বেনাপোল স্থলবন্দর দিয়ে পণ্য আমদানির পরিমাণ কমছে। ২০২১-২২ অর্থবছরের প্রথম ছয় মাসে আমদানি হয়েছিল প্রায় ১৭ লাখ ১১ হাজার টন পণ্য। আর চলতি অর্থবছরের একই সময়ে তা কমে দাঁড়িয়েছে প্রথম ছয় মাসে (জুলাই-ডিসেম্বর) ১১ লাখ ৫৩ হাজার টন। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে পণ্য আমদানির পরিমাণ কমেছে ৫ লাখ ৫৮ হাজার টন। অন্যদিকে ২০২২-২৩ অর্থবছরের প্রথম ছয় মাসে রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ২ হাজার ৯৩৯ কোটি টাকা। সেখানে আদায় হয়েছে ২ হাজার ৬৩১ কোটি ৭২ লাখ টাকা। সে হিসাবে লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে ৩০৮ কোটি ৭২ লাখ টাকা কম রাজস্ব আদায় হয়েছে। বেনাপোল কাস্টমস সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে।
বেনাপোল কাস্টমস সূত্র বলছে, গত অর্থবছরে এর আগের অর্থবছরের চেয়ে বেনাপোল কাস্টমস হাউজে ৫৫৮ কোটি ৮ লাখ টাকা রাজস্ব কম আদায় হয়েছিল। সে সময় ৫ হাজার ১৫৮ কোটি টাকা লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে রাজস্ব আদায় হয়েছিল ৪ হাজার ৫৯৯ কোটি ৯২ লাখ টাকা। এর আগে ২০২০-২১ অর্থবছরে রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৬ হাজার ২৪৪ কোটি ৫৭ লাখ টাকা, সেখানে আদায় হয়েছিল ৪ হাজার ১৪৫ কোটি ১৪ লাখ টাকা। ওই বছর ঘাটতি ছিল ২ হাজার ৯৯ কোটি ৪৩ লাখ টাকা।
ব্যবসায়ীরা বলছেন, বর্তমানে ডলার সংকটের কারণে খাদ্যপণ্য ছাড়া অন্য পণ্য আমদানিতে এলসি খুলছে না ব্যাংকগুলো। যার কারণে তারা আমদানিও করতে পারছেন না। বেনাপোল সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট অ্যাসোসিয়েশনের যুগ্ম সম্পাদক নাসির উদ্দিন বলেন, ‘যোগাযোগ
ব্যবস্থা সহজ হওয়ায় দুই দেশের ব্যবসায়ীদের বেনাপোল দিয়ে বাণিজ্যে আগ্রহ বেশি। তবে বর্তমানে ডলার সংকটের কারণে সরকার এলসিতে শতভাগ মার্জিন শর্ত দিয়েছে। আবার ব্যাংকগুলো ডলার সংকট দেখিয়ে এলসি খুলছে না। যে কারণে চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে আমদানি কমে গেছে। আর আমদানি কমলে রাজস্বও কম আসবে, এটাই স্বাভাবিক।’
যশোরের আমদানিকারক রেজেয়ান আহমদ জানান, তার ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান মোটর পার্টস আমদানি করে তা সারা দেশে বিক্রি করে। কিন্তু বর্তমানে যশোরের কোনো ব্যাংক এলসি খুলছে না। যে কারণে মোটর পার্টস পণ্য আমদানিও করা যাচ্ছে না। পণ্য আনতে না পারার কারণে ব্যবসায়িকভাবে লোকসান গুনতে হচ্ছে। আরেক আমদানিকারক জাহিদ হোসেন বলেন, ‘কোনো
ব্যাংক এলসি খুলছে না। এতে চরম বিপাকে পড়তে হচ্ছে। পণ্য আনতে না পারার কারণে বিক্রি কমে গেছে। ব্যবসায়িকভাবে আমরা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছি।’
ভারত-বাংলাদেশ ল্যান্ডপোর্ট ইমপোর্ট এক্সপোর্ট কমিটির পরিচালক মতিয়ার রহমানও রাজস্ব আয় কমে যাওয়ার কারণ হিসেবে এলসি খুলতে না পারার কথাই জানালেন। তিনি বলেন, ‘ব্যবসায়ীরা
এলসি করতে না পারলে পণ্য আমদানি করতে পারবেন না, এটাই স্বাভাবিক। আর এর রেশ হিসেবে সরকারের রাজস্ব আয়ও কমবে।’
তবে এলসি খোলার সমস্যা ছাড়াও বন্দরসংক্রান্ত নানা অভিযোগও উঠে এসেছে ব্যবসায়ীদের কথায়। বেনাপোল বন্দর ব্যবহার করে ব্যবসা করেন এমন একাধিক আমদানিকারক বণিক বার্তাকে জানান, এখানে কাস্টমস কর্মকর্তাদের অনেককেই বাধ্যতামূলকভাবে টাকা দিতে হয়। তা না হলে বিভিন্ন অজুহাতে আমদানিকারকদের হয়রানির শিকার হতে হয়। আবার শুক্র ও শনিবার কাস্টমসের বেশির ভাগ দায়িত্বশীল কর্মকর্তাকে পাওয়া যায় না। তাদের অনুপস্থিতির কারণেও ব্যবসায়ীদের ঘুরতে হয়।
তবে হয়রানির অভিযোগ অস্বীকার করেছেন বেনাপোল কাস্টমস হাউজের যুগ্ম কমিশনার সাফায়েত হোসেন। তিনি বলেন, ‘ডলার
সংকটে ব্যবসায়ীরা ব্যাংক থেকে এলসি খুলতে পারছেন না। যে কারণে গত ছয় মাসে পণ্য আমদানি কমে গেছে। আর আমদানি কমলে আমাদের রাজস্ব আয়ও কমে যায়। কিন্তু এখানে ব্যবসায়ীদের কোনো হয়রানি করা হয় না।’
যশোর চেম্বার অব কমার্সের সাবেক সহসভাপতি সাজ্জাদুর রহমান সুজা বলেন, ‘সরকার
এলসি করতে শতভাগ মার্জিন দেয়ার নিয়ম করেছে। কয়েক মাস ধরে ব্যাংকগুলো এলসি খুলছে না। এতে আমদানির সঙ্গে জড়িত হাজার হাজার ব্যবসায়ী অর্থনৈতিকভাবে দুরাবস্থায় পড়েছেন। একে তো ব্যবসার পরিস্থিতি ভালো নেই, তার ওপর পণ্য আমদানি করতে না পারলে আমদানির সঙ্গে জড়িতরা আর্থিকভাবে পঙ্গু হয়ে যাবে।’
ইউনাইটেড কমার্শিয়াল ব্যাংক খুলনা-বরিশাল জোন প্রধান ফকির আক্তারুল আলম জানান, উচ্চ মার্জিনের কারণে সব ব্যাংকে এলসি কমেছে। ডলার সংকট কেটে গেলে আমদানি সহজ হয়ে আসবে। একই কথা জানিয়েছেন ইস্টার্ন ব্যাংক যশোর শাখার ব্যবস্থাপক আবদুল হক। তিনি বলেন, ডলার সংকটের কারণেই বেশির ভাগ ব্যাংক এলসি খুলতে পারছে না।










