চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, ফেনী, নোয়াখালী, খাগড়াছড়ি, বান্দরবান ও রাঙ্গামাটি জেলা নিয়ে গঠিত চট্টগ্রাম আঞ্চলিক শিক্ষা অধিদপ্তর। এসব জেলায় ৮৮টি সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষকের পদ রয়েছে ২ হাজার ১৬৫টি। এর মধ্যে ৬৮১টিই শূন্য। অর্থাৎ ৩১ শতাংশের বেশি পদ খালি রয়েছে। এর মধ্যে ৪৪টি বিদ্যালয় চলছে প্রধান শিক্ষক ছাড়াই। দীর্ঘদিন ধরে নিয়োগ না হওয়ায় এসব বিদ্যালয়ের শিক্ষা কার্যক্রমে দেখা দিয়েছে স্থবিরতা, যা নিয়ে অভিভাবকদের মধ্যেও হতাশা বিরাজ করছে। তারা বলছেন, ছেলে-মেয়েরা লেখাপড়ার প্রতি আগ্রহ হারিয়ে ফেলছে। সব মিলিয়ে মানসম্মত শিক্ষায় পিছিয়ে পড়ছে তারা।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ২০১৩ সাল-পরবর্তী ৩৬টি মাধ্যমিক বিদ্যালয় জাতীয়করণ করা হয়েছে। সেখানে সৃষ্ট ৪৭৮টি পদের বিপরীতে দ্বিগুণ শিক্ষক চাকরি করতেন। জাতীয়করণ হওয়ার কারণে বিদ্যালয়গুলোর পদ কমে এসেছে। এ কারণে এসব বিদ্যালয়ে পদ অনুযায়ী শিক্ষক কাছাকাছি থাকলেও বাস্তবে আরো বেশি শিক্ষক প্রয়োজন।

উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, চট্টগ্রামের চন্দনাইশের গাছবাড়িয়া নিত্যানন্দ সরকারি মডেল উচ্চ বিদ্যালয় ২০১৩ সালের পর জাতীয়করণ করা হয়। পরে সেখানে ১১টি পদ সৃষ্টি করা হয়। কিন্তু সরকারি হওয়ার আগে বিদ্যালয়টিতে প্রায় ৩০ জন শিক্ষক পাঠদান করাতেন। জাতীয়করণের ফলে বিদ্যালয়টিতে শিক্ষক পদ কমে আসায় পাঠদানে সংকটের মধ্যে পড়েছেন শিক্ষকরা। তাছাড়া সরকারি বিদ্যালয়গুলোতে বিশেষ করে পার্বত্য চট্টগ্রামে শিক্ষক সংকট থাকার প্রভাব পড়ে এসএসসি পরীক্ষার ফলাফলেও। শিক্ষক সংকটের কারণে চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ডের ঘোষিত ফলাফলে পার্বত্য চট্টগ্রামের জেলাগুলোতে পাসের হার অন্যান্য জেলা থেকে অনেক কম।

চট্টগ্রাম আঞ্চলিক মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, ২০১৩ সালের আগে চট্টগ্রাম অঞ্চলে সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয় ছিল ৫২টি। এসব বিদ্যালয়ে ১ হাজার ৬৮৩টি পদের বিপরীতে শিক্ষকের পদ খালি রয়েছে ৫৫৮টি। ২০১৩ সাল-পরবর্তী বিভিন্ন সময়ে যেসব মাধ্যমিক বিদ্যালয় জাতীয়করণ হয়েছে, সেখানে ৩৬টি বিদ্যালয়ে ৪৭৮টি পদ সৃষ্টি করা হয়েছে। সেখানে পদ খালি রয়েছে ১২৩টি। সরকারি ৮৮টি বিদ্যালয়ের মধ্যে প্রধান শিক্ষক পদ শূন্য এবং কর্মরত আছেন ৪৪টি বিদ্যালয়ে। অর্থাৎ ৫০ শতাংশ বিদ্যালয় চলছে প্রধান শিক্ষক ছাড়াই। তবে আগের ৫২টি বিদ্যালয়ের মধ্যে ৩৩টি এবং নতুন জাতীয়করণ করা ৩৬টি বিদ্যালয়ের মধ্যে ১১টিতে প্রধান শিক্ষক পদ শূন্য রয়েছে।

জেলাভিত্তিক শূন্য পদগুলো পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, পার্বত্য চট্টগ্রামের তিন জেলা খাগড়াছড়ি, বান্দরবান ও রাঙ্গামাটির সরকারি বিদ্যালয়ে শিক্ষক সংকট সবচেয়ে বেশি। এর মধ্যে বান্দরবানে নয়টি বিদ্যালয়ে ২২৩টি পদের বিপরীতে শূন্য রয়েছে ১০০টি। প্রধান শিক্ষক নেই তিনটিতে। রাঙ্গামাটিতে ১১টি বিদ্যালয়ে ২৪৭টি পদের মধ্যে শিক্ষক শূন্য রয়েছে ৯৪টিতে। প্রধান শিক্ষক নেই চারটি বিদ্যালয়ে। খাগড়াছড়িতে ১০টি বিদ্যালয়ের ২২৭টি পদের ৯২টি পদ শূন্য। প্রধান শিক্ষকের পদ শূন্য সাতটি।

এছাড়া চট্টগ্রাম জেলায় সরকারি বিদ্যালয়ের সংখ্যা রয়েছে ২৬টি। এসব বিদ্যালয়ে মঞ্জুরীকৃত পদের সংখ্যা ৬৮০। এর মধ্যে শিক্ষকের পদ শূন্য রয়েছে ১৪৮টি। প্রধান শিক্ষকের পদ খালি রয়েছে ১২টি। কক্সবাজারে নয়টি বিদ্যালয়ে ২১৬টি পদের মধ্যে খালি রয়েছে ৭০টি। প্রধান শিক্ষক নেই ছয়টি বিদ্যালয়ে। ফেনীর সাতটি বিদ্যালয়ে ১৬৪টি পদের মধ্যে ৪৫টি শূন্য। আর প্রধান শিক্ষক নেই একটি বিদ্যালয়ে। নোয়াখালীর ১৬টি বিদ্যালয়ে ৪০৮টি পদের বিপরীতে শূন্য রয়েছে ১৩২টি। প্রধান শিক্ষক নেই ১১টি বিদ্যালয়ে।

চট্টগ্রাম শিক্ষা অঞ্চলে সরকারি বিদ্যালয়ের পাশাপাশি বেসরকারি বিদ্যালয়গুলোতেও শিক্ষক সংকট রয়েছে। তবে সেখানে এনটিআরসিএর মাধ্যমে শিক্ষক নিয়োগ দ্রুত সম্পন্ন করা গেলেও সরকারি বিদ্যালয়গুলোতে শিক্ষক নিয়োগে বেশ জটিলতা রয়েছে। তাছাড়া সরকারি কোটা থাকার কারণে নারী শিক্ষক নিয়োগে নানা সংকট থাকায় বিদ্যালয়গুলোতে দ্রুত নিয়োগ করা যাচ্ছে না। তবে শিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালককে বিষয়টি অবহিত করা হয়েছে বলে জানান শিক্ষা কর্মকর্তারা।

এ প্রসঙ্গে চট্টগ্রাম জেলা শিক্ষা কর্মকর্তা (মাধ্যমিক) উত্তম খীসা বণিক বার্তাকে বলেন, ‘চট্টগ্রামের সরকারি বিদ্যালয়গুলোতে শিক্ষক সংকট রয়েছে। তবে সরকারি বিদ্যালয় বা বেসরকারি বিদ্যালয়গুলোতে গণিত ও বিজ্ঞান বিষয়ের শিক্ষক সংকট রয়েছে। চট্টগ্রামের সরকারি স্কুলে দেড় শতাধিক পদ খালি। বেসরকারি বিদ্যালয়ে প্রায় দুই হাজার শিক্ষক নিয়োগের কাজ শুরু হয়েছে। দ্রুত শিক্ষক সংকট কমে আসবে।’

সার্বিক বিষয়ে মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরের চট্টগ্রাম আঞ্চলিক উপপরিচালক মুহাম্মদ ফরিদুল আলম হোসাইনী বণিক বার্তাকে বলেন, ‘চট্টগ্রাম শিক্ষা অঞ্চলের জেলাগুলোতে সরকারি বিদ্যালয়ে শিক্ষক সংকট অনেক বেশি। প্রায় ৮৮টি সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের এক-তৃতীয়াংশ শিক্ষকের পদ খালি। নানা জটিলতার কারণে বিদ্যালয়গুলোর প্রধান শিক্ষকের পদও খালি পড়ে রয়েছে। বিশেষ করে পার্বত্য চট্টগ্রামের সরকারি বিদ্যালয়ে শিক্ষক না থাকায় পাঠদানে সমস্যা হচ্ছে। শূন্য পদের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ে প্রতিবেদন জমা দিয়েছি। বেসরকারি বিদ্যালয়গুলোতে নিবন্ধনের মাধ্যমে নিয়োগ দেয়া হলেও সরকারি বিদ্যালয়ে পিএসসির মাধ্যমে নিয়োগ দেয়া হচ্ছে।’

তিনি আরো বলেন, ‘সরকারি বিদ্যালয়গুলোতে পদ খালি থাকার অন্যতম প্রধান কারণ নারী শিক্ষকদের ৪০ শতাংশ কোটা ব্যবস্থা। অন্যদিকে বেসরকারি বিদ্যালয়গুলোতে এনটিআরসিএ শুধু চট্টগ্রাম আঞ্চলিক মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে প্রায় সাড়ে ৪ হাজার শিক্ষক নিয়োগ নিয়ে কাজ শুরু করেছে। যার মধ্যে শুধু চট্টগ্রাম জেলায় নিয়োগ দেয়া হবে ২ হাজার ৩৩৩ জনকে।’