চাষাবাদে সেচ ব্যবস্থা মূলত ভূগর্ভস্থ পানির ওপর অনেকটা নির্ভরশীল। কৃষি আবাদ ছাড়াও শিল্প-কারখানায় ব্যবহার হচ্ছে ভূগর্ভস্থ পানি। ফলে পানির স্তর নিম্নমুখী হওয়ায় বড় ধরনের সংকট দেখা দিয়েছে। চট্টগ্রাম অঞ্চলে সুপেয় পানির সংকট এবং উপকূলবর্তী এলাকা হওয়ায় কৃষি উৎপাদনে পানির স্বল্পতা বাড়ায় কমে আসছে কৃষি উৎপাদন। ফলে দিন দিন অনাবাদি হয়ে পড়ছে কৃষিজমি। সংকট নিরসনে চট্টগ্রাম ও কক্সবাজারে একটি প্রকল্প হাতে নিয়েছে বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশন (বিএডিসি)। প্রকল্পটির আওতায় কৃষিজমিতে ভূগর্ভস্থ পানির ব্যবহার কমিয়ে ভূ-উপরিস্থ পানি ব্যবহার করা হবে। এজন্য খাল পুনঃখনন ও ভূমির উপরি উৎস থেকে পানি সংগ্রহ করা হবে। প্রকল্প বাস্তবায়ন হলে অন্তত ৮০ হাজার হেক্টর জমি সেচের আওতায় আসবে এবং বাড়তি এক লাখ টন ফসল উৎপাদন হবে বলে জানিয়েছেন বিএডিসি কর্মকর্তারা।

প্রকল্পসংশ্লিষ্টরা বলছেন, চট্টগ্রাম ও কক্সবাজারে প্রায় সাড়ে ২৬ লাখ হেক্টর আবাদযোগ্য জমির অর্ধেকের কম জমি সেচ সুবিধার বাইরে আছে। ফলে কৃষি উৎপাদনে সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও এ অঞ্চলের বিপুল পরিমাণ জমি ব্যবহৃত হচ্ছে না। প্রকল্পটি বাস্তবায়ন হলে কৃষি আবাদ বাড়বে।

বিএডিসি সূত্রে জানা গেছে, ২০২৩ সালের ৫ সেপ্টেম্বর জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায় চট্টগ্রাম ও কক্সবাজার জেলায় ভূ-উপরিস্থ পানির মাধ্যমে সেচ উন্নয়ন প্রকল্পটি অনুমোদন পায়। প্রকল্পের মেয়াদ ধরা হয়েছে ২০২৩ সালের জুলাই থেকে ২০২৮ সালের জুন পর্যন্ত। এতে ব্যয় ধরা হয়েছে ৬০২ কোটি ২৬ লাখ টাকা। পাঁচ বছর মেয়াদি প্রকল্পে প্রায় ৮০ হাজার হেক্টর জমি সেচ সুবিধার আওতায় আনা হবে। এতে প্রতি বছর চার লাখ টনের বেশি খাদ্যশস্য উৎপাদন হবে। কৃষি যন্ত্রপাতি ও পণ্য পরিবহন ব্যবস্থারও উন্নয়ন করা হবে। আধুনিক সেচ প্রযুক্তি প্রয়োগ ও কৃষকদের প্রশিক্ষণের মাধ্যমে সেচ ব্যবস্থাপনা উন্নয়ন এবং সেচ দক্ষতা বৃদ্ধি হবে।

প্রকল্পের আওতায় চট্টগ্রাম ও কক্সবাজার জেলার ২৫টি উপজেলায় কাজ করা হবে। ৫২৫ কিলোমিটার খাল পুনঃখনন ও ৫০টি জলাধার পুনঃখনন (পাড় বাঁধাইকরণ) করা হবে। ১, ২ ও ৫ কিউসেক বৈদ্যুতিক পাম্প ২৩৫টি স্থাপন করা হবে। এছাড়া ১২০টি সোলার পাম্প, ৫০টি ডাগওয়েল, ৫০০টি আর্টেশিয়ান নলকূপ খনন ও কমিশনিং, ৩০ কিলোমিটার ফসল রক্ষা বাঁধ নির্মাণ, ৫৬০টি বড়, মাঝারি, ছোট অবকাঠামো, সাড়ে পঁাচ লাখ মিটার বারিড পাইপ স্থাপন এবং ৯৮০টি সেচ অবকাঠামো নির্মাণ করা হবে। মূলত পাহাড়ি এলাকা ও যেখানে ভূগর্ভস্থ পানির উৎস দুর্বল, সেসব অঞ্চলকে অগ্রাধিকার দেয়া হয়েছে।

প্রকল্প পরিচালক মো. নুরুল ইসলাম বণিক বার্তাকে বলেন, ‘এখন পর্যন্ত প্রকল্পের অগ্রগতি প্রায় ৪০ শতাংশ। প্রায় ২৬৭ কোটি টাকার কাজ সম্পন্ন হয়েছে। চলতি অর্থবছরের জন্য ১৬৪ কোটি টাকা বরাদ্দ দেয়া হয়েছে। সময়সীমা শেষের আগেই প্রকল্পের কাজ শেষ করার চেষ্টা চলছে। বড় পাইপ স্থাপনের মাধমে যেখানে সেচ দেয়া সম্ভব হতো না, সেসব জমি নতুন করে সেচের আওতায় এনে চাষাবাদ করা হবে। এতে উৎপাদন বাড়বে। তাছাড়া সেচের খরচও কম লাগবে। পানি সংরক্ষণ করে সেচকাজে ব্যবহার করা হবে। যেখানে বিদ্যুৎ সরবরাহ নেই সেখানে সোলার সিস্টেম স্থাপন করা হবে।’

প্রকল্পসংশ্লিষ্টরা জানান, প্রকল্পের আওতায় উপজেলা এলাকায় এরই মধ্যে খাল পুনঃখনন করার কাজ শুরু হয়েছে। মূলত চট্টগ্রাম অঞ্চলে শিল্প-কারখানা বেশি থাকা ও উপকূলবর্তী হওয়ায় ভূগর্ভস্থ পানির ওপর চাপ বেশি। গভীর নলকূপের কারণে পানির স্তর নিচে নেমে গেছে। বিশেষ করে শুষ্ক মৌসুমে পানির সংকট বেশি থাকে। এলাকাটি উপকূলবর্তী হওয়ায় মাটির তলদেশ থেকে যে পানি উঠছে তাতে লবণাক্ততা বা আয়রনের পরিমাণও বেশি। ফলে বোরো মৌসুমে পানি সংকটের কারণে সেচনির্ভর কৃষি আবাদ অনেক কমে যাচ্ছে। এ কারণে পাহাড়ি ঝরনার পানি ব্যবহার, খাল পুনঃখনন এবং নদীর পানি কৃষি আবাদে ব্যবহারের লক্ষ্যে প্রকল্পটি বাস্তবায়ন হচ্ছে।

বিএডিসির ক্ষুদ্র সেচ বিভাগের প্রধান প্রকৌশলী মুহাম্মদ বদিউল আলম সরকার বণিক বার্তাকে বলেন, ‘চট্টগ্রাম ও কক্সবাজারে ভূ-উপরিস্থ পানির মাধ্যমে সেচ প্রকল্প বাস্তবায়নে বোরো, রবি ও শুষ্ক মৌসুমে অন্তত লক্ষাধিক হেক্টর জমিতে সেচ সুবিধা পাবেন কৃষক। এমনকি এক ফসলি জমিগুলো দুই বা তিন ফসলি জমিতে পরিবর্তিত হয়ে উৎপাদন বাড়বে। পাহাড়ি অঞ্চলের কৃষির স্থায়িত্ব ও আয় বাড়বে, পানির অপচয় কমবে। খাল ও জলাধার পুনঃখনন, সোলার ও বৈদ্যুতিক পাম্প স্থাপন এবং আধুনিক সেচ অবকাঠামো নির্মাণের ফলে উৎপাদন খরচ কমবে। পাশাপাশি ফসল উৎপাদনও বাড়বে। ভূগর্ভস্থ পানির ওপর নির্ভরতা কমলে পানির স্তর রক্ষা পাবে এবং লবণাক্ততার ঝুঁকি হ্রাস পাবে। প্রকল্পটি শুধু সেচ নয়, একটি টেকসই কৃষি ব্যবস্থার ভিত্তি গড়ে তুলবে।’