স্বাভাবিক নিয়মে বছর শেষে সবাই আয়োজন করে নতুন বছরকে স্বাগত জানানোর। উৎসবমুখর হয়ে ওঠে দেশ। কিন্তু এবার তেমন কোনো আয়োজন নেই। ৩০ ডিসেম্বর প্রয়াত হয়েছেন বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) চেয়ারপারসন ও তিনবারের সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া। গতকাল তার দাফন সম্পন্ন হয়েছে। খালেদা জিয়ার প্রয়াণে পুরো দেশে শোকের ছায়া নেমে এসেছে। তার এ প্রস্থানের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের রাজনীতিতে চার দশকেরও বেশি সময়জুড়ে বিস্তৃত এক সংগ্রামমুখর অধ্যায়ের সমাপ্তি ঘটল। কিন্তু এ শোককে শক্তি করে এগিয়ে যাওয়ায় হতে পারে নতুন বছরের অনুপ্রেরণা। বিশেষ করে খালেদা জিয়া গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারে যে তৎপরতা দেখিয়েছেন তা আগামীতে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ক্ষেত্রে অনুসরণীয় হতে পারে।

নানা রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামাজিক টানাপড়েন, উত্থান-পতন, প্রত্যাশা-হতাশার মাঝে সমাপ্তি ঘটেছে বছরটির। ব্যবসার পরিবেশ ছিল স্থবির। পাশাপাশি উচ্চ সুদের হার, উচ্চ মূল্যস্ফীতি নতুন বিনিয়োগ থেকে ব্যবসায়ীদের দূরে রেখেছে। সব মিলিয়ে ২০২৫ সাল ছিল বেসরকারি খাতের জন্য হতাশার বছর। অস্বীকার করার উপায় নেই যে অর্থনীতি বিষয়টিই সাধারণ মানুষের মনের বিরাট অংশজুড়ে আছে। ২০২৫ সালে তাদের অর্থনৈতিক প্রত্যাশা ছিল অনেক, কিন্তু চিন্তাও তাদের কম ছিল না। সে প্রত্যাশা আর চিন্তা আবর্তিত হয়েছে তাদের জীবনের অর্থনীতি নিয়ে, যার মধ্যে রয়েছে বেকারত্ব; সুযোগের অসমতা; ঋণ, মৌলিক সামাজিক সেবার গুণগত মান; অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা, মব সহিংসতা ইত্যাদি।

এটা অনস্বীকার্য যে ২০২৫ সালে বাংলাদেশের অর্থনীতির ক্ষেত্রে কিছু ইতিবাচক পরিবর্তন লক্ষ করা গেছে। যেমন বাইরে থেকে অর্থপ্রবাহ বেড়েছে, বৈদেশিক মুদ্রার মজুদের উন্নতি হয়েছে, সম্পদ পাচার আটকানো গেছে। ব্যাংক খাতে যেসব ব্যাংক ভেঙে পড়েছে তাদের পুনর্গঠনে সহায়তা দেয়া হয়েছে, ব্যাংক পরিচালনা পর্ষদগুলোকে পুনর্বিন্যস্ত করা হয়েছে। অর্থনৈতিক শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনার লক্ষ্যে বেশকিছু ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে। দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিকেও ৩ শতাংশের ওপরে ধরে রাখা গেছে।

গত বছর অন্যতম সমস্যা ছিল দুর্বল ঋণ প্রবৃদ্ধি। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নীতি ও বাজারের অস্থিরতার কারণে বেসরকারি খাতে ঋণ দেয়া কমে গেছে। রয়েছে বিনিয়োগে মন্দাও। দেশে নতুন বিনিয়োগ হয়নি, বিশেষ করে মূলধনি যন্ত্রপাতি আমদানি কমেছে, যা অর্থনীতির দীর্ঘমেয়াদি প্রবৃদ্ধির জন্য উদ্বেগের কারণ। উচ্চ মূল্যস্ফীতির প্রভাবে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বাড়ায় সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমেছে। পাশাপাশি বেড়েছে ব্যবসা পরিচালনার খরচ। রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং অন্তর্বর্তী সরকারের বিভিন্ন নীতিগত সিদ্ধান্ত বেসরকারি খাতে নেতিবাচক প্রভাব রেখেছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য বলছে, বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি নেমে এসেছে মাত্র ৬ দশমিক ২৩ শতাংশে (অক্টোবর ২০২৫), যা এ খাতে আস্থার সংকটের একটি সরাসরি অর্থনৈতিক সূচক। এ সংকট স্পষ্ট হয়ে উঠছে বিনিয়োগ ও ব্যবসা সম্প্রসারণ না করার সিদ্ধান্তে। ২০২৫ সালের জুলাই থেকে নভেম্বর সময়ে মূলধনি যন্ত্রপাতি আমদানির ঋণপত্র নিষ্পত্তি কমেছে ১৬ দশমিক ৭৭ শতাংশ, যা শিল্পায়নের ভবিষ্যৎ গতি নিয়ে প্রশ্ন তুলছে। একই সঙ্গে জুনে শেষ হওয়া অর্থবছরে নতুন বিদেশী বিনিয়োগ (ইকুইটি ক্যাপিটাল) প্রবৃদ্ধি কমেছে ১৬ দশমিক ৯০ শতাংশ।

চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। শান্তিপূর্ণ গণতান্ত্রিক রূপান্তরের শুরুটা সুষ্ঠু নির্বাচনের মাধ্যমে হতে পারে। এজন্য দেশের আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ জরুরি। নির্বাচনের পরিবেশ যেন কেউ অস্থিতিশীল করতে না পারে তা অন্তর্বর্তী সরকারকে নিশ্চিত করতে হবে। দেশের জনগণের জানমালের নিরাপত্তা সরকারকে নিশ্চিত করতে হবে। নির্বাচন ঘিরে অস্থিতিশীলতা অতীতে দেখা গেছে। গুম-খুনের রাজনীতি হতে দেখা গেছে। সেগুলো পুনরায় হোক তা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য হবে না। সরকারকে তাই বিশেষ মনোযোগ দিতে হবে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠায়। মনে রাখা প্রয়োজন, সুষ্ঠু নির্বাচন গণতান্ত্রিক উত্তরণ প্রক্রিয়ার অন্যতম ভিত্তি। আর এর ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে আগামীর নির্বাচিত সরকারের অঙ্গীকারবদ্ধ হওয়া প্রয়োজন।

শেষ হয়ে যাওয়া বছরটিতে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক বাস্তবতাটি ছিল অনেকটাই নেতিবাচক। বাংলাদেশের প্রবহমান সমস‍্যাগুলোর শীর্ষে রয়েছে দারিদ্র‍্য ও অসমতা। বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে যে নিকট অতীতে দারিদ্র‍্য দূরীকরণে বাংলাদেশের অর্জনের অনেকটাই সাম্প্রতিক সময়ে খোয়া গেছে। ২০১০ থেকে ২০২২ সাল—এ ১২ বছরে বাংলাদেশ তার জনগোষ্ঠীর প্রায় ৩ কোটি ৪৯ লাখ মানুষকে দারিদ্র‍্যসীমার ওপরে নিয়ে আসতে পেরেছিল। কিন্তু গত তিন বছরে বাংলাদেশে দারিদ্র‍্য হার আবার ১৮-২১ শতাংশে উঠে গেছে। আজকে দেশের ৩ কোটি ৬০ লাখ মানুষ দারিদ্র‍্যসীমার নিচে বাস করে। গত তিন বছরেই ৩০ লাখ লোক দারিদ্র‍্য ফাঁদের মধ‍্যে পড়েছে। আরো ৬ কোটি ২০ লাখ লোক দারিদ্র‍্য ফাঁদে পড়ার হুমকিতে আছে। দেশের অর্থনীতির বর্তমান একটি অন্যতম বাস্তবতা হচ্ছে অসমতা ও বৈষম্য। বাংলাদেশের উচ্চতম ১০ শতাংশ মানুষ দেশের ৫৮ শতাংশ সম্পদের মালিক, আর দেশের নিচের দিকের ৫০ শতাংশ মানুষ (দেশের অর্ধেক লোক) ৪ শতাংশ সম্পদ ভোগ করে। সাম্প্রতিক সময়ে যদিও গ্রামীণ বাংলায় আয় অসমতা স্থিতিশীল রয়েছে, দেশের শহরাঞ্চলে তা বেড়ে গেছে।

দীর্ঘদিন ধরেই দেশে উচ্চ মূল্যস্ফীতি বিরাজমান। অক্টোবরে মূল্যস্ফীতি কমলেও নভেম্বরে তা আবার বেড়ে ৮ দশমিক ২৯ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। অক্টোবরে তা ছিল ৮ দশমিক ১৭ শতাংশ। কয়েক মাস ধরে মূল্যস্ফীতি ওঠানামা করছে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) তথ্য বলছে, গত নভেম্বরে খাদ্য মূল্যস্ফীতি হয়েছে ৭ দশমিক ৩৬ শতাংশ। আর খাদ্যবহির্ভূত মূল্যস্ফীতি হয়েছে ৯ দশমিক ৮ শতাংশ। টানা দুই মাস ধরে খাদ্য মূল্যস্ফীতি বেড়েছে।

২০২৫ সালে অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা বাংলাদেশ অর্থনীতির জন্য একটি বিরাট সমস্যা হিসেবে অব্যাহত ছিল। সেই সঙ্গে সহিংসতা, সন্ত্রাস ও মবতন্ত্রের ফলে এ দেশের অর্থনীতি একটি শঙ্কার মধ্য দিয়ে অনিশ্চিত সময় পার করেছে। দেশের উৎপাদন পরিমাণ, প্রবৃদ্ধি, সঞ্চয়, বিনিয়োগ একটি শ্লথতার মাঝখান দিয়ে গেছে। এর কারণে শ্লথ অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে অপর্যাপ্ত বিনিয়োগ এবং বিস্তৃত কর্মহীনতা দেশের অর্থনীতিকে দুর্বল করেছে। দেশের কৃষি ও শিল্প উৎপাদন এখনো প্রার্থিত স্তরে পৌঁছেনি। বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকট এবং সেই সঙ্গে সামাজিক অস্থিরতা এ উৎপাদন স্তরকে আরো বিপর্যস্ত করেছে। উচ্চ মূল্যস্ফীতির নেতিবাচক প্রভাব মানুষের যাপিত জীবনকে প্রভাবিত করেছে এবং দেশে বিনিয়োগ নিম্নস্তরেই রয়ে গেছে। অর্থনৈতিক মন্দা, রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং অনিশ্চয়তা অর্থনীতিতে নানা নাজুকতা ও ভঙ্গুরতার জন্ম দিয়েছে। পোশাক শিল্পে অস্থিতিশীলতা বিরাজ করছে, বহু উদ্যোক্তা কার্যকর নন, বিদেশী বিনিয়োগেও দ্বিধা আছে। ফলে দেশের উৎপাদন ভিত্তিও দুর্বল এবং উৎপাদনের ধারাবাহিকতা নষ্ট হয়েছে।

বস্তুনিষ্ঠ ও প্রাজ্ঞ নীতিমালা এবং প্রাতিষ্ঠানিক শক্তি নিয়ে সরকার যদি সঠিক পথে এগোয় তাহলে বাংলাদেশ একটি অর্থনৈতিক পথযাত্রা গড়ে তুলতে পারবে। সমতা ও বৈষম‍্যহীনতাসম্পন্ন একটি অর্থনৈতিক গণতন্ত্র নিশ্চিত করে দেশের সব মানুষের সুকল‍্যাণ নিশ্চিত করতে হবে। যদি সে ব‍্যাপারে নবনির্বাচিত সরকার ব‍্যর্থ হয়, তাহলে সেটা হবে একটা বিশাল হৃত সুযোগ, যা বাংলাদেশের ইতিহাসে বহুবার ঘটেছে। আর্থসামাজিক স্থিতিশীলতা ও গণতান্ত্রিক রূপান্তরের বছর হোক ২০২৬। সে আলোকে আমরা নতুন বছরকে নতুন রূপে পেতে চাই। সবাইকে নতুন বছরের শুভেচ্ছা।