বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান বলেছেন, ‘দেশ থেকে স্বৈরাচার পালালেও একটি অদৃশ্য শক্তি ধীরে ধীরে মাথাচাড়া দিয়ে উঠছে। নির্বাচনকে ঘিরে সেই অদৃশ্য শক্তি কাজ করছে। নির্বাচনের মাধ্যমে বাংলাদেশে জনগণের অধিকার প্রতিষ্ঠার সুযোগ বিনষ্ট করতে ওই অশুভ শক্তির অপতৎপরতা সম্প্রতি ধীরে ধীরে দৃশ্যমান হয়ে উঠছে।’
গতকাল কিশোরগঞ্জ শহরের পুরনো স্টেডিয়ামে জেলা বিএনপির ত্রিবার্ষিক সম্মেলনে লন্ডন থেকে ভার্চুয়ালি যুক্ত হয়ে প্রধান অতিথির বক্তৃতায় তিনি এ কথা বলেন।
তারেক রহমান শঙ্কা প্রকাশ করে বলেন, ‘পতিত পরাজিত, পলাতক স্বৈরাচারমুক্ত বাংলাদেশে অন্তর্বর্তী সরকার যখন জনগণের অধিকার প্রতিষ্ঠার পথে হাঁটছে, তখন কোনো কোনো রাজনৈতিক দল নির্বাচনের মাধ্যমে জনগণের অধিকার প্রতিষ্ঠার পরিবর্তে তাদের দলীয় স্বার্থ চরিতার্থ করার জন্য নানা শর্ত আরোপ করছে। এর মাধ্যমে নির্বাচনের পথে পরিকল্পিত উপায়ে বাধা সৃষ্টির অপচেষ্টা করছে বলে বহু মানুষ এরই ভেতরে ভাবতে শুরু করেছেন।’
যেকোনো মূল্যে বিএনপির নেতাকর্মীদের ঐক্যবদ্ধ থাকতে হবে বলে জানিয়ে তিনি বলেন, ‘সমগ্র বাংলাদেশে ধানের শীষের যত নেতাকর্মী আছে, যারা আজও গণতন্ত্রকে প্রতিষ্ঠা করতে চায়, আমাদের সামনে একটি লক্ষ্য থাকতে হবে। আমাদের যেকোনো মূল্যে ঐক্যবদ্ধ থাকতে হবে। এর কোনো বিকল্প নেই। আগামী ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত যদি আমরা ইস্পাতকঠিন ঐক্য ধরে রাখতে পারি, তবে জনগণের রায় ধানের শীষের পক্ষেই আসবে।’
বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান বলেন, ‘এখন আর বসে থাকার সময় নেই। আমাদের লক্ষ্য স্পষ্ট—জনগণের অধিকার ফিরিয়ে আনা, গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার এবং দেশের উন্নয়ন নিশ্চিত করা। এ লক্ষ্যে আর সময় নষ্ট করার সুযোগ নেই। দেশের মানুষকে তার ন্যায্য অধিকার ফিরিয়ে দিতে হলে সবাইকে সক্রিয়ভাবে মাঠে থাকতে হবে। দেশের মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠা এবং উন্নয়নের অগ্রযাত্রা নিশ্চিত করতে সবাইকে ঐক্যবদ্ধ হয়ে কাজ করতে হবে।’
কেউ যেন বিএনপির নাম ব্যবহার করে ব্যক্তিস্বার্থ হাসিল করতে না পারে, সে বিষয়ে দলের নেতাকর্মীদের সচেতন থাকতে বলেন তিনি।
তারেক রহমান বলেন, ‘বিএনপি অন্তর্বর্তী সরকারেরও আড়াই বছর আগে সংস্কারের প্রস্তাব দিয়েছিল। সে কারণে দেশের সংস্কার নিয়ে কারো সঙ্গে বিএনপির কোনো মতভিন্নতা বা আপত্তি নেই। সংস্কারের প্রয়োজন রয়েছে অবশ্যই। তবে জনগণের অধিকার চর্চা এবং প্রয়োগের পথ সৃষ্টি না করে কোনো সংস্কারকেই টেকসই করা যাবে না।’
তিনি বলেন, ‘বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকার জনগণের অভিপ্রায়ের সরকার। তবে এ সরকারের কাছে অবশ্যই একটি দক্ষ এবং জবাবদিহিমূলক রাজনৈতিক সরকারের মতন পারফরম্যান্স আশা করা কোনো যৌক্তিক কারণ আছে বলে আমি মনে করি না।’
ফ্যাসিবাদবিরোধী শক্তির ঐক্যকে দুর্বল করা যাবে না উল্লেখ করে তারেক রহমান বলেন, ‘নিজেদের মধ্যে অনৈক্য সৃষ্টি হলে পলাতক অপশক্তির পুনরুত্থানের প্রাসঙ্গিকতা তৈরি করবে। অতএব এখনো সময় আছে আমাদের সতর্ক হওয়া দরকার। পরাজিত পলাতক অপশক্তি কিন্তু সুযোগের অপেক্ষায় ওত পেতে রয়েছে।’
তারেক রহমান বলেন, ‘পলাতক স্বৈরাচারের মতো বিএনপির বিজয় ঠেকানোর অপরাজনীতির পরিবর্তে আসুন, সবাই মিলে আগে নির্বাচনের মাধ্যমে বাংলাদেশের জনগণের কাছে দায়বদ্ধ সরকার গঠন করি। এরপর রাজনৈতিক দলগুলোর আরো সব যৌক্তিক দাবি সমাধানের পথ খুঁজি। রাষ্ট্র রাজনীতিতে জনগণের অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য শর্ত শিথিল করে নির্বাচনের পথে হাঁটাই এখন সময়ের দাবি। জনগণের ভোটের অধিকার প্রয়োগ করে নির্বাচনকেন্দ্রিক গণতন্ত্র চর্চার মাধ্যমে যাতে আমরা রাষ্ট্র ও সমাজে গণতন্ত্রকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিতে পারি।’
এর আগে সম্মেলনের উদ্বোধনী বক্তব্যে দলটির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, ‘নানা নির্যাতন-নিপীড়ন করেও বিএনপিকে কেউ বিলীন করতে পারেনি। এ দল ফিনিক্স পাখির মতো। একে ভেঙে ফেলার ষড়যন্ত্র হয়েছে, কিন্তু সফল হয়নি। বরং ষড়যন্ত্রকারীরাই পালিয়ে গেছে। বিএনপি সেই দল, যারা উড়ে এসে জুড়ে বসেনি।’
তিনি বলেন, ‘বর্তমানে দেশে অনেক ষড়যন্ত্র চলছে এবং মিথ্যা অপবাদ দেয়া হচ্ছে বিএনপিকে। যাদের কাল জন্ম হয়েছে এবং যারা একাত্তর সালে ভিন্ন অবস্থানে কিংবা ভিন্ন জায়গায় ছিল, তারাও বিএনপিকে নিয়ে নানা কথা বলে। যা কিছু ভালো, তার সবকিছু বাংলাদেশে দিয়েছে এ বিএনপি। দীর্ঘ লড়াই-সংগ্রামের মধ্য দিয়ে বিএনপি এ পর্যায়ে এসেছে।’
মির্জা ফখরুল বলেন, ‘ছাত্র-জনতার আন্দোলনের মাধ্যমে যে সুযোগ এসেছে এবং নির্বাচনের মধ্য দিয়ে রাষ্ট্র পরিচালনার যে সুযোগ তৈরি হয়েছে, তা কাজে লাগাতে হবে। বিএনপি এজন্য প্রস্তুত।’
সম্মেলনে সভাপতিত্ব করেন জেলা বিএনপির সভাপতি মো. শরিফুল আলম এবং সঞ্চালনা করেন সাধারণ সম্পাদক মো. মাজহারুল ইসলাম। বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা বীর মুক্তিযোদ্ধা আব্দুস সালাম। প্রধান বক্তা হিসেবে বক্তৃতা দেন যুগ্ম মহাসচিব হাবিব উন নবী খান সোহেল।
সম্মেলনের দ্বিতীয় অধিবেশনে বিকাল ৪টা থেকে রাত ৮টা পর্যন্ত ২ হাজার ১০ জন কাউন্সিলর ভোট দিয়ে জেলা বিএনপির নতুন সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক নির্বাচন করেন।
এর আগে জাতীয় সংগীতের সুরে জাতীয় ও দলীয় পতাকা উত্তোলন এবং দলীয় সংগীত পরিবেশনের মাধ্যমে দীর্ঘ নয় বছর পর এ সম্মেলন শুরু হয়। সকাল থেকেই জেলার বিভিন্ন উপজেলা থেকে মিছিল নিয়ে নেতাকর্মীরা স্টেডিয়ামে সমবেত হন। কয়েক হাজার কর্মীর উপস্থিতিতে উৎসবমুখর পরিবেশ ছিল এ সম্মেলনে।










