ফলে ড্রোন শনাক্ত ও প্রতিরোধে ব্যবহৃত প্রযুক্তির বাজার দ্রুত সম্প্রসারণ হচ্ছে। একই সঙ্গে বিভিন্ন দেশের প্রতিরক্ষা খাতে ড্রোন, স্মার্ট অস্ত্র, আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ও ইলেকট্রনিক যুদ্ধ প্রযুক্তির চাহিদাও সম্প্রতি বাড়তে দেখা গেছে। বাজার গবেষণা প্রতিষ্ঠান মার্কেট অ্যান্ড মার্কেটসের পূর্বাভাস বলছে, বর্তমানে প্রায় ৪৫০ কোটি ডলারের ড্রোন প্রতিরোধ প্রযুক্তির বাজারটি ২০৩০ সালের মধ্যে ১ হাজার ৪৫০ কোটি ডলারে পৌঁছতে পারে। খবর রয়টার্স।

প্রতিবেদন বলছে, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ, মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত ও বিভিন্ন অঞ্চলের নিরাপত্তা পরিস্থিতির কারণে বিশ্বের অনেক দেশ নিজেদের প্রতিরক্ষা কৌশল পুনর্মূল্যায়ন করছে। ফলে ড্রোন প্রতিরোধ প্রযুক্তি ও আধুনিক প্রতিরক্ষা ব্যবস্থায় বিনিয়োগ বাড়ছে।

রয়টার্সের প্রতিরক্ষা ও বিমান চলাচলবিষয়ক প্রতিবেদক জোয়ানা প্লুচিনস্কা ও মারিয়া রুগামার জানান, ড্রোন প্রযুক্তির কারণে বিমান চলাচলে বিঘ্ন ঘটার ঘটনা নতুন নয়। ২০২০ সালের আগেও ড্রোন-সংশ্লিষ্ট সতর্কতার কারণে যুক্তরাজ্যের লন্ডনের গ্যাটউইক বিমানবন্দরে উড়োজাহাজ চলাচল সাময়িকভাবে বন্ধ রাখতে হয়। তবে সাম্প্রতিক সময়ে রাশিয়া-ইউক্রেন ও মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ড্রোন কার্যক্রম নতুন করে উদ্বেগ বাড়িয়েছে। এ অবস্থায় বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান নতুন ধরনের প্রতিরোধ প্রযুক্তি বাজারে আনছে।

যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক প্রতিষ্ঠান ডিড্রোন জানায়, কোম্পানিটি একটি বন্দুক আকৃতির যন্ত্র তৈরি করেছে যা ড্রোনের যোগাযোগ ব্যবস্থা বিঘ্নিত করতে পারে। অন্যদিকে বোয়িং একটি স্বয়ংক্রিয় ‘উইংম্যান’ প্রযুক্তি উন্মোচন করেছে। এটি যুদ্ধবিমানের সঙ্গে উড়তে পারে এবং ড্রোন প্রতিরোধী জ্যামার ও অস্ত্র বহন করতে সক্ষম।

শুধু সামরিক ক্ষেত্রেই নয়, জ্বালানি, নৌ-পরিবহন, ডেটা সেন্টার, হোটেল ও বিমানবন্দরসহ বিভিন্ন খাতে এখন ড্রোন-বিরোধী প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ছে। ফলে এ খাতে বিনিয়োগের পরিমাণও দ্রুত বাড়ছে।

নরওয়ের রাষ্ট্রীয় বিমানবন্দর পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠান অ্যাভিনর এরই মধ্যে নিজেদের পরিচালিত ৪৩টি বিমানবন্দরে ড্রোন শনাক্তকরণ ব্যবস্থা স্থাপন করেছে। প্রতিষ্ঠানটির মতে, বেসামরিক ড্রোন অনুপ্রবেশের কারণে বিমান চলাচলে বিঘ্ন ও বিলম্বের ঘটনা বাড়ছিল। সে কারণেই এ ব্যবস্থা নেয়া হয়।

ড্রোন প্রতিরোধ প্রযুক্তি খাতের একাধিক প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তারা জানান, সরকার, বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষ ও গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো পরিচালনাকারীদের কাছ থেকে চাহিদা উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে।

নেদারল্যান্ডসভিত্তিক ড্রোন শনাক্তকরণ প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান রবিনরাডারের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা সিয়েতে হামিঙ্গা জানান, সাম্প্রতিক সময়ে অনেক নতুন গ্রাহক তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করছেন। তার ভাষ্য, ড্রোন-সংশ্লিষ্ট হুমকি মোকাবেলায় আগ্রহ ও প্রয়োজন দুই-ই বেড়েছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, ইউরোপ ও মধ্যপ্রাচ্যে দেখা দেয়া তথাকথিত ‘হাইব্রিড যুদ্ধ’ পরিস্থিতি বন্দর, জ্বালানি তেলক্ষেত্র, বিমানবন্দর ও অন্যান্য অর্থনৈতিক অবকাঠামোর নিরাপত্তা নিশ্চিত করার প্রয়োজনীয়তা আরো বাড়িয়ে দিয়েছে।

গত এক বছরে দুবাই বিমানবন্দরে ড্রোন হামলা, বাল্টিক অঞ্চলে ড্রোন অনুপ্রবেশ, সংযুক্ত আরব আমিরাতের ফুজাইরাহ তেল অঞ্চলে ড্রোন প্রতিরোধের সময় ধ্বংসাবশেষ থেকে আগুন লাগা ও জার্মানির মিউনিখ ও ডেনমার্কের কোপেনহেগেন বিমানবন্দরে সন্দেহজনক ড্রোন সতর্কতার মতো ঘটনা বিভিন্ন খাতে উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে।

এদিকে ড্রোন-বিরোধী প্রযুক্তির ব্যবহার আরো জোরদার করার পরিকল্পনা করা হচ্ছে বলে জানিয়েছে ইউরোপের কয়েকটি বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষ।

ডিড্রোনের সাবেক কর্মকর্তা অ্যাশ-অ্যালেক্সান্ডার কুপার বলেন, ‘ইরান-সম্পর্কিত সংঘাত শুরুর পর পরই বিভিন্ন দেশ ও প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে জরুরি ভিত্তিতে ড্রোন প্রতিরোধ ব্যবস্থা স্থাপনের অনুরোধ আসতে শুরু করে।’

ড্রোন শনাক্তকারী রাডার নির্মাতা প্রতিষ্ঠান একোডাইনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা এবেন ফ্রাঙ্কেনবার্গ জানান, চলতি বছর নতুন কারখানা চালু হলে কোম্পানির বার্ষিক উৎপাদন সক্ষমতা ৩০ হাজার ইউনিটের বেশি হবে। এতে বাজারের বাড়তি চাহিদা পূরণ করা সহজ হবে।

এদিকে প্রতিরক্ষা খাতেও ড্রোন ও স্মার্ট অস্ত্রের গুরুত্ব দ্রুত বাড়ছে। সংযুক্ত আরব আমিরাতভিত্তিক প্রতিরক্ষা প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান এজ জানায়, বর্তমানে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের প্রতিরক্ষা খাতের বিনিয়োগ পরিকল্পনায় সবচেয়ে দ্রুত গুরুত্ব পাচ্ছে ড্রোন ও স্মার্ট অস্ত্র।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বিশ্বের সাম্প্রতিক সংঘাতগুলো প্রমাণ করছে যে ভবিষ্যতের যুদ্ধ কেবল প্রচলিত অস্ত্রের ওপর নির্ভর করবে না। ড্রোন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থা, ইলেকট্রনিক যুদ্ধ প্রযুক্তি ও উন্নত আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে। এ কারণে বিশ্বের বিভিন্ন দেশ এখন প্রতিরক্ষা ব্যয় বাড়ানোর পাশাপাশি নতুন প্রযুক্তিতে বিনিয়োগ করছে।

বিশ্লেষকদের ধারণা, নিরাপত্তা ঝুঁকি ও ভূরাজনৈতিক অনিশ্চয়তা অব্যাহত থাকলে আগামী কয়েক বছর ড্রোন ও ড্রোন প্রতিরোধ প্রযুক্তি উভয় খাতের বাজারই দ্রুত সম্প্রসারণ হবে।