দেশের জাহাজ ভাঙার ইয়ার্ডগুলো আগামী জুনের মধ্যে গ্রিন শিপ রিসাইক্লিং স্ট্যান্ডার্ডে রূপান্তর করা না হলে আর কোনো স্ক্র্যাপ জাহাজ আমদানি করতে পারবে না। এমন শর্তে এ শিল্পে দেখা দিয়েছে অনিশ্চয়তা। জানা গেছে, এখন পর্যন্ত গ্রিন শিপইয়ার্ডে রূপান্তর হয়েছে সাতটি ইয়ার্ড। ফলে শর্ত পূরণ করতে না পারা অধিকাংশ ইয়ার্ডকে প্রয়োজনীয় সনদের জন্য অপেক্ষা করতে হবে, যা এ শিল্পের ভবিষ্যৎ নিয়ে শঙ্কা বাড়াচ্ছে। তবে গ্রিন শিপইয়ার্ডে রূপান্তরের কাজ চলমান থাকায় জুনের মধ্যে আরো ২০-২২টি ইয়ার্ড অনুমোদন পেলে পরিস্থিতি কিছুটা সামাল দেয়া যাবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

ব্যবসায়ীরা বলছেন, কভিড-পরবর্তী বৈশ্বিক সংকট, ডলার ঘাটতি, এলসি নিষেধাজ্ঞা, আমদানি জটিলতা এবং স্থানীয়ভাবে স্টিলের চাহিদা কমে যাওয়ায় স্ক্র্যাপ জাহাজ আমদানি কমে গেছে। এরই মধ্যে অনেক ইয়ার্ড বন্ধ হয়ে গেছে, ছাঁটাই হয়েছে হাজারো শ্রমিক ও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন উদ্যোক্তারা। একই সময়ে ভারত গ্রিন ইয়ার্ড খাতে ব্যাপক অগ্রগতি অর্জন করেছে। তবে পিছিয়ে রয়েছে বাংলাদেশ। এমন পরিস্থিতির সুযোগ নিয়ে পার্শ্ববর্তী দেশটি এ খাতে নেতৃত্ব দিতে কাজ শুরু করেছে।

বাংলাদেশ শিপ ব্রেকার্স অ্যান্ড রিসাইক্লার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিএসবিআরএ) তথ্যমতে, দেশে গত এক দশকে (২০২৪ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত) বিদেশ থেকে ১ হাজার ৯৮৩টি স্ক্র্যাপ জাহাজ আমদানি করা হয়েছে। যার সম্মিলিত ওজন ছিল প্রায় ২ কোটি ৮ লাখ ৫৫ হাজার টন। এর মধ্যে ২০১৬ সালে ২৫২টি জাহাজে রেকর্ড ৩৪ লাখ টন স্ক্র্যাপ আমদানি করা হয়।

বেলজিয়ামভিত্তিক বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা শিপব্রেকিং প্লাটফর্মের তথ্যমতে, গত আট বছরে বাংলাদেশে ১ হাজার ৪০৫টি স্ক্র্যাপ জাহাজ আমদানি করা হয়েছে। একই সময়ে ভারত আমদানি করেছে ১ হাজার ৪৮৫টি। এছাড়া পাকিস্তান ও তুরস্ক জাহাজ আমদানি করেছে গড়ে ৭০০-৮০০টি।

বাংলাদেশ শিপ রিসাইক্লিং বোর্ডের (বিএসবিআরএ) তথ্যানুসারে, দেশে বর্তমানে গ্রিন শিপইয়ার্ডের সংখ্যা সাতটি। এগুলো হলো পিএইচপি শিপ রিসাইক্লিং, এসএন করপোরেশন, কবির স্টিল লিমিটেড, কেআর শিপ রিসাইক্লিং, ম্যাক করপোরেশন, জনতা শিপ ব্রেকিং এবং এইচএম শিপিং।

দেশে গত দেড় দশকে অন্তত দুই শতাধিক শ্রমিক শিপইয়ার্ডে কর্মরত অবস্থায় দুর্ঘটনার শিকার হয়ে মারা গেছেন। এছাড়া আহত হয়েছেন আরো কয়েকশ। তাই শোভন কর্মপরিবেশ ও শ্রমিকদের জন্য কর্মক্ষেত্রে নিরাপত্তা নিশ্চিতে গ্রিন শিপইয়ার্ডে রূপান্তরের নিয়ম চালু করা হয়।

দ্য শিপ ব্রেকিং অ্যান্ড রিসাইক্লিং রুলস ২০১১, আন্তর্জাতিক আইন এবং ২০০৯ সালে চীনে অনুষ্ঠিত হংকং কনভেনশন রুলস অনুযায়ী, শিপইয়ার্ডগুলোকে ঢেলে সাজানো হচ্ছে। বাংলাদেশ এ শর্তে চুক্তি করায় চলতি বছরের ২৬ জুনের মধ্যে হংকং কনভেনশন সার্টিফিকেশন রুলস অনুযায়ী গ্রিন শিপইয়ার্ডে রূপান্তরের বাধ্যবাধকতা রয়েছে।

শিল্প মন্ত্রণালয়ের সর্বশেষ তথ্যানুযায়ী, এখন পর্যন্ত এ খাতের ৮৫টি প্রতিষ্ঠান গ্রিন ইয়ার্ড বাস্তবায়নে শিপ রিসাইক্লিং ফ্যাসিলিটি প্ল্যান (এসআরএফপি) শিল্প মন্ত্রণালয়ে জমা দিয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠান গ্রিন ইয়ার্ড প্রকল্পের কাজ শুরুর অনুমোদন পেয়েছে। তবে আগামী ২৬ জুনের মধ্যে যেসব প্রতিষ্ঠান গ্রিন ইয়ার্ডে রূপান্তর করবে না, তারা স্ক্র্যাপ জাহাজ আমদানি করতে পারবেন না।

শিল্পোদ্যোক্তারা জানান, বর্তমানে দেশে গ্রিন ইয়ার্ডের সংখ্যা ভারতের চার ভাগের এক ভাগ। ফলে চলতি বছর দেশটির কাছে এ খাতের নেতৃত্ব হারাতে পারে বাংলাদেশ, যা ২০২৫ সালের শেষে দৃশ্যমান হয়ে উঠবে।

হংকং কনভেনশন অনুযায়ী, ভারতে বর্তমানে গ্রিন ইয়ার্ডের সংখ্যা শতাধিক। এ শিল্প খাতকে পরিবেশবান্ধব করতে দেশটির সরকার আরো ২০ কিলোমিটার এলাকা জাহাজ ভাঙা শিল্পের জন্য বরাদ্দ করতে যাচ্ছে। সেখানে ভারত সরকার নিজস্ব অর্থায়নে উন্নয়নমূলক ও অবকাঠামো নির্মাণ করে ব্যবসায়ীদের কাছে লিজ দেবে।

বিএসবিআরএর নির্বাহী কমিটির বোর্ড সদস্য হোসাইনুন আরেফিন বণিক বার্তাকে বলেন, ‘কভিড-পরবর্তী সময়ে ডলার সংকট ও মূল্যবৃদ্ধি এবং এলসি জটিলতার কারণে ব্যবসায়ীরা স্ক্র্যাপ জাহাজ আমদানি করতে পারেননি। এছাড়া ব্যাংক ঋণের সুদ বেড়ে যাওয়ায় অনেকে এ ব্যবসা থেকে সরে গেছেন। আমরা এ খাতের জায়ান্ট থাকলেও বর্তমানে ভারতের কাছে ব্যবসা হারাচ্ছি। দেশটির সরকার যেভাবে তাদের ব্যবসায়ীদের সহায়তা করছে, আমরা সেভাবে সহায়তা পাচ্ছি না।’

স্থানভেদে একটি গ্রিন ইয়ার্ড স্থাপনে সর্বনিম্ন ২০-২৫ কোটি টাকা এবং বৃহৎ পরিসরে ৫০-১০০ কোটি টাকা ব্যয় হয় জানিয়ে তিনি বলেন, ‘ব্যবসায়ীরা নিজস্ব উদ্যোগে এ অর্থায়ন করে থাকেন। কিন্তু সবার পক্ষে তা সম্ভব হয় না। এ কারণে ২০১৯ সালে শিল্প মন্ত্রণালয়ে পরিকল্পনা জমা দিয়েও অধিকাংশ ব্যবসায়ী কাজ শুরু করতে পারেননি।’ সরকার সহায়তা না দিলে এককভাবে ব্যবসা টিকিয়ে রাখা সম্ভব নয় বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

এ প্রসঙ্গে বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা ইয়ং পাওয়ার ইন সোশ্যাল অ্যাকশনের (ইপসা) সমন্বয়ক মোহাম্মদ আলী শাহিন বণিক বার্তাকে বলেন, ‘আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী বাংলাদেশ গ্রিন শিপইয়ার্ডের জন্য রেটিফাই করেছে। এ কারণে জুলাই থেকে গ্রিন সার্টিফায়েড ইয়ার্ড ছাড়া স্ক্র্যাপ জাহাজ আমদানি করা যাবে না। অন্যদিকে ভারতে বর্তমানে গ্রিন ইয়ার্ডের সংখ্যা বেশি থাকায় তারা সুযোগটি গ্রহণ করবে।’

আগামী ১০-১৫ বছরে অন্তত ১৫ হাজার জাহাজ স্ক্র্যাপ হিসেবে বিক্রি হবে জানিয়ে তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশের ব্যবসায়ীদের এখন গ্রিন ইয়ার্ডের মনোযোগ দিতে হবে। নয়তো এত বড় বাজার আমাদের হাতছাড়া হয়ে যাবে।’ সরকার প্রণোদনার ব্যবস্থা করলে খাতটির বিকাশ ঘটত এবং শ্রমিকদের কর্মসংস্থানের সুযোগ বৃদ্ধি পেত বলে মনে করেন ইপসার সমন্বয়ক।

কয়েক দশক ধরে জাহাজ ভাঙা শিল্পে বিশ্বের শীর্ষ দেশগুলোর মধ্যে একটি বাংলাদেশ। তবে পরিবেশ দূষণ, কর্মক্ষেত্রে দুর্ঘটনায় শ্রমিকের মৃত্যু এবং শোভন কর্মপরিবেশ সৃষ্টিতে ব্যর্থসহ নানা কারণে এ খাতের দুর্নাম রয়েছে। এসব বিবেচনায় নিয়ে হংকং কনভেনশন অনুযায়ী দেশের শিপইয়ার্ডগুলোকে বাধ্যতামূলক গ্রিন ইয়ার্ডে রূপান্তরের নির্দেশনা দেয়া হয়। কিন্তু গত কয়েক বছরে তা কেবল শুধু প্রস্তুতিতেই সীমাবদ্ধ ছিল। তাই শেষ মুহূর্তে তড়িঘড়ি করে অনেক প্রতিষ্ঠান গ্রিন ইয়ার্ডে রূপান্তরের কাজ শুরু করেছে।