মানব পাচার বন্ধ করতে হলে সরকারকে আইনের প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে এবং এর বিরুদ্ধে শক্ত পদক্ষেপ নিতে হবে। বাস্তবতা হলো বাংলাদেশে মানব পাচারের বিরুদ্ধে কোনো সরকারকেই দৃশ্যত কোনো পদক্ষেপ নিতে দেখা যায়নি। বরং বিগত সময়ে সরকারঘনিষ্ঠরাই মানব পাচারের সঙ্গে জড়িয়ে পড়েছেন। ফলে সব সরকারের আমলেই মানব পাচারের সিন্ডিকেট সক্রিয় থেকেছে। আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অভিযানে ছোটখাটো মানব পাচারকারী ধরা পড়লেও ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকেছে মূল অপরাধীরা। এখনো সক্রিয় রয়েছে মানব পাচারের সিন্ডিকেট। সরকারের কঠোর অবস্থান না থাকায় অনেকেই মানব পাচারকে কম ঝুঁকির ব্যবসা হিসেবে বেছে নিয়েছে। বাংলাদেশে মানব পাচার প্রতিরোধ করতে না পারার অন্যতম বড় কারণ হচ্ছে বিচারহীনতা ও রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতা। এক্ষেত্রে জাতিসংঘের মানব পাচার প্রটোকল-২০০০-এর নির্দেশনা অনুযায়ী পাচারকারীদের দ্রুত বিচারের আওতায় আনতে হবে। যেসব মামলা চলমান রয়েছে, সেখানে শক্ত তথ্যপ্রমাণের ভিত্তিতে অপরাধীদের শাস্তির আওতায় আনতে সক্রিয় হওয়া দরকার। যতক্ষণ না অপরাধীদের বিরুদ্ধে জোরালো আইনি পদক্ষেপ নেয়া হচ্ছে ততক্ষণ পাচার একটি কম ঝুঁকির ও উচ্চ লাভের কাজ হিসেবেই বিবেচিত হবে। তবে মানব পাচার অবশ্যই বন্ধ হওয়া দরকার। এজন্য দেশের অভিবাসন প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে হবে। মানব পাচার প্রতিরোধে বাংলাদেশের কার্যক্রমগুলোকে ভুক্তভোগী-সহায়ক করে গড়ে তুলতে হবে, যাতে নারী-পুরুষ বা তরুণ-বয়স্ক সব ভুক্তভোগী অগ্রাধিকার ভিত্তিতে সেবা পায়। এর অর্থ হলো বেসরকারি প্রতিষ্ঠান ও দাতাগোষ্ঠীর ব্যাপক প্রচেষ্টার সঙ্গে সমন্বয়ের ভিত্তিতে ভুক্তভোগীদের সেবা জোরদার করা জরুরি। সেই সঙ্গে ভুক্তভোগীদের জন্য পর্যাপ্ত নিরাপত্তা, চিকিৎসা এবং মানসিক, সামাজিক, আইনি ও পুনর্বাসনসেবাও নিশ্চিত করতে হবে।
বিদেশে কর্মসংস্থানের লক্ষ্যে বাংলাদেশ থেকে প্রতি বছর লক্ষাধিক মানুষ অভিবাসনের পথ বেছে নেন। প্রবাসী বাংলাদেশীদের পাঠানো আয় দেশের অর্থনীতির বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। তবে সম্ভাবনাময় এ খাত দীর্ঘদিন ধরে মানব পাচার সিন্ডিকেটের অপতৎপরতায় মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। অনিয়ম, দুর্নীতি ও সিন্ডিকেটের কারণে জনশক্তি রফতানির নিরিখে দেশের দ্বিতীয় বৃহৎ শ্রমবাজার মালয়েশিয়ায় গত বছরের ৩১ মে বন্ধ হয়েছে। এর আগেও একই অভিযোগে একাধিকবার তা বন্ধ হয়েছিল। একই অভিযোগে মধ্যপ্রাচ্য, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া ও ইউরোপের বড় বড় শ্রমবাজার থেকেও একাধিকবার বাংলাদেশ থেকে কর্মী নেয়ার বিষয়ে নিষেধাজ্ঞা জারি হয়েছে। ফলে অনেকেই অবৈধ পথে বিদেশে যেতে তৎপর হয় এবং মানব পাচারের সিন্ডিকেটের কবলে পড়েছেন অনেকেই। অবৈধ পথে বিদেশে গিয়ে সেসব দেশের আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী বা পাচারকারী চক্রের হাতে নির্যাতনের শিকার হতে হয়েছে। দুর্নীতি, সিন্ডিকেটের কারসাজির প্রভাব পড়েছে বৈধ অভিবাসীদের ওপরও। তাদের অনেকেই দালালদের প্রতারণার ফাঁদে পড়ে গন্তব্যে গিয়ে কাজ পাননি। অর্থাৎ সিন্ডিকেট চক্র ও দালালদের দৌরাত্ম্যে অভিবাসনপ্রত্যাশীদের জীবন যেমন ঝুঁকির মুখে পড়ছে, তেমনি বিশ্বের শ্রমবাজার ক্ষতিগ্রস্ত ও দেশের ভাবমূর্তি নষ্ট হচ্ছে। এসবের কোনো কিছুই অপ্রকাশিত নয়। গণমাধ্যমগুলোয়ও প্রায় এ-সংক্রান্ত অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশ পেয়েছে। তথ্যপ্রমাণসহ এর সঙ্গে জড়িতদের নামও সেসব প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। কিন্তু দুঃখজনকভাবে কোনো সরকারের আমলেই মানব পাচার সিন্ডিকেট ও দালালদের বিরুদ্ধে দৃশ্যমান বা কঠোর কোনো ব্যবস্থা নিতে দেখা যায়নি। অথচ মানব পাচার একটি গুরুতর অপরাধ। সরকারের পক্ষ থেকে কেন ব্যবস্থা নেয়া হয় না, তা বোধগম্য নয়। বিভিন্ন খাতে সংস্কারের জন্য যেমন কমিশন গঠন করা হয়েছে, সরকারের উচিত টেকসই উন্নয়ন ও স্থিতিশীল বিদেশী শ্রমবাজার গঠনে প্রয়োজনে কমিশন গঠন করা, যাতে খাতটির সংস্কার করা যায়।
বৈশ্বিক অভিবাসীর উৎস তালিকায় বাংলাদেশের অবস্থান ষষ্ঠ। কর্মসংস্থানের জন্য প্রতি বছর বিদেশে পাড়ি দেন গড়ে অন্তত ১০ লাখ মানুষ। এ মানুষগুলোর জীবনের নিরাপত্তা দেয়া সরকারেরই দায়িত্ব। দালাল চক্র যেন অবৈধ পথে কর্মী পাঠানো, মানব পাচারের মতো অপরাধ করতে না পারে সেজন্য কঠোর পদক্ষেপ নিতে হবে। আইনের প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে। অনেক ক্ষেত্রে এসব অপরাধ রিক্রুটিং এজেন্সির মাধ্যমে ঘটতে দেখা যায়। সুতরাং সিন্ডিকেট, রিক্রুটিং এজেন্সি, দালাল—সবার বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিয়ে দৃষ্টান্ত স্থাপন করা প্রয়োজন। যাতে ভবিষ্যতে মানব পাচারের নতুন কোনো সক্রিয় সিন্ডিকেট তৈরি না হয়। পাশাপাশি বহির্বিশ্বে অভিবাসন খাতে দেশের ভাবমূর্তি ফেরানো প্রয়োজন।
ভাবমূর্তি অক্ষুণ্ন রাখা বা মানব পাচার রোধে বিগত সরকারের পক্ষ থেকে কোনো কার্যকর উদ্যোগ দেখা যায়নি। বরং আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে মানব পাচারে জড়িত থাকার অভিযোগ উঠেছে খোদ সরকারি দলের নেতাকর্মী, এমপি-মন্ত্রীদের বিরুদ্ধে। কেউ কেউ বিদেশে গ্রেফতার হয়ে জেলও খেটেছেন। গণ-অভ্যুত্থানের মুখে এ সরকারের পতন ঘটেছে। দায়িত্ব নিয়েছে অন্তর্বর্তী সরকার। ছয় মাস অতিবাহিতও হয়ে গেছে এ সরকারের। কিন্তু তেমন কোনো উদ্যোগ পরিলক্ষিত না হওয়াটা বেশ হতাশাজনক। তবে প্রত্যাশা রয়েছে, সরকার এসব চক্রের বিরুদ্ধে শিগগিরই কোনো দৃশ্যমান উদ্যোগ নেবে।
বাংলাদেশ থেকে সাম্প্রতিক বছরগুলোয় মানব পাচারের মতো অপরাধের মাত্রা ব্যাপক আকার ধারণ করেছে। স্থানীয় বাংলাদেশী ও রোহিঙ্গা উদ্বাস্তুদের মধ্যে অর্থনৈতিকভাবে নাজুক অবস্থানে থাকা ব্যক্তিরা এর শিকার হচ্ছেন। বিদেশে উন্নততর জীবনযাপনের প্রত্যাশায় থাকা অভিবাসনপ্রত্যাশীরাও দালালের খপ্পরে পড়ছেন নিয়মিত। এর মধ্যে বাংলাদেশ থেকে নৌপথে মানব পাচারের বড় রুট এখন কক্সবাজার। স্থলপথে নারী ও শিশু সবচেয়ে বেশি পাচার হয় যশোর দিয়ে। আবার ময়মনসিংহ থেকে সোমেশ্বরী নদী পেরিয়ে মানব পাচারের তথ্যও এখন সামনে আসছে। আর ইউরোপ ও আমেরিকায় মানব পাচারে শুরুতে ব্যবহার হয় আকাশপথ। এর মধ্যে ইউরোপে অভিবাসনপ্রত্যাশীদের মধ্যপ্রাচ্য হয়ে নিয়ে যাওয়া হয় লিবিয়ায়। সেখান থেকে নৌকায় করে ইউরোপ অভিমুখে উত্তাল ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিতে গিয়ে মৃত্যু হয় অনেকের।
মানব পাচার নির্মূলে বাংলাদেশের যেসব দুর্বলতা রয়েছে, সেগুলো কাটিয়ে উঠতে জোরালো পদক্ষেপ নিতে হবে। বিশ্লেষকরা বলছেন, পেনাল ল, পুলিশ অ্যাক্ট, সিআরপিসি, এভিডেন্স অ্যাক্ট হয়েছিল মূলত লুণ্ঠন, শোষণ ও নিষ্পেষণের জন্য। যাতে বাংলা ও ভারতবর্ষ থেকে সম্পদ ইংল্যান্ডে সহজে পাচার করা যায়। ১৮৬০ সালের আইন দিয়ে যদি ২০২৫ সালে বিচার করতে হয় তাহলে আইনের কঠোর প্রয়োগ সম্ভব না। কারণ এ আইন এখন ব্রিটেনেও নেই। এ আইনে যারা পাচারকারী চক্রের মূল হোতা তাদের সাজা হয় না। সাজা হয় শুধু মানব পাচার চেইনের মধ্যবর্তী অবস্থানে থাকা পাচারকারী বা দালালদের। তাই মানব পাচার আইনকে আরো যুগোপযোগী করে শক্তিশালী করা প্রয়োজন। যাতে মূল অপরাধীদের বিরুদ্ধে শক্তভাবে ব্যবস্থা নেয়া যায়।
নিরাপদ মাধ্যমে বিদেশে কাজের জন্য গমনেচ্ছু ব্যক্তিদের সুরক্ষায় কার্যক্রম জোরদার করতে হবে। এর মধ্যে থাকবে নিয়োগের জন্য আন্তঃসরকারি সমঝোতার মাধ্যমে ধার্য করা দাপ্তরিক ফি বাড়িয়ে নেয়া নিয়োগকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য প্রযোজ্য আইনের প্রয়োগ অব্যাহত রাখা এবং এসব ফি কর্মীদের থেকে আদায় বন্ধ করে সেই ব্যয়ভার নিয়োগকারীদের ওপর বর্তানোর জন্য কাজ করা। যখন কোনো ব্যক্তি নিয়োগ ফি পরিশোধের জন্য ঋণ নেন, তখন তিনি শোষণের এক ভয়াবহ ঝুঁকিতে পড়েন। কর্মীদের শুরু থেকেই অসুবিধার মধ্যে ফেলা এ শুভংকরের ফাঁকির হিসাবের সম্পূর্ণ পরিবর্তন দরকার। নিরাপদ অভিবাসনের জন্য সহজ পথ তৈরি করতে নিয়োগকারীদের অবশ্যই আরো বেশি প্রচেষ্টা নিতে হবে।
পাচারকারীরা দেশের দরিদ্র মানুষের আর্থিক অসচ্ছলতাকে পুঁজি করছে। মানব পাচারের অপরাধের জন্য তাদের অবশ্যই জবাবদিহিতার আওতায় আনতে হবে। বাংলাদেশ বৈধ অভিবাসনের মাধ্যমে অর্জিত রেমিট্যান্স দিয়েই অর্থনীতির মজবুত ভিত্তি গড়তে সক্ষম হয়েছে। বহির্বিশ্বে বাংলাদেশের অভিবাসী শ্রমিকদের ভালো ভাবমূর্তি ছিল। কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোয় এ ভাবমূর্তি মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। সুতরাং জাতীয় স্বার্থেই এখন মানব পাচার রুখতে হবে। এক্ষেত্রে কালক্ষেপণ না করে যত দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নেয়া যায় ততই মঙ্গল। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় ও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় একসঙ্গে গুচ্ছ পরিকল্পনা নিয়ে কাজ করলে সুফল আসবে বলে আশা করা যায়। বৈধ পথে সরকার অনুমোদিত দেশগুলোয় শ্রমিক পাঠানোর উদ্যোগ নিতে হবে। বিভিন্ন দেশে বাংলাদেশের দূতাবাসগুলোকে বাংলাদেশী নাগরিকদের জন্য সহানুভূতিশীল হিসেবে গড়ে তুলতে হবে। মানব পাচারকারী দালাল চক্রের দৌরাত্ম্য বন্ধ করতে, অন্যদিকে সরকারি সহায়তায় গ্রামীণ অঞ্চলের প্রান্তিক দরিদ্র মানুষদের আত্মনির্ভরশীল করতে উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে। এক্ষেত্রে সরকার স্বল্প ও বিনা সুদে ক্ষুদ্র ও দীর্ঘমেয়াদি ঋণসহায়তা দিয়ে সাধারণ মানুষকে কর্মমুখী করে তুলতে সক্ষম হবে।










