চট্টগ্রামের পটিয়া উপজেলায় বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের নেতাকর্মীদের বিক্ষোভ ও সড়ক অবরোধে দুর্ভোগে পড়ে সাধারণ মানুষ। ছাত্রলীগ কর্মীকে থানায় সোপর্দ করা নিয়ে পুলিশের সঙ্গে কয়েক দফা সংঘর্ষের পর গতকাল বেলা ১১টা থেকে সন্ধ্যা ৭টা পর্যন্ত পটিয়া বাইপাস এলাকার চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়ক অবরোধ করে রাখেন বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের নেতাকর্মীরা। এতে সবচেয়ে ভোগান্তিতে পড়ে পর্যটন শহর কক্সবাজারগামী ও কক্সবাজারফেরত যানবাহনের যাত্রীরা। পরে পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের আশ্বাসে সন্ধ্যা ৭টায় অবরোধ স্থগিত করা হয়। দাবি না মানলে আজ নগর ব্লকেড ঘোষণা দেয়া হয়। তবে শিক্ষার্থীদের দাবির মুখে গতকাল রাতেই পটিয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আবু জায়েদ মো. নাজমুন নূরকে প্রত্যাহার করা হয়েছে। চট্টগ্রাম জেলা পুলিশ সুপার (এসপি) সাইফুল ইসলাম বলেন, পটিয়ার ওসিকে প্রত্যাহার করে চট্টগ্রাম রেঞ্জ ডিআইজি কার্যালয়ে সংযুক্ত করা হয়েছে।

এমনিতে চট্টগ্রাম-কক্সবাজার দুই লেনের সরু মহাসড়কটি তীব্র যানজটপূর্ণ। প্রতিনিয়ত যানজটের কারণে সড়কটি পার হতে স্বাভাবিকের চেয়ে দ্বিগুণ সময় লাগে। এর মধ্যে গতকাল বেলা সাড়ে ১১টার দিকে পটিয়া বাইপাস এলাকায় চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ করেন বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের নেতাকর্মীরা। এর আগে সকাল ১০টা ৪০ মিনিট থেকে বেলা সাড়ে ১১টা পর্যন্ত পটিয়া থানার সামনে মহাসড়ক অবরোধ করা হয়। এরপর ইন্দ্রপোল এলাকার মহাসড়ক অবরোধ করা হলে বিপুলসংখ্যক যানবাহন সড়কের উভয় পাশে আটকে যায়।

এর আগে মঙ্গলবার রাতে বৈষম্যবিরোধী শিক্ষার্থীরা পটিয়া কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে ১ জুলাই উদযাপনের অনুষ্ঠান আয়োজন করে। অনুষ্ঠানস্থল থেকে ফেরার পথে রাঙ্গামাটি জেলা ছাত্রলীগের সহসভাপতি দীপঙ্কর তালুকদারকে দেখতে পান শিক্ষার্থীরা। ওই শিক্ষার্থীদের দাবি, বৈষম্যবিরোধী শিক্ষার্থীরা ছাত্রলীগ নেতার মোবাইল অনুসন্ধান করেন। তারা দীপঙ্করকে ছাত্রলীগের অন্তত পাঁচটি হোয়াটস্যাপ গ্রুপের অ্যাডমিন হিসেবে দেখতে পান। পরে তাকে পটিয়া থানায় নিয়ে যান। তবে ওই ছাত্রলীগ নেতার নামে কোনো মামলা না থাকায় পুলিশ তাকে গ্রেফতার করতে চায়নি।

মূলত ছাত্রলীগ নেতাকে আটক না করায় শিক্ষার্থীদের মধ্যে বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে। একপর্যায়ে পুলিশ মারধর করে বলে অভিযোগ করেন শিক্ষার্থীরা। পটিয়ায় পুলিশের সঙ্গে দুই দফা সংঘর্ষ হয় বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের নেতাকর্মীদের। সংঘর্ষে বেশ কয়েকজন আহত হয়েছেন বলে দাবি করেছেন আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা। তবে পুলিশ বলছে, শিক্ষার্থীরা থানা ও পুলিশের ওপর আক্রমণ করলে আত্মরক্ষার স্বার্থে অ্যাকশন নেয়া হয়েছে।

জাতীয় নাগরিক কমিটির (এনসিপি) চট্টগ্রামের সংগঠক জোবাইরুল হাসান আরিফ বণিক বার্তাকে বলেন, ‘নিষিদ্ধ ঘোষিত ছাত্রলীগ নেতাকে আটক করে পটিয়া থানায় সোপর্দ করা হলেও পুলিশ শিক্ষার্থীদের সঙ্গে বৈষম্যমূলক আচরণ করেছে। এমনকি হামলা করে আমাদের অনেক শিক্ষার্থীকে আহত করেছে। আমরা থানার ওসিসহ চট্টগ্রামের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার ও এএসপিকে প্রত্যাহারের দাবি জানিয়েছি। চট্টগ্রাম রেঞ্জের ডিআইজি আমাদের দাবি শুনে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের আশ্বাস দেয়ায় আমরা অবস্থান কর্মসূচি স্থগিত করেছি। আগামীকাল (বৃহস্পতিবার) দুপুরের মধ্যে এ বিষয়ে কোনো ব্যবস্থা গ্রহণ করা না হলে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন, এনসিপিসহ সমমনা রাজনৈতিক দলের ছাত্র সংগঠনগুলো কঠোর কর্মসূচি শুরু করবে।’

সকাল থেকে পটিয়া এলাকায় দীর্ঘ যানজটের কারণে মহাসড়কের উভয় পাশে শত শত দূরপাল্লার যানবাহন অলস বসে থাকতে দেখা যায়। স্থানীয় বাসিন্দাদের গন্তব্য পরিবর্তন কিংবা বিক্ষোভস্থল পায়ে হেঁটে বিকল্পভাবে গন্তব্যের উদ্দেশে যেতে দেখা গেছে। কিন্তু চট্টগ্রাম-ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন গন্তব্যের উদ্দেশে কক্সবাজার থেকে আসা যাত্রীদের উপায় না থাকায় গাড়িতে অপেক্ষা করতে হয়েছে। একইভাবে কক্সবাজারগামী যানবাহনের যাত্রীরাও ইন্দ্রপোলের আগে সড়কে ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষায় থেকেছে। অবরোধের কারণে চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়কের ওই এলাকায় সব ধরনের যান চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। দেখা দেয় দীর্ঘ যানজট। এতে পর্যটন শহর কক্সবাজার থেকে চট্টগ্রাম-ঢাকাসহ সারা দেশের বিভিন্ন যানবাহন আটকে যায় সড়কে। আবার কক্সবাজারমুখী বিভিন্ন যানবাহন পটিয়ার আগে আটকে যায়।

আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের সূত্রে জানা গেছে, ‘চট্টগ্রামের সর্বস্তরের ছাত্র-জনতা’ ব্যানারে অবরোধ কর্মসূচি পালন করা হয়। এ সময় পটিয়া মডেল মসজিদসংলগ্ন মহাসড়কে আন্দোলনকারীরা টায়ার জ্বালিয়ে বিক্ষোভ করেন। আন্দোলনকারীদের পটিয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আবু জায়েদ মো. নাজমুন নূর ও উপপরিদর্শক (এসআই) আসাদূর রহমানের বিরুদ্ধে বিভিন্ন স্লোগান দিতে দেখা যায়। শিক্ষার্থীরা দুজনের অপসারণ দাবি করেন।

পরে সন্ধ্যা সাড়ে ৬টার দিকে চট্টগ্রাম রেঞ্জের ডিআইজি আহসান হাবীব পলাশ অবরোধকারী নেতাকর্মীদের সঙ্গে কথা বলেন। এ সময় নেতাকর্মীরা পটিয়া সার্কেলের সহকারী পুলিশ সুপার (এএসপি) ও থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তার অপসারণসহ বেশকিছু দাবি জানান। ডিআইজির আশ্বাসে তারা সড়ক ছেড়ে যান। সন্ধ্যা ৭টার দিকে পটিয়ার সড়ক অবরোধ গতকালের মতো সমাপ্তি ঘোষণা করে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন। এতে প্রায় ৮ ঘণ্টা পর মহাসড়কে যানবাহন চলাচল শুরু হয়। আজ দুপুরের মধ্যে ওসিকে প্রত্যাহার করা না হলে চট্টগ্রাম ‘মহানগর ব্লকেড’ ঘোষণা দেন বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের নেতাকর্মীরা। তবে গতকাল রাতেই ওসি আবু জায়েদ মো. নাজমুন নূরকে প্রত্যাহার করা হয়।

চট্টগ্রাম রেঞ্জের অতিরিক্ত উপপুলিশ মহাপরিদর্শক সঞ্জয় সরকার গণমাধ্যমকে জানিয়েছেন, আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের দাবিগুলো আমরা শুনেছি। পটিয়া থানার ওসিকে প্রত্যাহারের সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। আর এএসপি ও অতিরিক্ত পুলিশ সুপারের বিষয়টি মন্ত্রণালয়ের এখতিয়ার। এর পরও সার্বিক বিষয় নিয়ে হেডকোয়ার্টারের মাধ্যমে মন্ত্রণালয়ে জানানো হবে।