প্রাক-শিল্প যুগের চেয়ে বৈশ্বিক তাপমাত্রা যেন ২ ডিগ্রি সেলসিয়াস অতিক্রম না করে, সে চেষ্টায় রয়েছে বিশ্ব। এর সমাধান হিসেবে বৈশ্বিক ফোরামগুলো নবায়নযোগ্য জ্বালানি ব্যবহার বৃদ্ধির পরামর্শ দিয়ে আসছে। ২০৩০ সালের মধ্যে বাস্তবায়ন করা যাবে, এমন একটি লক্ষ্যমাত্রাও নির্ধারণ হয়েছিল গত বছরের জাতিসংঘ জলবায়ু সংলাপে। তবে ক্লিন এনার্জি পরিকল্পনাই যথেষ্ট নয় বলে সতর্ক করে দিয়েছে ইন্টারন্যাশনাল এনার্জি এজেন্সি (আইইএ)। খবর ফাইন্যান্সিয়াল টাইমস।
সংস্থাটির মতে, লক্ষ্য অর্জনে যে ধরনের পদক্ষেপ প্রয়োজন তাতে ঘাটতি রয়েছে। এ ঘাটতি চলমান থাকলে ২০৩০ সাল নাগাদ লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে এক-তৃতীয়াংশ কম গ্রিন এনার্জি উৎপাদন হবে।
জলবায়ু অর্থায়ন চুক্তি ও গ্রিন হাউজ গ্যাস নিঃসরণে জাতীয় প্রতিশ্রুতি বিষয়ে জার্মানির বন শহরে চলমান রয়েছে একটি সম্মেলন। এতে উপস্থিত রয়েছেন ২০০টির মতো দেশের প্রতিনিধি। ১০ দিনের এ সম্মেলনকে নভেম্বরে আজারবাইজানের রাজধানী বাকুতে অনুষ্ঠিত কপ২৯-এর প্রস্তুতি হিসেবে দেখা হচ্ছে। ঠিক সে সময়ে সতর্কবার্তা দিল আইইএ।
গত বছর দুবাইয়ে অনুষ্ঠিত হয়েছিল কপ২৮। সেখানে কিছু বিষয়ে একমত হয়েছিল দেশগুলো। এর মধ্যে ছিল ২০৩০ সালের মধ্যে বৈশ্বিক নবায়নযোগ্য জ্বালানি সক্ষমতা তিন গুণ বাড়িয়ে ১১ হাজার গিগাওয়াটে উন্নীত করা। এ লক্ষ্য কীভাবে বাস্তবায়ন করা যায়, চলমান আলোচনায় সে দিকটি গুরুত্ব পাচ্ছে।
গতকাল আইইএ প্রকাশিত ডাটা থেকে দেখা যাচ্ছে, বিদ্যমান নীতি ও সক্ষমতা অনুসারে চলতি দশকের শেষ নাগাদ প্রতিশ্রুতিবদ্ধ দেশগুলো আট হাজার গিগাওয়াট পর্যন্ত নবায়নযোগ্য জ্বালানি উৎপাদন করতে পারবে। এর মধ্যে ৪০ শতাংশ অর্থাৎ ৩ হাজার ১৮০ গিগাওয়াট শক্তি উৎপাদনে ভূমিকা রাখবে চীনের সৌর, বায়ু ও জলবিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলো।
এ বিষয়ে আইইএর নির্বাহী পরিচালক ফাতিহ বিরল বলেন, ‘নবায়নযোগ্য জ্বালানির ক্ষেত্রে বৈশ্বিক লক্ষ্যমাত্রা উচ্চাভিলাষী হলেও অর্জনযোগ্য। সরকারগুলো যদি প্রতিশ্রুতিকে দ্রুত কর্মপরিকল্পনায় রূপ দেয় তাহলেই এটি সম্ভব।’
বৈশ্বিক উষ্ণায়ন সীমিত করতে ২০১৫ সালে প্যারিস চুক্তির পর দেশগুলোর নবায়নযোগ্য জ্বালানির সক্ষমতা তিন গুণ বেড়েছে বলে জানিয়েছে আইইএ। বর্তমানে এ ধরনের জ্বালানি ব্যবস্থাপনা সাশ্রয়ীও বটে। সৌর ও বায়ুশক্তি খাতে খরচ কমেছে ৪০ শতাংশ। পরিকল্পনায় অংশ নেয়া প্রায় অর্ধেক দেশ ২০৩০ সালের মধ্যে নবায়নযোগ্য জ্বালানি কাঠামো দ্বিগুণ করার প্রতিশ্রুতিও দিয়েছে।
তবে প্রতিবেদনে উপস্থাপিত অগ্রগতি পুরো প্রক্রিয়ার একটি অংশ মাত্র। বিপরীতে নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতে অনুমোদনে দেরি, অপর্যাপ্ত বিনিয়োগ ও গ্রিডে বিদ্যুৎ সরবরাহে অবকাঠামো বেশির ভাগ দেশের সমস্যা হিসেবে রয়ে গেছে। ইইউ, যুক্তরাষ্ট্র ও ভারতসহ বেশির ভাগ অঞ্চলে ক্লিন এনার্জির গতি যথেষ্ট নয়। এক্ষেত্রে অবকাঠামো স্থাপনের গতি আরো বাড়ানো প্রয়োজন বলে মন্তব্য করেছে আইইএ।
এ বিষয়ে জলবায়ুকেন্দ্রিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান ইথ্রিজির জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা আলডেন মেয়ের বলেন, ‘নবায়নযোগ্য জ্বালানির লক্ষ্য অর্জনে অর্থায়ন, গ্রিড স্থাপন, গুরুত্বপূর্ণ খনিজ প্রাপ্তি ও কর্মশক্তি উন্নয়নসহ অনেক বাধা রয়েছে। আমাদের এসব প্রতিবন্ধকতা অতিক্রম করতে হবে।’
তিনি আরো জানান, ‘এ উচ্চাভিলাষী লক্ষ্যে অর্জনে রাজনৈতিক ঐকমত্যে পৌঁছনো ইতিবাচক পদক্ষেপ। কিন্তু বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া অনেক কঠিন ও জটিল প্রকৃতি। এ কারণে আলোচনা ও সিদ্ধান্ত গ্রহণে আরো সতর্কতার প্রয়োজন।
২০২৫ সালের প্রথম দিকে সংশ্লিষ্ট দেশগুলো কার্বন নিঃসরণ কমানোর ক্ষেত্রে জাতিসংঘে পরিমার্জিত জাতীয় পরিকল্পনা উপস্থাপন করবে। এ বিষয়ে ইন্টারন্যাশনাল এনার্জি এজেন্সির পরামর্শ হলো সেখানে নবায়নযোগ্য জ্বালানি সক্ষমতা বৃদ্ধি বিষয়ে যেন সুনির্দিষ্ট ও বিস্তারিত তথ্য যোগ করা হয়। তা সম্ভব হলে ২০৩০ সালে লক্ষ্যমাত্রা অর্জন সম্পর্কে সুস্পষ্ট ধারণা পাওয়া যাবে।
তবে পুরো প্রক্রিয়া এখনো মন্তব্য করেনি জাতিসংঘ। বনে চলমান সম্মেলন শেষে এ বিষয়ে মন্তব্য আসতে পারে। সম্মেলনের প্রথম দিনে জাতিসংঘের জলবায়ুবিষয়ক প্রধান সিমন স্টিয়েল সতর্কবার্তা দিয়ে জানান, পৃথিবী শিল্প যুগ থেকে ২ দশমিক ৭ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা বৃদ্ধির বিপজ্জনক দিকে এগিয়ে যাচ্ছে।
আলোচনা শুরুতে লক্ষ্যমাত্রা অর্জন নিয়ে নেতিবাচক মনোভাব দেখা গেছে। আয়োজক জার্মান সরকারের জলবায়ুবিষয়ক বিশেষজ্ঞদের কাউন্সিল লক্ষ্যমাত্রা অর্জন নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করেছে। তারা বলছেন, ১৯৯০ সালের তুলনায় ২০৩০ সালের মধ্যে কার্বন নিঃসরণ ৬৫ শতাংশ কমানোর লক্ষ্য পূরণ হবে কিনা তা স্পষ্ট নয়। যদিও শিল্পোৎপাদনে মন্দা বিরাজ করায় দেশটি গত বছর কার্বন নিঃসরণে অপেক্ষাকৃত কম অবদান রেখেছে।










