সংঘবদ্ধ পরিবেশ ধ্বংসের মাধ্যমে কিছু শেল কোম্পানি প্রতি বছর শত শত বিলিয়ন ডলার আয় করছে। কিন্তু প্রচলিত আর্থিক ব্যবস্থাপনায় তাদের লেনদেন ধরা পড়ছে না। কারণ হিসেবে মার্কিন আর্থিক ব্যবস্থার দুর্বলতাকে চিহ্নিত করেছেন বিশ্লেষকরা। তারা বলছেন, মুনাফা গোপন করতে কোম্পানিগুলো দুর্বল আর্থিক ব্যবস্থাকে ব্যবহার করছে। এ ধরনের অপরাধ দমনে একাধিক সরকারি সংস্থার সমন্বিত পদক্ষেপ প্রয়োজন। খবর দ্য হিল।

ইন্টারপোলের হিসাব অনুযায়ী, পরিবেশ ধ্বংসকারী চোরাচালান, শিকার বা অবৈধভাবে গাছ কাটার মতো বাণিজ্যে বার্ষিক লেনদেন ২৮ হাজার ১০০ কোটি ডলারের বেশি। অর্থের হিসাবে এটি বিশ্বে তৃতীয় লাভজনক অবৈধ ব্যবসা।

বিশ্বজুড়ে এ ধরনের অপরাধ সংঘটিত হলেও যুক্তরাষ্ট্রের ব্যবস্থাপনাগত দুর্বলতা দেশটিতে অবৈধ অর্থ পাচারের গন্তব্য করে তুলেছে। কারণ দেশটি অর্থ পাচার বিষয়ে আইনে দুর্বলতা রয়েছে। এ তথ্য দিয়েছেন ফাইন্যান্সিয়াল অ্যাকাউন্ট্যাবিলিটি অ্যান্ড করপোরেট ট্রান্সপারেন্সি (এফএসিটি) জোটের পরিবেশকেন্দ্রিক অপরাধ ও অবৈধ অর্থবিষয়ক প্রকল্পের পরিচালক জুলিয়া ইয়ানসুরা।

মূলত পরিচয় গোপনকারী শেল কোম্পানি ও অন্যান্য সংস্থার মাধ্যমে এক দেশ থেকে অন্য দেশে এ ধরনের অর্থ পাচার হয়। এসব অপরাধে বিভিন্ন ধরনের নেটওয়ার্ক রয়েছে। অবৈধ বন্যপ্রাণী বিক্রির সঙ্গে জড়িত ছোট সংগঠিত গ্রুপ থেকে শুরু করে গাছ কাটা ও স্বর্ণখনি উজাড়ের মতো বৃহৎ নেটওয়ার্ক কাজ করছে। মাদক পাচার, সন্ত্রাসবাদ ও রাজনীতিতে অর্থায়নে এ ধরনের অপরাধ যুক্ত।

এনভায়রনমেন্টাল ইনভেস্টিগেশন এজেন্সির ফরেস্ট ক্যাম্পেইনের ডেপুটি ডিরেক্টর সুজান ব্রেটকপফ এ বিষয়ে সাম্প্রতিক একটি ঘটনার দিকে ইঙ্গিত করেছেন। তিনি জানান, ফ্লোরিডার এক দম্পতি রাশিয়া থেকে কাটা কাঠ পাচার করেন ও এর মাধ্যমে চীনে প্লাইউড তৈরি করেছিলেন। বিভিন্ন শেল কোম্পানি ব্যবহার করে তারা সরবরাহ চেইন অস্পষ্ট করে রাখেন ও কর এড়িয়ে যান।

জুলিয়া ইয়ানসুরা জানান, এ ধরনের ঘটনা প্রতিরোধে মার্কিন অর্থ পাচারবিরোধী কাঠামোয় দুটি প্রধান দুর্বলতা রয়েছে। প্রথমত শেল কোম্পানি সম্পর্কে বেশি তথ্য না থাকায় তাদের মালিকানা সম্পর্কে জানা যায় না। উদাহরণ হিসেবে কলম্বিয়ার দ্বিতীয়-বৃহত্তম স্বর্ণ রফতানির বিষয়ের মামলার কথা উল্লেখ করেন। যেখানে তথ্য গোপন করে শেল কোম্পানির মাধ্যমে ১০০ কোটি ডলারেরও বেশি পাচার করা হয়েছিল। এর প্রায় পুরোটাই মিয়ামির দুটি পরিশোধনাগারে রফতানি করা হয়েছিল। আরেকটি ঘটনায় অ্যামাজনে বন ধ্বংসের সঙ্গে জড়িতদের থেকে ঘুস নিয়ে মেরিল্যান্ডের আবাসন কিনেছিলেন পেরুর সাবেক প্রেসিডেন্ট আলেজান্দ্রো টোলেডো।

জলবায়ু ও পরিবেশগত অপরাধ দমনে আন্তর্জাতিকভাবে নেতৃত্বশীল অবস্থানে রয়েছে জো বাইডেন প্রশাসন। কিন্তু আর্থিক ব্যবস্থায় থাকা ফাঁকফোকর বন্ধ করতে না পারলে এতে খুব একটা সুবিধা হবে না বলে জানান এফএসিটির জুলিয়া ইয়ানসুরা। কারণ ১২০ বছর পুরনো লেসি অ্যাক্ট ট্রান্সন্যাশনাল পরিবেশকেন্দ্রিক সংঘবদ্ধ অপরাধ দমনের জন্য যথেষ্ট নয়। এ আইনের অধীনে বন্যপ্রাণী ও উদ্ভিদের অবৈধ বাণিজ্য নিষিদ্ধ।

সুজান ব্রেটকপফের মতে, লেসি আইনের মাধ্যমে পুরো বিষয়টি সমাধান করা যায় না। এসব সংঘবদ্ধ অপরাধ জটিল ধরনের কার্যকলাপের সংমিশ্রণ। তাই একাধিক সংস্থাকে সঙ্গে নিয়ে দুর্নীতিবিরোধী ও অর্থ পাচার বিষয়ে আইন একসঙ্গে প্রয়োগ করা যেতে পারে। এসব সংস্থার একটি হলো অর্থ মন্ত্রণালয়ের ফাইন্যান্সিয়াল ক্রাইমস এনফোর্সমেন্ট নেটওয়ার্ক (ফিনসিইএন)। তবে ফিনসিইএনের কর্মকর্তারা জানান, এ ধরনের অপরাধ তদন্তে ডিপার্টমেন্ট অব ফিশ অ্যান্ড ওয়াইল্ডলাইফ সার্ভিসেস ও বিচার বিভাগের নেচার রিসোর্স ডিভিসনের সাহায্য প্রয়োজন।

গত ফেব্রুয়ারিতে হাউজ ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসেস কমিটির সামনে সাক্ষ্য দেন ফিনসিইএনের পরিচালক আন্দ্রেয়া গাসকি। ওই সময় তিনি জানান, এ ধরনের অপরাধ দমনে বাজেট একটি বড় সমস্যা, যা দিন দিন বড় আকার ধারণ করছে।

এফএসিটি জোটের জুলিয়া ইয়ানসুরা বলেন, ‘‌আইন প্রয়োগে ত্রুটি দূর করার জন্য এ সমন্বয়ের চেষ্টার জন্য ইতিবাচক দিকে রয়েছে। উদাহরণস্বরূপ, চলতি বছরের শুরুতে শেল কোম্পানিগুলো থেকে সুবিধাভোগী মালিকদের তালিকার পদক্ষেপ নিয়েছে ফিনসিইএন।’

তিনি বলেন, ‘স্বচ্ছতা ও অর্থ পাচারবিরোধী পদক্ষেপ হিসেবে এটি ভালো পদক্ষেপ। আমরা এর বাস্তবায়ন অব্যাহত রাখতে চাই।’

এ ধরনের অবৈধ অর্থের একটি অংশ আবাসন খাতে যুক্ত হচ্ছে বলেও জানান জুলিয়া ইয়ানসুরা। সেখানেও ব্যবস্থা নেয়ার পরামর্শ দেন তিনি। বলেন, ‘আবাসন খাতের লেনদেনগুলো সমস্যা তৈরি করতে পারে, কারণ কোনো বন্ধকি ছাড়াই অগ্রিম অর্থ প্রদান এ ধরনের অপরাধে জড়িতদের আড়াল করতে পারে।’