চলতি বছর চীনে মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) প্রবৃদ্ধি বাড়ার পূর্বাভাস দিয়েছে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ)। সংস্থাটি বলছে, ২০২৪ সালে দেশটির জিডিপি প্রবৃদ্ধি হতে পারে ৫ শতাংশ। তবে ২০২৫ সাল নাগাদ তা কিছুটা কমে ৪ দশমিক ৫ শতাংশে নেমে যেতে পারে। খবর রয়টার্স।
বছরের প্রথম প্রান্তিকে (জানুয়ারি-মার্চ) জিডিপি প্রবৃদ্ধি আগের পূর্বাভাসকে ছাড়িয়ে গেছে চীন। ফলে পুরো বছরের পূর্বাভাস সংশোধন করেছে আইএমএফ। এর আগে ৪ দশমিক ৬ শতাংশ প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস দিয়েছিল সংস্থাটি।
তবে কর্মক্ষম মানুষের সংখ্যা কমে যাওয়া এবং উৎপাদনে ধীরগতির বিস্তৃতির কারণে ২০২৯ সাল নাগাদ দেশটির প্রবৃদ্ধি ৩ দশমিক ৩ শতাংশে নেমে যেতে পারে বলে পূর্বাভাস দিয়েছে আইএমএফ।
চলতি বছরে চীনের জিডিপি প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা ছিল প্রায় ৫ শতাংশ। তবে বছরের প্রথম প্রান্তিকে ৫ দশমিক ৩ শতাংশ জিডিপি প্রবৃদ্ধি দেখা গেছে বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনীতির দেশটিতে। ফলে চীন নিজেদের প্রবৃদ্ধি লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের পথে রয়েছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
তবে দীর্ঘমেয়াদে জিডিপি প্রবৃদ্ধি বাধাগ্রস্ত হতে পারে বলেও পূর্বাভাস দিয়েছেন অর্থনীতিবিদরা। কেননা দেশটিতে মূল্যসংকোচনের পরিমাণ দিন দিন বাড়ছে। আবাসন খাতও খারাপ সময় পার করছে। এর প্রভাব পড়ছে বিনিয়োগকারী, ভোক্তা ও ব্যবসায়ীদের ওপর। তবে দেশটি এ সংকট কাটিয়ে উঠতে পদক্ষেপ নিচ্ছে। এপ্রিল নাগাদ বিভিন্ন অর্থনৈতিক সূচকে উন্নতিও করেছে চীন। এতে স্বল্পমেয়াদে সংকট কাটিয়ে উঠতে পারে দেশটি। তবে দীর্ঘমেয়াদে তা কতটা টেকসই হবে তা নিয়ে সন্দিহান বিশ্লেষকরা। কেননা ২০২২ সালের ডিসেম্বরের পর সবচেয়ে ধীরগতিতে খুচরা মূল্য বাড়ছে। অন্যদিকে, নতুন নির্মিত বাড়ির দাম নয় বছরের মধ্যে সবচেয়ে দ্রুতগতিতে কমেছে। আইএমএফ এ বছর চীনে গড়ে প্রায় ১ শতাংশ মূল মুদ্রাস্ফীতি বৃদ্ধির পূর্বাভাস দিয়েছে।
ধীরগতিতে কভিড-১৯ মহামারীর ধকল কাটিয়ে উঠছে চীন। দেশটির মুদ্রা ইউয়ান ও পুঁজিবাজারের ওপর এর নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে। আবার আবাসন খাতের সংকটও অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারের পথে বাধা তৈরি করছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। আইএমএফও এর আগে বিষয়টি নিয়ে সতর্ক করেছিল।
সম্প্রতি বেইজিংয়ের এক সংবাদ সম্মেলনে চীনের অর্থনৈতিক নীতিমালা সম্পর্কে আইএমএফের বার্ষিক পর্যালোচনা নিয়ে কথা বলেন সংস্থাটির ফার্স্ট ডেপুটি ম্যানেজিং ডিরেক্টর গীতা গোপীনাথ। এ সময় তিনি বলেন, ‘চীনে বছরের প্রথম প্রান্তিকে জিডিপি প্রবৃদ্ধি প্রত্যাশার চেয়েও বেশি হয়েছে। আইএমএফের সংশোধিত পূর্বাভাসেও এটি উঠে এসেছে। তাছাড়া সংকট কাটিয়ে উঠতে বেশকিছু নীতিগত পরিবর্তন এনেছে দেশটি।’
আবাসন খাতে সংকট কাটিয়ে উঠতে সমন্বিত পদক্ষেপ গ্রহণের ওপর জোর দিচ্ছে সংস্থাটি। গীতা গোপিনাথ বলেন, ‘এ খাতকে টেকসই করতে চীনের নেয়া পদক্ষেপগুলো চালিয়ে যেতে হবে। তবে এখনো নানা জায়গায় সমন্বিত পদক্ষেপ গ্রহণের সুযোগ আছে। দেউলিয়া ব্যবসায়ীদের আবাসন খাত থেকে বেরিয়ে যেতে কেন্দ্রীয় সরকারের সহযোগিতা করা উচিত। এক্ষেত্রে নির্মাণ শেষ হয়নি, এমন ভবন কিনতে ক্রেতাদের সাহায্য করা যেতে পারে। যা বাজারে মূল্য নমনীয়তার পাশাপাশি স্থিতাবস্থা ফেরাতে সহায়তা করবে।’
এর আগে প্রথম প্রান্তিক শেষ হওয়ার আগে রয়টার্স পূর্বাভাস দিয়েছিল, ২০২৪ সালে চীনে ৪ দশমিক ৬ শতাংশ প্রবৃদ্ধি হতে পারে। তবে প্রথম প্রান্তিকে চীনের জিডিপি প্রবৃদ্ধির তথ্য প্রকাশিত হলে অনেক অর্থনীতিবিদ তাদের পূর্বাভাস সংশোধন করেছেন। সম্প্রতি আর্থিক পরিষেবা প্রতিষ্ঠা বিএনপি পরিবাস পূর্বাভাস দিয়েছে, চীন এ বছর ৫ শতাংশ প্রবৃদ্ধি লক্ষ্যমাত্রা পূরণ করে ফেলতে পারে। গত মাসে পূর্বাভাসে সংশোধন করে ৫ শতাংশ প্রবৃদ্ধির কথা বলেছে গোল্ডম্যান স্যাকস। এর আগে ২০২৩ সালে ৪ দশমিক ৮ শতাংশ প্রবৃদ্ধির কথা বলেছিল সংস্থাটি।
আর্থিক পরিষেবা প্রতিষ্ঠান সিটিও তাদের পূর্বাভাস সংশোধন করে ৫ শতাংশে উন্নীত করেছে। এর আগেও তারা ৪ দশমিক ৬ শতাংশ প্রবৃদ্ধির কথা বলেছিল। পূর্বাভাস পরিবর্তনের ব্যাপারে সব প্রতিষ্ঠানই প্রথম প্রান্তিকের উচ্চ প্রবৃদ্ধির কথা উল্লেখ করেছে।
চীন যখন ১৯৭৮ সালে তার অর্থনীতিকে সংস্কার করে উদারনীতি গ্রহণ শুরু করেছিল, তখন থেকেই দেশটির জিডিপি বছরে গড়ে ৯ শতাংশের বেশি হারে বৃদ্ধি পেয়ে আসছে। বিশ্ব প্রবৃদ্ধির চালিকাশক্তিতে পরিণত হওয়া দেশটি ২০২০ সালের করোনা মহামারীর সময় মাত্র ২ দশমিক ২ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জন করেছিল, যা কয়েক দশকের মধ্যে চীনের সর্বনিম্ন প্রবৃদ্ধি অর্জনের রেকর্ড। যদিও এর পরের বছরই দেশটির অর্থনীতি ঘুরে দাঁড়িয়েছিল। কিন্তু ২০২২ সালে আবারো চীনের প্রবৃদ্ধি কমে যায়। সে বছর দেশটির প্রবৃদ্ধি ছিল মাত্র ৩ শতাংশ। আইএমএফের পূর্বাভাস অনুযায়ী চীনের জিডিপি প্রবৃদ্ধি আরো বাড়লে তা এ অঞ্চলের দেশগুলোর অর্থনীতিতে ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে বলে মনে করেন বিশ্লেষকরা।










