চট্টগ্রাম নগরীর বিভিন্ন সড়কের পাশে খোলা নালা ও খাল এখন পরিণত হয়েছে মরণফাঁদে। গত চার বছরে এসব নালা ও খালে পড়ে অন্তত ১২ জনের মর্মান্তিক মৃত্যু হয়েছে। জলাবদ্ধতা নিরসন ও নালা সংস্কারের নামে হাজার হাজার কোটি টাকার প্রকল্প বাস্তবায়ন হলেও আলাদা বাজেট না থাকায় এসব নালার পাশে গড়ে ওঠেনি কার্যকর কোনো নিরাপত্তা বেষ্টনী। বিভিন্ন দুর্ঘটনা পরবর্তী সময়ে কর্তৃপক্ষ প্রতিশ্রুতি দিলেও বাস্তবে তার খুব একটা প্রতিফলন দেখা যায়নি। ফলে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে প্রতিদিন চলাফেরা করতে হচ্ছে নগরবাসীকে। জনদুর্ভোগের পাশাপাশি প্রশ্ন উঠেছে প্রকল্প বাস্তবায়নের স্বচ্ছতা ও কার্যকারিতা নিয়েও।
তবে নগর পরিকল্পনাবিদরা বলছেন, নগরীর উন্মুক্ত খাল ও নালার পাশে নিরাপত্তা বেষ্টনী নির্মাণ এবং সড়কের পাশে অবস্থিত নালা বা ম্যানহোলে শক্তপোক্ত স্লাব বসানোর জন্য আলাদা একটি প্রকল্প গ্রহণ না করলে জোড়াতালি দিয়ে নগরবাসীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সম্ভব হবে না। একটি মৃত্যুও যদি কারো গাফিলতিতে ঘটে তাহলে তার দায়ভার সংশ্লিষ্ট দপ্তরকেই নিতে হবে।
চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন (চসিক) সূত্রে জানা গেছে, চট্টগ্রাম নগরীতে সড়কের পাশে উন্মুক্ত নালা-নর্দমা, ড্রেন ও খালের মোট ঝুঁকির্পূণ স্থান আছে সাড়ে পাঁচ হাজার জায়গায়। এসব জায়গার মোট আয়তন প্রায় ১৯ কিলোমিটার। নগরীর ১ হাজার ৬০০ কিলোমিটার নালা-নর্দমা আর খালের মধ্যে চসিকের নিয়ন্ত্রণে আছে ১ হাজার ৩০০ কিলোমিটার এবং বাকি অংশ সিডিএর। চট্টগ্রাম নগরীতে বর্তমানে ৫৭টি খাল ও ৯৫০ কিলোমিটার নালা রয়েছে, যার বেশির ভাগেই নেই সুরক্ষিত দেয়াল।
চসিকের তথ্যমতে, গত চার বছরে চট্টগ্রাম নগরীতে নালায় বা খালে পড়ে মারা গেছেন অন্তত ১২ জন। এর মধ্যে ২০২১ সালে পাঁচজন, ২০২৩ সালে তিনজন, ২০২৪ সালে তিনজন এবং সর্বশেষ গত শুক্রবার রাতে চকবাজারের কাপাসগোলায় নালায় পড়ে সাত মাস বয়সী শিশু সেহরিশের মৃত্যু হয়।
চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন প্রধান পরিচ্ছন্ন কর্মকর্তা কমান্ডার আই ইউ এ চৌধুরী বণিক বার্তাকে বলেন, ‘জলাবদ্ধতা নিরসনের কাজ খুব ভালোভাবেই চলছে। নগরীর প্রধান জলাবদ্ধতা নিরসনের যে প্রকল্পগুলোর কাজ চলছে তাতে ড্রেনে বা নালায় পানির স্রোত বেশি থাকে। যাতে পানির ফ্লো বেশি থাকে ও দ্রুত পানি নিষ্কাশন হয়ে যায়। এ নিষ্কাশনের ফলে দ্রুত জলাবদ্ধতার সমাধান হবে। এখন শিশুটির মৃত্যুর ঘটনা খুবই মর্মান্তিক। আমরা খাল বা ড্রেনগুলোর চারপাশে নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করার কাজ করছি।’
নগরীর জলাবদ্ধতা সমস্যা সমাধানে নগরীজুড়ে খাল উদ্ধার, সংস্কার, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন করা, অবৈধ দখল উচ্ছেদসহ জলাবদ্ধতার পানি দ্রুত নিষ্কাশনের জন্য চারটি প্রকল্পের মাধ্যমে প্রায় ১৪ হাজার ৩৫০ কোটি টাকার কাজ চলমান আছে। এ চারটি প্রকল্পের মধ্যে সিডিএ দুটি, চসিক একটি ও পানি উন্নয়ন বোর্ড একটি প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে। এখন পর্যন্ত প্রকল্পগুলোয় প্রায় ৮ হাজার কোটি টাকার বেশি খরচ হয়েছে। এত টাকা খরচের পর কার্যত যে সুফল পাওয়ার কথা নগরবাসী সেটি এখনো পায়নি।
এদিকে গত শুক্রবার রাতে চকবাজারের কাপাসগোলা এলাকার বির্জা খালে রিকশা থেকে শিশুসহ তিনজন খালে পড়ে গেলে দুজনকে উদ্ধার করা গেলেও সাত মাস বয়সী শিশুকন্যা নিখোঁজ থাকে। রাতভর ফায়ার সার্ভিস, ডুবুরীসহ অন্যান্য মাধ্যমে শিশুটিকে খোঁজার চেষ্টা করা হলেও গতকাল সকালে চাক্তাই খাল থেকে শিশুটির মরদেহ উদ্ধার করে স্থানীয়রা। গতকাল দুপুরে কাপাসগোলা এলাকার সেই বির্জা খাল এলাকায় সরজমিন গিয়ে দেখা যায়, উন্মুক্ত নালার পাশে বাঁশ দিয়ে নিরাপত্তা বেষ্টনী দেয়া হয়েছে।
২০২১ সালের ৩০ জুন চট্টগ্রামের মেয়র গলির চশমাহীল এলাকায় খালে পড়ে অটোরিকশাচালক ও এক যাত্রীর মৃত্যু হয়। সে বছরের ২৫ আগস্ট মুরাদপুরে পা পিছলে নালায় পড়ে নিখোঁজ হন সালেহ উদ্দিন আহমদ। একই বছরের ২৭ সেপ্টেম্বর আগ্রাবাদের নালায় পড়ে প্রাণ হারান বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থী সেহেরীন মাহমুদ সাদিয়া। একই বছরের ৬ ডিসেম্বর নালায় নিখোঁজ হয় কামাল নামের ১২ বছরের এক শিশু।
২০২৩ সালের ৭ আগস্ট ফতেহপুর ইসলামি হাটসংলগ্ন বাদামতলা এলাকার নালায় পড়ে মৃত্যু হয় কলেজছাত্রী নিপা পালিতের (২০)। ২৭ আগস্ট আগ্রাবাদের রঙ্গিপাড়ায় ইয়াছিন আরাফাত নামের এক শিশু নিখোঁজ হয়। পরদিন শিশুটির মরদেহ উদ্ধার হয়। একই বছরের ৩ সেপ্টেম্বর নগরীর ডবলমুরিং থানাধীন সিডিএ আবাসিক এলাকার খালে নেমে নিখোঁজ হয় আবদুল্লাহ (৫)। এদিকে ২০২৪ সালের ২৭ মে চট্টগ্রাম নগরের আছদগঞ্জে খালে পড়ে এক যুবকের মৃত্যু হয়।
নগর পরিকল্পনাবিদ দেলোয়ার হোসেন মজুমদার বণিক বার্তাকে বলেন, ‘চট্টগ্রামে নালা বা খালে পড়ে মানুষ মৃত্যুর ঘটনা খুবই মর্মান্তিক। নগরীতে যে উন্মুক্ত নালা বা খালগুলো আছে তাতে বেষ্টনী দিতে হবে। তাছাড়া সেনাবাহিনী জলাবদ্ধতা নিরসনে যে খালগুলো সংস্কারের কাজ করছে সেখানে রিটেইনিং ওয়ালের ওপর নিরাপত্তা বেষ্টনী দিতে হবে। চসিককে এ বেষ্টনী নির্মাণ ও উন্মুক্ত নালা বা খালগুলোয় নিরাপত্তা জোরদার করার জন্য আলাদা প্রকল্প গ্রহণ করে কাজ করতে হবে।’
চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের মেয়র ডা. শাহাদত হোসেন বণিক বার্তাকে বলেন, ‘শিশু মৃত্যুর ঘটনাটি খুবই দুঃখজনক। নালা বা খালের নিরাপত্তা বেষ্টনী তৈরি করতে কাজ করব। সেনাবাহিনী জলাবদ্ধতা নিরসনে যে কাজগুলো করছে সেখানে রিটেইনিং ওয়াল ও নিরাপত্তা বেষ্টনী দ্রুত নির্মাণে কাজ করছে।’










