬ নম্বর অঞ্চলে ২৮ দশমিক ১৮ কিলোমিটার এবং ৫ নম্বর অঞ্চলে ২৭ দশমিক ২৭ কিলোমিটার সড়ক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ২ নম্বর অঞ্চলের চান্দগাঁও, কালুরঘাট, আরাকান সড়ক, মোহরা, কালুরঘাট ভারী শিল্প এলাকা, চকবাজার, দেওয়ানবাজার, কেবি আমান আলী রোড, কালামিয়া বাজার, বলিরহাটসহ বিভিন্ন সড়ক মারাত্মক ক্ষতিগ্রস্ত। ৬ নম্বর অঞ্চলের দক্ষিণ হালিশহর, বন্দরটিলা, ইপিজেড, পতেঙ্গা, স্টিল মিল বাজার, নারিকেলতলা, ইপিজেড থানা এলাকা এবং ৫ নম্বর অঞ্চলের সাগরিকা, উত্তর হালিশহর, নয়াবাজার, আমবাগান, পাহাড়তলী, খুলশী, জালালাবাদসহ গুরুত্বপূর্ণ এলাকাগুলোর সড়কও নাজুক অবস্থায় রয়েছে।

চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা শেখ মুহম্মদ তৌহিদুল ইসলাম বণিক বার্তাকে বলেন, ‘রেকর্ড বৃষ্টিপাতের ফলে চট্টগ্রাম শহরের অনেক সড়ক নাজুক হয়ে পড়েছে। নিয়মিত বৃষ্টিপাত থাকায় চাইলেও মেরামত শুরু করা যাচ্ছে না। ক্ষতিগ্রস্ত সড়কের তালিকা করা হয়েছে। ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ বেশি হওয়ায় আর্থিক সীমাবদ্ধতার কারণে দ্রুত সব সড়ক মেরামত সম্ভব হচ্ছে না। সরকারের উচ্চপর্যায়ে বরাদ্দের আবেদন করেছি। এরই মধ্যে কিছু এলাকায় মেরামত কাজ শুরু হয়েছে। বিশেষ বরাদ্দ পেলে বাকি কাজও শুরু করা সম্ভব হবে।’

চসিক সূত্রে জানা গেছে, চট্টগ্রামে জলাবদ্ধতা নিরসনে একাধিক প্রকল্প চলমান রয়েছে। ফলে নগরীর খাল-নালা-নর্দমার রিটেইনিং ওয়াল নির্মাণকাজও চলছে। বিশেষ করে মাঝিরঘাট, ইপিজেড এলাকা, ঢাকা ট্র্যাঙ্ক রোড, নিমতলা বিশ্বরোড, বিএফআইডিসি রোড ও কালুরঘাটের আরাকান সড়ক দিয়ে ভারী শিল্প-কারখানা ও বন্দরের যানবাহন চলাচল করে। কিন্তু ভাঙাচোরা সড়কের কারণে দুর্ঘটনার ঝুঁকিও বেড়েছে। বর্তমানে অধিকাংশ এলাকায় ইট-বালি দিয়ে সাময়িকভাবে খানাখন্দ ঢেকে রাখা হয়েছে। দ্রুত মেরামত না হলে বড় ধরনের দুর্ঘটনার আশঙ্কা রয়েছে বলে জানিয়েছেন চসিক কর্মকর্তারা।