শুনলাম আগের দিন ঢাকায় শিক্ষার্থীদের ওপর গুলি করা হয়েছে। স্কুলে গিয়ে দেখি আমাদের ক্লাসের কেউ ওদিন স্কুলে যায়নি। স্কুল চত্বরেই সিনিয়র অনেকে মিলে আলোচনা করছেন। বলছেন, আমরা স্ট্রাইক করব। স্ট্রাইক কী? কী নয়? এগুলো সম্পর্কে আমার ধারণা ছিল না তখন। যা হোক সেদিন ক্লাস হয়নি। ওইদিনই সাব-ডিভিশনাল হেডকোয়ার্টার থেকে দুজন শিক্ষার্থী এলেন। তারা রাষ্ট্রভাষা আন্দোলন, ঢাকায় আন্দোলনে গুলি, ছাত্র নিহত হওয়া—এসব ঘটনা নিয়ে আলোচনা করলেন। ঘোষণা দিলেন, এ ঘটনার প্রতিবাদে স্ট্রাইক করবেন। জীবনে প্রথম মিছিল করে হেঁটে গেলাম। তখন অনেক স্লোগান দিয়েছি। ওই স্লোগানগুলোর কথা স্পষ্ট মনে আছে। ঘটনাটি আমার মনে বিরাট আলোড়ন তৈরি করে। সেই ধারাবাহিকতাতেই তো ভাষা, মাতৃভাষা এমনকি মাতৃভাষা নিয়েও আমার সচেতনতা।
যেহেতু আমি পেশাগত জীবনে বাংলা সাহিত্য নিয়ে অধ্যাপনা করেছি, সেহেতু আমার কাজের পরিসরও সেদিকেই ঠেকেছে। এক্ষেত্রে পুরনো বাংলার সাময়িকপত্র ঘাঁটাঘাঁটি করলেই দেখা যাবে মাতৃভাষার প্রশ্নে অসংখ্য বিতর্ক রয়েছে। এ বিতর্ক রয়ে গেছে আজও। মাতৃভাষার প্রশ্নে বাঙালি মুসলমানদের একাংশ উর্দুর পক্ষে মত দিয়েছে। আবার আরেকটি অংশ মাতৃভাষা বাংলা চেয়েছে। ১৯৪৭ সালের ১৪ আগস্টের পর তৎকালীন পাকিস্তানে রাষ্ট্রভাষার প্রশ্নে যে বিতর্ক দেখা দিয়েছিল, তার সঙ্গে ওই পুরনো বিতর্কের সম্পর্ক আছে। উর্দু ভাষা এবং বাংলার উর্দুভাষী পরিবারগুলোর উদ্ভব ও বিকাশের ইতিহাস অনুসন্ধান এবং উত্তরকালের ঘটনাবলি লক্ষ্য করলে বিষয়টি বোঝা সহজ হবে। যতদূর জানা যায়, উনিশ শতকের চল্লিশের দশকের শুরুর দিকেও কলকাতা থেকে মুদ্রিত দৈনিক বাংলা পত্রিকার চেয়ে দৈনিক উর্দু পত্রিকার সংখ্যা বেশি ছিল। তাই বুদ্ধিবৃত্তিকভাবে উর্দুর প্রতি একটা সমর্থন ছিল। কেন ছিল? ইতিহাস ঘাঁটলে দেখা যায়, উর্দুর উদ্ভব ঘটেছে মোগল আমলে। উর্দু শব্দটির অর্থ সেনা বা সেনাদের তাঁবু। মোগল আমলে ভারতবর্ষের শাসকশ্রেণী গঠিত হয়েছিল তুর্কি-মোগল, ইরানি, আফগান প্রভৃতি বিদেশী জাতিগোষ্ঠীদের দ্বারা। এ বিদেশীদের সহযোগী দেশী লোকেরা শাসনকাঠামোতে গেলেও সামাজিক পর্যায়ে নিম্নস্তরে ছিলেন। তুর্কি-মোগল, ইরানি ও আফগানরা নিজ নিজ দেশের ভাষাতেও কথা বলতেন। তবে ওই সময় সরকারি দপ্তরে ও শাসনভার চালানোর জন্য ফরাসি ভাষার প্রচলন ছিল বেশি। ফরাসি ভাষার সঙ্গে বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠীর সম্মিলনের উদ্দেশ্যেই উর্দুর উদ্ভব ও বিকাশ।
মধ্যযুগের মধ্যপ্রাচ্য ও মধ্য-এশিয়ার বিভিন্ন দেশ থেকে ভারতবর্ষে আগত এবং শাসক, কর্মচারী, ব্যবসায়ী ও ভাগ্যান্বেষী হিসেবে প্রতিষ্ঠিত বেশকিছু লোক শত শত বছর ধরে ভারতে বসবাস করেও নিজেদের স্বাতন্ত্র্য রক্ষা করে চলেছে। ভারতবর্ষের জনসমুদ্রে তারা বিলীন হতে চায়নি। শতাব্দীর পর শতাব্দী ভারতবর্ষকে তারা মাতৃভূমিরূপেও গ্রহণ করতে চায়নি। শত শত বছর ধরে তারা ভারতবর্ষে বসবাস করেছে প্রবাসী মন নিয়ে। হিন্দুদের থেকে যেমন, তেমনি ধর্মান্তরিত স্থানীয় মুসলমানদের থেকেও তারা নিজেদের বিচ্ছিন্ন রেখেছে। বিয়েশাদি তারা নিজেদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ রেখেছে। তারা বংশমর্যাদা রক্ষায় সচেষ্ট থেকেছে। দেশী মুসলমানদের সঙ্গে বহিরাগত মুসলমানরা বৈবাহিক সম্পর্কে আসেনি। তবে উর্দুভাষীদের সঙ্গে স্থানীয় লোকদের রক্তমিশ্রণ যে একেবারেই ঘটেনি, তা নয়। বহিরাগতরা নিজেদের পরিচয় দিয়েছে ‘আশরাফ’ বা অভিজাত বলে এবং স্থানীয় মুসলমানদের তারা অভিহিত করেছে আতরাফ বা নীচ জাত বলে। নানা কারণে ‘জাতে তোলা’র এবং ‘জাতে ওঠা’র ব্যাপারও এর মধ্যে ছিল। দেশী লোকদের মধ্য থেকে যারা শক্তিমান ও বিত্তবান হয়েছে, তারা নানা উপায়ে জাতে উঠেছে। তারা বহিরাগত বলে আত্মপরিচয় দিতে আরম্ভ করেছে।
ভারতে এবং বাংলায় উচ্চ শ্রেণীর হিন্দুরা বহিরাগত মুসলমানদের অভিহিত করেছে ‘যবন’ বলে। যবনে-ব্রাহ্মণে সব সময়েই বিরোধ ছিল। আশরাফরা ছিল যবনদেরই নিম্নস্তর। যবন শব্দটির অর্থ মুসলমান নয়। এর অর্থ বিদেশী। ইতিহাসে দেখা যায়, বাংলাভাষী ভূভাগে প্রায় ৮০০ বছর ধরে ‘যবন’ ও ‘আশরাফ’ মুসলমানরা স্থানীয় ‘আতরাফ’ মুসলমানদের ওপর কর্তৃত্ব করেছে। উনিশ শতকের শেষ দুই দশক এবং বিশ শতকের প্রথম তিন দশকব্যাপী বাঙালি মুসলমানের মাতৃভাষা বাংলা, না উর্দু—তা নিয়ে বিস্তর তর্ক-বিতর্ক হয়। মধ্যযুগে বাংলা ভাষার প্রতি আশরাফদের মনোভাব অবজ্ঞাপূর্ণ ছিল। মুসলমান যবন শাসকরা কিছু ব্যতিক্রম সত্ত্বেও নিজেদের শাসনক্ষমতা রক্ষা করার জন্য উদারনীতি নিয়ে চলেছেন। সতেরো শতকের সন্দ্বীপের কবি আবদুল হাকিমের সর্ববিদিত উক্তি: ‘যে সবে বঙ্গেত জন্মি হিংসে বঙ্গবাণী...।’ যারা কেবল ফার্সি ভাষা চর্চা করতেন এবং বাংলার প্রতি অবজ্ঞা প্রদর্শন করতেন, তাদের উদ্দেশে মধ্যযুগের মুসলিম কবিদের কটূক্তি অনেক পাওয়া যায়। যবনদের প্রতি হিন্দু কবিদের কটূক্তিও অনেক পাওয়া যায়। তুর্কি, মোগল, ইরানিরা এ দেশে এসে রাতারাতি ভারতীয় কিংবা বাঙালি হয়ে যায়নি। আসলে তারা বাঙালি হয়েছে ধীরে ধীরে; বিংশ শতাব্দীর শেষার্ধে। ১৯৬০-এর দশকে বদরুদ্দীন উমর প্রবন্ধ লিখেছিলেন ‘মুসলমানের স্বদেশ প্রত্যাবর্তন’ নামে। আইয়ুব খান তার ‘প্রভু নয়, বন্ধু’ বইতে উল্লেখ করেছেন যে পূর্ব পাকিস্তানের মুসলমানরা আরব-ইরান থেকে আগত। ১৯৪৮ সালে পাকিস্তানের প্রতিষ্ঠাতা মোহাম্মদ আলি জিন্নাহ ঢাকার রমনা রেসকোর্স ময়দানের যে সভায় বলেছিলেন, ‘উর্দু এবং একমাত্র উর্দুই হবে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা’; ওই জনসভায় তিনি এ কথাও বলেছিলেন যে, পূর্ব বাংলার মুসলমানরা আরব, ইরান, ইরাক থেকে আগত। আসলে যবন বা বিদেশ থেকে আগত শাসকদের ইতিহাসকেই এরা বাংলার জনসাধারণের ইতিহাস মনে করতেন। ইখতিয়ার উদ্দিন মুহম্মদ বিন বখতিয়ার খলজি থেকে মীরজাফর পর্যন্ত শাসকদের ইতিহাস আর ঢাকার খাজা পরিবার কিংবা টাঙ্গাইলের গজনবি পরিবারের ইতিহাস দিয়ে কি বাংলার মুসলমান জনসাধারণের ইতিহাস বোঝা যাবে? জিন্নাহ থেকে আইয়ুব-ইয়াহিয়া পর্যন্ত সবাই খাজা-গজাদের ইতিহাসকেই পূর্ব বাংলার মুসলমান জনগণের ইতিহাস মনে করেছেন। মধ্যযুগে এবং ইংরেজ আমলেও বর্ণ হিন্দুদের দ্বারা ভারতের ও বাংলার তুর্কি মোগল শাসকরা অভিহিত হয়েছেন ‘যবন’ বা ‘বিদেশী’ বলে।
১৯৪৭ সালের ১৪ আগস্টের পর পূর্ব বাংলার মুসলমানদের মাতৃভাষা বিতর্ক রূপান্তরিত হয় পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা বিতর্কে। দেশে এমন লোক আজও আছেন, যারা ইখতিয়ার উদ্দিন মুহম্মদ বিন বখতিয়ার খলজি থেকে মীরজাফর পর্যন্ত কিংবা কুতুবুদ্দিন আইবেক থেকে বাহাদুর শাহ জাফর পর্যন্ত শাসক, আমলা, সৈনিক ও ব্যবসায়ীদের সঙ্গে নিজেদের রক্তসম্পর্ক প্রমাণের প্রচেষ্টায় সীমাহীন উর্বর মস্তিষ্ক ও কল্পনাশক্তির পরিচয় দিতে পারছেন। অতীতে বিভিন্ন ঐতিহাসিককালে এ জাতির জীবনে ভালো-মন্দ অনেক ঘটনা ঘটেছে। সেসব ঘটনাকে বাদ দিয়ে কেবল সমকালীন ঘটনাবলিতে দৃষ্টিকে সীমাবদ্ধ রাখা যেকোনো জনগোষ্ঠীর জন্য আত্মঘাতী ব্যাপার।
দার্শনিক হেগেলের উক্তিটি এখানে উল্লেখ করা জরুরি। তিনি বলেছিলেন, ‘ইতিহাসের শিক্ষা এই যে ইতিহাস থেকে কেউ শিক্ষা নেয় না।’ বাংলাদেশে আমরা এখন যে রাজনৈতিক নেতৃত্ব পাচ্ছি, যে লেখকদের পাচ্ছি এমনকি ভাষার চর্চা পাচ্ছি তাতে হেগেলের এ পর্যবেক্ষণেরই প্রমাণ পাওয়া যাচ্ছে। গত ২০০ বছরের মধ্যে পৃথিবীর অনেক জাতি নানাভাবে হেগেলের এ উক্তিকে অযথার্থ প্রমাণ করেছে। তারা ইতিহাস থেকে শিক্ষা নিয়েছে। আমরা দেখছি, পৃথিবীর প্রায় সব জাতির মধ্যে চলছে গণবিরোধী শক্তির প্রবলতর অভিযাত্রা। গণজাগরণের ধারা শেষ হয়ে গেছে। গণবিরোধী অভিযাত্রার বিরুদ্ধে গণজাগরণ ও জনগণের নবযাত্রার সূচনা করতে হবে। এজন্য ভবিষ্যৎ দৃষ্টি নিয়ে ইতিহাস চর্চার প্রয়োজন খুব বেশি। সৃষ্টিশীল কর্মমুখী ইতিহাসচর্চার প্রয়োজন অন্তহীন। এক্ষেত্রে ভাষার প্রচার-প্রসারের গুরুত্ব অপরিসীম। মনে রাখতে হবে, সাম্রাজ্যবাদী বিশ্বায়নের এ কালেও আশা করি, বাংলা ভাষা টিকে থাকবে এবং উন্নত হবে। বাংলা ভাষা বাঙালির অস্তিত্ব থেকে নিঃসৃত এবং বাঙালির অস্তিত্বের জন্য অপরিহার্য। বাংলা ভাষা উন্নত হলে বাঙালি উন্নত হবে। বাঙালি উন্নতি করতে চাইলে তার ভাষা, তার জাতি ও তার রাষ্ট্রকে উন্নত করতে হবে। ভাষার প্রশ্নে আমাদের দলীয় সংকীর্ণতা পরিহার করে সর্বজনীন কল্যাণে রাজনীতিকে উন্নত করতে হবে। ভাষা প্রসঙ্গে উন্নতির অন্তহীন সম্ভাবনা আছে। ওই সম্ভাবনাকেই আমাদের শনাক্ত করে এগিয়ে নিয়ে যেতে হবে।
আবুল কাসেম ফজলুল হক: শিক্ষাবিদ ও সভাপতি, বাংলা একাডেমি









