সমুদ্র বাণিজ্যে সাধারণত গ্রীষ্মের শেষ থেকে শরৎকালকে পিক সিজন ধরা হয়। এ সময় দুটি উৎসবকে কেন্দ্র করে পশ্চিমা দেশগুলোয় পণ্য সরবরাহ বাড়ে। এ দুটি উৎসব হলো নভেম্বরের ব্ল্যাক ফ্রাইডে ও পরবর্তী মাসের বড়দিন। কিন্তু লোহিত সাগরের সংঘাতের অনিশ্চয়তা ঘিরে এবারের আন্তর্জাতিক নৌ-বাণিজ্যে পিক সিজন শুরু হয়েছে বেশ আগে। এ কারণে সমুদ্র পথে পণ্য পরিবহনে খরচও বেড়েছে তুলনামূলক বেশি। খবর ফাইন্যান্সিয়াল টাইমস।

দূরপ্রাচ্য ও উত্তর ইউরোপের মধ্যে পণ্যবাহী ৪০ ফুট কনটেইনার বাবদ গড় খরচ গত সপ্তাহে ৪ হাজার ৩৪৩ ডলারে পৌঁছেছে, যা ২০২৩ সালের একই সময়ের চেয়ে তিন গুণ বেশি বলে জানিয়েছে পণ্যবাহী জাহাজের তথ্য বিশ্লেষক প্রতিষ্ঠান জেনেটা।

গত বছর লোহিত সাগরে হুথি হামলা শুরু হওয়ার পর দ্রুত বাড়তে থাকে কনটেইনার শিপিংয়ের ভাড়া। এ ব্যয় সর্বোচ্চ পর্যায়ে দাঁড়ায় নভেম্বরে। তারপর থেকে তা এ পর্যন্ত কিছুটা কমলেও এখনো সমুদ্রপথে পণ্য পরিবহন আগের চেয়ে অনেক বেশি ব্যয়বহুল পর্যায়ে রয়েছে।

গত বছরের অক্টোবরে গাজার বিরুদ্ধে ইসরায়েলের সর্বাত্মক হামলা শুরুর পর ফিলিস্তিনিদের পক্ষ নিয়ে লোহিত সাগরে জাহাজে আক্রমণ করে ইয়েমেনভিত্তিক হুথিরা। তাদের দাবি ছিল, হামলার শিকার জাহাজগুলো কোনো না কোনোভাবে ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পৃক্ত। তবে এতে সব ধরনের জাহাজ চলাচল অনিশ্চিত হয়ে পড়ে। এ পথ ধরে থেকে প্রধান শিপিং কোম্পানিগুলো সুয়েজ খালকেন্দ্রিক লোহিত সাগরের গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক রুটটি এড়িয়ে চলা শুরু করে। 

সম্প্রতি আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) জানিয়েছে, ২০২৩ সালের একই সময়ের তুলনায় চলতি বছরের এপ্রিলে সুয়েজ খাল হয়ে পণ্য পরিবহন কমেছে দুই-তৃতীয়াংশ। একই সময়ে আফ্রিকার উত্তমাশা অন্তরীপ হয়ে শিপিং প্রায় দ্বিগুণ বেড়েছে। সুয়েজ খাল দিয়ে চলাচল কমে যাওয়ায় ব্যাহত হচ্ছে মধ্যপ্রাচ্য, ইউরোপ, এশিয়া ও আফ্রিকার অর্থনীতি।

এদিকে আট মাস ধরে চলা গাজা সংকট কাটিয়ে ওঠার কোনো লক্ষণ নেই। এ কারণে লোহিত সাগরের সংঘাত পরিস্থিতি নিয়েও আশঙ্কা কাটেনি। এমন পরিপ্রেক্ষিতে ব্যবসার মৌসুম চাঙ্গা রাখতে এবার পিক সিজন এগিয়ে দিয়েছে শিপিং কোম্পানিগুলো। 

লজিস্টিকস কোম্পানি কুয়েন প্লাস নাগেলের সমুদ্র বাণিজ্যবিষয়ক প্রধান মাইকেল অ্যাল্ডওয়েল বলেন, ‘‌এবার পিক সিজন এগিয়ে আনা হয়েছে।’

বিশ্লেষকরা বলছেন, শিপিং খরচ বাড়ার একাধিক কারণ রয়েছে। তবে সবচেয়ে বড় কারণ লোহিত সাগরে হুথিদের হামলা। এ কারণে এশিয়া ও ইউরোপের মধ্যে পণ্য পরিবহনে জাহাজ মালিকরা আফ্রিকার উত্তমাশা অন্তরীপের পার্শ্ববর্তী সমুদ্রপথ বেছে নিতে বাধ্য হয়েছেন। গাজা যুদ্ধের কারণে শরতেও লোহিত সাগরে হামলা বাড়তে পারে। এ আশঙ্কা থেকেই পিক সিজন এগিয়ে আনা হয়েছে, যাতে যথাসময়ে বড়দিনের পণ্যগুলো ক্রেতাদের হাতে পৌঁছে দেয়া যায়।

মাইকেল অ্যাল্ডওয়েল জানান, ‘‌কুয়েন প্লাস নাগেলের কিছু ক্রেতা উৎসবের মৌসুম সামনে রেখে এপ্রিলে প্রি-বুক শুরু করেন। একই সময়ে অন্য বিক্রেতারা গ্রীষ্মকালীন আসবাব ও বারবিকিউ সরঞ্জাম মজুদ শুরু করে দেন। এছাড়া পূর্বাভাসের তুলনায় এবার পণ্যের চাহিদা বেড়েছে। গত বছর মজুদ কমাতে বাধ্য হলেও এবার সরবরাহ বাড়ানোর দিকে মনোযোগ দিচ্ছেন বিক্রেতারা। এ কারণে শিপিংয়ে অতিরিক্ত খরচ করতেও প্রস্তুত তারা।’

জেনেটার প্রধান বিশ্লেষক পিটার স্যান্ড বলেন, ‘‌কভিড-১৯ মহামারী থেকে আমদানিকারকরা কিছু শিক্ষা নিয়েছেন। এখন অনেকেই মনে করছেন, দ্রুত মজুদ সরবরাহ ব্যবস্থায় শক্ত প্রতিরোধ তৈরি করে। বড়দিনের পণ্য সরবরাহের ক্ষেত্রেও ব্যবসায়ীদের অনেকেই সে পদক্ষেপ নিয়েছেন। অন্যথায় প্রচলিত পিক সিজনে আমদানি করতে গেলো সংকটে পড়তে পারেন।’

তিনি বলেন, ‘‌হুথি হামলার কারণে সরবরাহ বাধাগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কায় ব্যবসায়ীরা এ পদক্ষেপ নিচ্ছেন। কারণ কেউ জানেন না কখন এ অনিশ্চয়তা দূর হবে।’

তবে লোহিত সাগরকেন্দ্রিক সাম্প্রতিক অনিশ্চয়তা দূর হলেও বৈশ্বিক সরবরাহ ব্যবস্থা একই রকম থাকবে না বলে ধারণা করছেন বিশ্লেষকদের অনেকে। তারা মনে করেন, ভবিষ্যতে সমুদ্রকেন্দ্রিক সরবরাহ ব্যবস্থা নতুন রূপ নেবে। কারণ হিসেবে ধারাবাহিক ভূরাজনৈতিক অস্থিরতা সামনে আনছেন যুক্তরাজ্যভিত্তিক ইনস্টিটিউট অব এক্সপোর্ট অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল ট্রেনের মহাপরিচালক মার্কো ফরগিয়ন। একই কারণে পণ্য মজুদ ব্যবস্থাপনায় পরিবর্তন আসবে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।