জাতীয় সম্পদ ও সার্বভৌমত্ব রক্ষায় চারটি ভিন্ন দাবিতে ‘সাম্রাজ্যবাদবিরোধী দেশপ্রেমিক জনগণ’-এর ব্যানারে ঢাকা থেকে শুরু হওয়া রোডমার্চ চট্টগ্রাম বন্দরে এসে শেষ হয়। গতকাল বিকালে চট্টগ্রাম বন্দর ভবনের সামনে সমাবেশে বক্তারা বলেন, দেশের কৌশলগত সম্পদ চট্টগ্রাম বন্দর বিদেশী কোম্পানির হাতে তুলে দেয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে, যা জাতীয় স্বার্থের পরিপন্থী। এ ধরনের উদ্যোগ বন্ধে দেশের জনগণকে সচেতন ও ঐক্যবদ্ধ হতে হবে। এ সরকার সব হটকারী চুক্তি ও রাষ্ট্রবিরোধী সিদ্ধান্ত থেকে সরে না এলে আরো বড় আন্দোলন হবে।

এ সময় চট্টগ্রাম বন্দর ব্যবস্থাপনা বিদেশীদের হাতে না দেয়া, স্টারলিংক ও করিডোরের মাধ্যমে বাংলাদেশকে সাম্রাজ্যবাদী যুদ্ধ চক্রে জড়ানোর উদ্যোগ বন্ধ করা, আধিপত্যবাদী দেশগুলোর সঙ্গে বিগত সব সরকারের আমলে স্বাক্ষরিত চুক্তি প্রকাশ এবং জাতীয় স্বার্থবিরোধী চুক্তি বাতিলের দাবি জানানো হয়।

গতকাল সকালে রোডমার্চের দ্বিতীয় দিনের কর্মসূচি শুরু হয় ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের ফেনীর হাজারী রোড মোড় এলাকায়। এর পরে রোডমার্চটি ফেনীর মহিপাল হয়ে নগরী পরিভ্রমণ করে দাউদপুর ব্রিজ পার হয়ে শেষ হয়।

রোডমার্চে বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির (সিপিবি) সভাপতি শাহ আলম, সাধারণ সম্পাদক রুহিন হোসেন প্রিন্স, গণমুক্তি আন্দোলনের আহ্বায়ক নাসির উদ্দিন আহমেদ, ভাসানী পরিষদের ড. হারুনুর রশীদ, সাংস্কৃতিক জোটের নেতা মফিজুর রহমান, বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দলের সাধারণ সম্পাদক বজলুর রশীদ ফিরোজ, বাংলাদেশ জাসদের স্থায়ী কমিটির সদস্য মুশতাক হোসেন, বাসদের (মার্ক্সবাদী) প্রধান সমন্বয়ক মাসুদ রানা উপস্থিত ছিলেন।

ফেনী প্রতিনিধি জানান, ফেনীতে সকালে শুরু হওয়া রোডমার্চের শুরুতে সংক্ষিপ্ত সমাবেশে বক্তারা বলেন, অন্তর্বর্তী সরকার অভ্যুত্থানের আকাঙ্ক্ষার বিপরীত পথে হাঁটছে। দেশকে সাম্রাজ্যবাদের হাতে তুলে দেয়া এ সরকারের দায়িত্ব হতে পারে না। অবিলম্বে বিদেশী শক্তির কাছে বন্দর ইজারা বা করিডোর দেয়ার যেকোনো পরিকল্পনা বাতিল করতে হবে। অন্যথায় আগামীতে কঠোর আন্দোলনের ঘোষণা দেয়া হবে।

সিপিবির সাধারণ সম্পাদক রুহিন হোসেন প্রিন্স বলেন, ‘আমরা ঢাকা থেকে রোডমার্চ শুরু করার পর পথে পথে হাজার হাজার মানুষ রাস্তায় দাঁড়িয়ে আমাদের সঙ্গে সংহতি প্রকাশ করেছে। আমরা চাই আমাদের রোডমার্চ চট্টগ্রামে যাবার আগেই সরকার তার সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করবে। তাহলেই আমরা ২৪-এর গণ-অভ্যুত্থানের যে আকাঙ্ক্ষা, সেটির বাস্তবায়ন হচ্ছে বলে মানসিক প্রশান্তি নিয়ে ঘরে ফিরতে পারব। সেই আকাঙ্ক্ষা হলো গণতন্ত্রের, বৈষম্য থেকে মুক্তির আকাঙ্ক্ষা। ২৪-এর ছাত্র-জনতার রক্তে রঞ্জিত অভ্যুত্থানকে কোনোভাবেই প্রশ্নবিদ্ধ করা যাবে না।’

বাসদের (মার্ক্সবাদী) সমন্বয়ক মাসুদ রানা বলেন, দেশের স্বার্থ জলাঞ্জলি দিয়ে অন্তর্বর্তী সরকার সাম্রাজ্যবাদী শক্তির সঙ্গে একের পর এক চুক্তি করছে। জুলাই আন্দোলনের নেতাকর্মীদের নামে মিথ্যা মামলা দিয়ে হয়রানি করা হচ্ছে।

পরে ‘বন্দর বাঁচাও, দেশ বাঁচাও’, ‘চুক্তির নামে দেশ বিক্রি, চলবে না চলবে না’, ‘মা-মাটি-মোহনা বিদেশীদের দেব না’, ‘স্টারলিংকের সঙ্গে চুক্তি, বাতিল কর, করতে হবে’ ইত্যাদি স্লোগান নিয়ে চট্টগ্রামের উদ্দেশে রওনা দিয়ে মিরসরাইয়ে পথসভা করা হয়।

মিরসরাই (চট্টগ্রাম) প্রতিনিধি জানান, রোডমার্চ মিরসরাইয়ে এসে পৌঁছায় বেলা সাড়ে ১১টায়। বারইয়ারহাট পৌরসভার গ্রিন টাওয়ারের সামনে এক পথসভায় বক্তারা বলেন, গত ৫ আগস্ট ফ্যাসিস্ট হাসিনাকে বিতাড়িত করে দেশের মানুষ আশায় বুক বেঁধেছিল। কিন্তু সরকার এখন আমেরিকার তাঁবেদার হয়ে উঠেছে। দেশপ্রেমিক মানুষ এখন দেখছে এ সরকার দেশের জনগণের অধিকার নিয়ে ছিনিমিনি খেলছে। তারা জনমতের তোয়াক্কা না করে দেশের হৃৎপিণ্ড খ্যাত চট্টগ্রাম বন্দরের নিউমুরিং কন্টেইনার টার্মিনালসহ বন্দর ব্যবস্থাপনা বিদেশীদের হাতে তুলে দেয়ার ষড়যন্ত্রে মেতেছে। কোনো রকম জরিপ-সমীক্ষা ছাড়াই স্টারলিংকের মতো সাম্রাজ্যবাদী প্রতিষ্ঠানকে বাংলাদেশে ব্যবসা করতে ডেকে আনা হচ্ছে। রাজনৈতিক দলগুলোকে অন্ধকারে রেখে রাখাইনের সঙ্গে করিডোর দেয়ার চুক্তির পাঁয়তারা করছে। দেশের স্বার্থ জলাঞ্জলি দিয়ে মার্কিন ও ভারত সরকারের সঙ্গে অনেক গোপনীয় চুক্তির সন্দেহ করা হচ্ছে। আমরা বলতে চাই, এ দেশের একজন দেশপ্রেমিক মানুষ থাকতেও সরকারের এ জনস্বার্থবিরোধী উদ্দেশ্য হাসিল হতে দেয়া হবে না। তাই আজ দেশজুড়ে স্লোগান উঠেছে ‘মা-মাটি-মোহনা বিদেশীদের দেব না।

দুপুর সাড়ে ১২টায় সীতাকুণ্ডে গিয়ে সমাবেশ করা হয়। পরে চট্টগ্রাম নগরীর উদ্দেশে যাত্রা করে রোডমার্চের গাড়িবহর। রোডমার্চটি বিকালে নগরীর বারিক বিল্ডিং মোড়ে আসে। সেখান থেকে বন্দর ভবন অভিমুখে যাত্রা করে। বন্দর ভবনের সামনে এসে হাজির হলে বিভিন্ন বাম সংগঠনের পাশাপাশি বিভিন্ন শ্রেণী-পেশার মানুষ স্লোগান দিতে থাকে। পরে সেখানে ট্রাকের ওপরে দাঁড়িয়ে সমাবেশে বক্তব্য দেন বক্তারা।

এর আগে গত শুক্রবার সকালে জাতীয় প্রেস ক্লাব থেকে জাতীয় সম্পদ ও সার্বভৌমত্ব রক্ষার দাবিতে দুইদিনের ঢাকা-চট্টগ্রাম রোডমার্চ শুরু হয়। সেদিন পথে নারায়ণগঞ্জ ও কুমিল্লায় সমাবেশ করা হয়। রাতে ফেনীতে এসে পৌঁছায়।