বৃহস্পতিবার রাত সাড়ে ১০টার দিকে সেতুর বোয়ালখালী অংশের ঢাকামুখী পর্যটক এক্সপ্রেসের সাথে সিএনজি, মটরসাইকেল, মিনি কাভার্ডভ্যান সহ ৬-৭টি যানবাহনের মুখোমুখি সংঘর্ষ হয়। সেতুতে ট্রেনের গতিবেগ তুলনামূলক কম থাকায় ট্রেনটি নিরাপদে রয়েছে বলে জানিয়েছে রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ।

চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ ক্যাজুয়ালিটি বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, রাত ১টা পর্যন্ত ৯ জনকে হাসপাতালের জরুরী বিভাগে নিয়ে আসা হয়েছে। এরমধ্যে মো. তুষার নামের বোয়ালখালী উপজেলার বাসিন্দা একজন সিএনজিচালিত অটোরিকশার চালক নিহত হয়েছে। আহতদের মধ্যে একজনের অবস্থা আশঙ্কাজনক বলে জানিয়েছেন ক্যাজুয়ালিটি-২ এর ডিউটি ডাক্তার আতিকুর রহমান।

রেল ও প্রত্যক্ষদর্শী সূত্রে জানা গেছে, কক্সবাজার থেকে পর্যটক এক্সপ্রেস ট্রেন সন্ধ্যা ৭টা ৪৫ মিনিটে ছেড়ে আসার পর রাত ১০টার কিছু পরে কর্ণফুলী নদীর উপর কালুরঘাট সেতুতে প্রবেশ করছিল। ওই সময় কালুরঘাট প্রান্ত (চট্টগ্রাম শহর) থেকে বেশ কয়েকটি যানবাহন সিগন্যাল অমান্য করে সেতুতে উঠে যায়। একারণে সেতুর উপর একাধিক যানবাহনের মুখোমুখি সংঘর্ষ হয়েছে। অধিকাংশ যানবাহনই ট্রেনের ইঞ্জিনের সাথে সংঘর্ষে দুমড়েমুচড়ে যায়। এ ঘটনায় অন্তত দুইজন মারা গেছেন। ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা উদ্ধার কাজ পরিচালনা করছেন।

রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের মহাব্যবস্থাপক মোহাম্মদ সুবক্তগীন বণিক বার্তাকে বলেন, 'ট্রেনের সাথে মুখোমুখি সংঘর্ষে বেশ কিছু যানবাহন দূর্ঘটনায় পড়েছে। সেতুতে ট্রেন ওঠার পর অপর প্রান্ত থেকে কোন যানবাহন চলাচলের কথা নয়। একে ট্রেন চালকের কোন দোষ থাকার কথা নয়। তারপরও এ বিষয়ে তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। রিপোর্ট পাওয়ার পর দোষীদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেয়া হবে।'

xx

রেলওয়ে সূত্রে জানা গেছে, দুর্ঘটনার কারণ অনুসন্ধানে পূর্বাঞ্চলের বিভাগীয় পরিবহন কর্মকর্তা আনিসুর রহমানকে প্রধান করে একটি চার সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। কমিটির অপর তিন সদস্য হলেন পূর্বাঞ্চলের বিভাগীয় মেডিকেল অফিসার (ডিএমও), বিভাগীয় প্রকৌশলী-১ (ডিইএন-১) ও বিভাগীয় যান্ত্রিক প্রকৌশলী (ডিএমই লোকো)। কমিটি ৬ জুনের মধ্যে তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল করবে বলে জানিয়েছেন রেলওয়ের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।

জানা গেছে, দুর্ঘটনার পর মানুষের আক্রোশ থেকে বাচতে ট্রেনের চালক (লোকোমাস্টার) ও গার্ড পালিয়ে যায়। তাছাড়া ট্রেনের ইঞ্জিনের নিচে বেশ কয়েকটি যানবাহন ঢুকে যাওয়ায় রিলিফ ইঞ্জিন পাঠানো হয়েছে। বিকল্প ইঞ্জিন দিয়েই ট্রেনটিকে প্রথমে চট্টগ্রাম স্টেশনে এনে এরপর ঢাকায় নিয়ে যাওয়া হবে।

cc

কালুরঘাট ফায়ার স্টেশনের ফায়ার ফাইটার আমিনুল ইসলাম জানান, রাত পৌনে ১১টার দিকে তারা দুর্ঘটনার সংবাদ পেয়েছেন। তাদের স্টেশন থেকে অ্যাম্বুলেন্সসহ দুটি ইউনিট ঘটনাস্থলে পৌঁছে হতাহতদের উদ্ধার শুরু করে। বেশ কয়েকটি অটোরিক্সা ট্রেনের ইঞ্জিনের সাথে আটকে যাওয়ায় উদ্ধার কাজ বিলম্বিত হয় বলে জানিয়েছেন তিনি।

রেলের প্রকৌশল বিভাগের তথ্যানুযায়ী, ১৯৩১ সালে আসাম বেঙ্গল রেলওয়ের অধীনে নির্মিত হয়েছিল ৬৩৮ মিটার দৈর্ঘ্যের স্টিল স্ট্রাকচারের সেতু। শুরুতে শুধু ট্রেন চলাচল করলেও ১৯৬২ সাল থেকে সেতু দিয়ে যানবাহন চলাচল শুরু হয়। রেলওয়ের ভূ-সম্পত্তি বিভাগ সড়কের টোল আদায় করে। জরাজীর্ণ সেতুটি দিয়ে আগে মাত্র ১০ কিলোমিটার গতিবেগে ট্রেন চলাচল করত। হালকা ওজনের লোকোমোটিভ ও কয়েকটি রেকের ট্রেন দিয়ে চট্টগ্রাম থেকে দোহাজারী পর্যন্ত দৈনিক এক জোড়া ট্রেন চলাচল করলেও দোহাজারি-কক্সবাজার রেললাইন চালু হলে দেড় বছর আগে মেয়াদোত্তীর্ন সেতুটি ৪৪ কোটি টাকা ব্যয়ে মেরামত করা হয়েছে। সংস্কারের পর এই সেতু দিয়ে গড়ে ৫০ কিলোমিটার গতিবেগে ট্রেন চলাচল করতে পারে।

বোয়ালখালী অঞ্চলেরে মানুষের চাহিদাকে বিবেচনায় নিয়ে রেল সেতিতে যানবাহন চলাচল অব্যাহত রয়েছে। ট্রেন চলাচলের সময় উভয় পাশে হালকা ও মাঝারি যানবাহনগুলো আটকে রাখা হয়। এরপর একমুখী সড়কের পালা করে যানবাহন চলাচল করে। সেতুতে টোল আদায় করে রেলের ভুসম্পত্তি বিভাগ।

সেতুটি মেরামতের সময় কর্ণফুলী নদীর সেতুর পাশে প্রায় দেড় বছর আগে ফেরি সার্ভিস চালু করে সড়ক ও জনপথ বিভাগ। সরতু মেরামতের পরও ফেরিটি চালু আছে। পুরনো সেতুর পরিবর্তে আগামী বছর রেলওয়ে একটি নতুন রেল কাম রোড সেতু নির্মাণ কাজ শুরু করবে। যদি নতুন সেকু নির্মাণ কাজ বাস্তবায়ন হতে ২০৩০ সাল পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে রেলওয়ে ও বোয়ালখালী উপজেলাবাসীকে।