বিভিন্ন পক্ষ থেকে যুদ্ধবিরতির আলোচনা উঠলেও সহসাই তা কার্যকর হওয়ার সম্ভাবনা ক্ষীণ। বাংলাদেশের অর্থনীতিতে এরই মধ্যে যুদ্ধের নেতিবাচক প্রভাব পড়তে শুরু করলেও এখনো অর্থনীতি বড়সড় বিপর্যয়ে পড়েনি। ঈদুল ফিতরের দীর্ঘ ছুটি ২৩ মার্চ শেষ হলেও ২৮ মার্চের আগে সত্যিকারভাবে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের স্বাভাবিক ধারা ফিরে আসবে না। কিন্তু এরপর অফিস-কলকারখানা-ব্যবসা-বাণিজ্য খুলে গেলে পরবর্তী সপ্তাহ থেকে চলমান যুদ্ধের ভয়াবহ প্রভাব অর্থনীতিকে ক্রমে বিপর্যয়ের দিকে টেনে নিয়ে যেতে পারে।

স্বাধীনতার পর থেকেই বাংলাদেশ বৈদেশিক সহায়তা কিংবা আমদানির ওপর নির্ভরশীল। সেই সত্তরের উপসাগরীয় যুদ্ধ থেকে শুরু করে আশির দশকে ইরাক-ইরান যুদ্ধ ও নব্বইয়ের ইরাক-কুয়েত যুদ্ধে ভুক্তভোগীর শিকার হয়েছে বাংলাদেশ। সাম্প্রতিক বছরগুলোয় বাংলাদেশের জ্বালানি খাত আমদানীকৃত এলএনজি এবং ডিজেলের ওপর অতিমাত্রায় নির্ভরশীল। চলমান যুদ্ধের ফলে কাতার থেকে এলএনজি সরবরাহ প্রায় বন্ধ হয়ে যাওয়ায় দেশের বিদ্যুৎ উৎপাদনে বড়সড় ধস নামার আশঙ্কা রয়েছে। ঈদের বন্ধে বিদ্যুতের দৈনিক চাহিদা পাঁচ-ছয় হাজার মেগাওয়াটে নেমে এসেছে, ২৩ মার্চে ছুটি শেষ হয়ে গেলে বিদ্যুতের দৈনিক চাহিদা এক লাফে ১৭-১৮ হাজার মেগাওয়াটে উন্নীত হতে পারে। বিশেষত এপ্রিলে ক্রমবর্ধমান গরম আবহাওয়া বিদ্যুতের চাহিদাকে ক্রমে তুঙ্গে নিয়ে যাবে, যার ফলে বিদ্যুতের লোডশেডিং ভয়াবহ আকার ধারণ করার আশঙ্কা সৃষ্টি হবে। কলকারখানায় গ্যাস সরবরাহও বিপর্যস্ত হয়ে যাবে। তৈরি পোশাক কারখানাগুলোয় গ্যাস সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে হলে অন্য খাতগুলোয় গ্যাস সরবরাহ বন্ধ করা ছাড়া গত্যন্তর থাকবে না। সরকার বর্তমানে বেশি দামে বিকল্প সূত্রগুলো থেকে এলএনজি ও ডিজেল আমদানির যে প্রয়াস চালাচ্ছে সেটা বেশি দিন কার্যকর করার আর্থিক সক্ষমতা সরকারের থাকবে না। সরকারি বাজেটের ঘাটতি ক্রমে বাড়তে বাড়তে অসহনীয় পর্যায়ে চলে গেলেও অবাক হওয়ার কিছু থাকবে না। সরকার ব্যাংকগুলো থেকে বর্ধিত ঋণ নেয়ার মাধ্যমে ঘাটতি মোকাবেলার চেষ্টা করলে ব্যাংকিং সিস্টেমের ওপর ভয়ানক চাপ সৃষ্টি হবে। পাশাপাশি সরকারের উন্নয়ন কার্যক্রমের ফলে মুখ থুবড়ে পড়লে অবাক হওয়ার কিছু থাকবে না। অন্যান্য পণ্যের আমদানিও এর ফলে সীমিত করতে হবে। (এরই মধ্যে সার আমদানি প্রায় বন্ধ করে দেয়া হয়েছে)।

স্বৈরশাসক শেখ হাসিনার শাসনামলের শেষ দিকে লুটপাটতন্ত্র ও বিদেশে বেধড়ক পুঁজি পাচারের শিকার হয়ে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের পতনের যে মারাত্মক ধারা রিজার্ভকে ২০২৩ সালের আগস্টের ৪৮ বিলিয়ন ডলার থেকে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ২০ বিলিয়ন ডলারে নামিয়ে ফেলেছিল সেখান থেকে প্রধানত প্রবাসীদের রেমিট্যান্সের অভূতপূর্ব প্রবৃদ্ধির ধারা দেড় বছর ধরে অর্থনীতিতে সুবাতাস নিয়ে এসেছিল, সে ধারাটাও থেমে যাওয়ার আশঙ্কাকে উড়িয়ে দেয়া যাচ্ছে না।

মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোয় বাংলাদেশের শ্রমশক্তি অভিবাসনের যে প্রবাহ দেড় বছর ধরে ক্রমেই বেড়ে চলেছিল সেটাও বিঘ্নিত হওয়ার আলামত পাওয়া যাচ্ছে। যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর অসংখ্য আন্তর্জাতিক ফ্লাইট বাতিল হওয়ার ফলে ২৪ দিন ধরে ওসব দেশে কর্মরত কয়েক হাজার বাংলাদেশী শ্রমিক ছুটি শেষে কর্মস্থলে ফেরত যেতে পারেননি। যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলে এসব শ্রমিক চাকরি হারিয়ে ফেলবেন। নতুন অভিবাসীদের চাকরি না পাওয়ার সঙ্গে পুরনো শ্রমিকদের চাকরি হারানোর ধারা যুক্ত হলে দেশের বেকারত্ব সংকট অচিরেই মারাত্মক আকার ধারণ করবে। উপরন্তু দেশে রেমিট্যান্স প্রেরণের ক্ষেত্রে যদি ওইসব মধ্যপ্রাচ্যের দেশে কর্মরত অভিবাসী শ্রমিকরা নানা বাধা-বিঘ্নের কবলে পড়েন তাহলে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের রেমিট্যান্সনির্ভর গ্রামীণ অর্থনীতি বিপর্যয়ের গিরিখাতে পড়তে দেরি হবে না। এহেন অর্থনৈতিক শ্লথাবস্থা বা মন্দাবস্থা দেশের সার্বিক জিডিপি প্রবৃদ্ধির ধারাকেও টেনে নিচে নামিয়ে ফেলবে।

স্বৈরশাসক হাসিনার সাড়ে ১৫ বছরের লুটপাটতন্ত্রের শিকার হয়ে দেশের ব্যাংকিং সেক্টর যে ‘মেল্টডাউন’ পরিস্থিতির সম্মুখীন হয়েছিল সেটা অনেকখানি সামাল দিয়ে ফেলেছিলেন বাংলাদেশ ব্যাংকের সদ্য অপসারিত গভর্নর ড. আহসান মনসুর। পতিত স্বৈরশাসক হাসিনার সাড়ে ১৫ বছরের শাসনামলে সবচেয়ে বেশি লুণ্ঠনের শিকার হয়েছিল ব্যাংক খাত। দেশে ৬১টি ব্যাংকের প্রয়োজন না থাকা সত্ত্বেও হাসিনার খামখেয়ালি সিদ্ধান্তে তার আত্মীয়-স্বজন, আওয়ামী লীগের প্রভাবশালী নেতা এবং হাসিনার পৃষ্ঠপোষকতায় অলিগার্ক ব্যবসায়ী ও ‘রবার ব্যারনে’ পরিণত হওয়া লুটেরাদের পুঁজি লুণ্ঠনের অবিশ্বাস্য সুযোগ করে দেয়ার জন্য এতগুলো ব্যাংকের লাইসেন্স প্রদান করেছিল স্বৈরশাসক হাসিনা। চট্টগ্রামের কুখ্যাত এক ব্যাংক লুটেরাকে স্বৈরশাসক হাসিনা ব্যাংক পুঁজি লুণ্ঠনের অবিশ্বাস্য সুযোগ প্রদান করেছিলেন। লুণ্ঠিত ব্যাংকগুলোর মধ্যে নিম্নে উল্লিখিত সাতটি ব্যাংক অন্তর্ভুক্ত ছিল: ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ, এসআইবিএল, ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক, ইউনিয়ন ব্যাংক, কমার্স ব্যাংক, এনআরবি গ্লোবাল ব্যাংক এবং আল-আরাফাহ্‌ ইসলামী ব্যাংক। একজন ব্যক্তিকে সাতটি ব্যাংকের ওপর নিয়ন্ত্রণ স্থাপন করতে দেয়ার দ্বিতীয় নজির বিশ্বের কোথাও খুঁজে পাওয়া যাবে না।

পরবর্তী সময়ে অন্তর্বর্তী সরকার গঠিত শ্বেতপত্র প্রণয়ন কমিটির গবেষণা থেকে প্রমাণ হয়েছে যে ওই ব্যবসায়ী সাতটি ব্যাংক থেকে প্রায় ২ লাখ কোটি টাকা আত্মসাৎ করে বিদেশে পাচার করে দিয়েছে। শ্বেতপত্র প্রণয়ন কমিটি তাদের গবেষণায় প্রাপ্ত তথ্য-উপাত্ত হাজির করে দাবি করেছে যে শেখ হাসিনার সাড়ে ১৫ বছরের লুটপাটতন্ত্রের শিকার হয়ে দেশের অর্থনীতি থেকে প্রতি বছর গড়ে ১৬ বিলিয়ন ডলার করে মোট ২৩৪ বিলিয়ন ডলার বিদেশে পাচার হয়ে গেছে। ইসলামী ব্যাংক ২০১৭ সাল পর্যন্ত প্রধানত জামায়াত-শিবির কর্তৃক নিয়ন্ত্রিত ব্যাংক ছিল। ওই সময় ওটা ছিল দেশের প্রাইভেট সেক্টরের ব্যাংকগুলোর মধ্যে বৃহত্তম। দেশে আসা প্রবাসীদের রেমিট্যান্স প্রবাহের প্রায় ৩০ শতাংশ আসত ইসলামী ব্যাংকের মাধ্যমে। এ রকম একটা শক্তিশালী ব্যাংককে সেই ব্যবসায়ীর নিয়ন্ত্রণে নিয়ে আসা হয় স্বৈরশাসক হাসিনার প্রত্যক্ষ নির্দেশনায় ও মদদে। ২০১৭ থেকে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট পর্যন্ত সাত বছরে সে বিভিন্ন কায়দায় ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ থেকে লুট করে নিয়েছে প্রায় ৭০ হাজার কোটি টাকা, যার ফলে ব্যাংকটি দেউলিয়া হওয়ার দ্বারপ্রান্তে উপনীত হয়েছিল। পতিত সরকারের ভূমিমন্ত্রী সাইফুজ্জামান চৌধুরী লুটে নিয়েছে ইউনাইটেড কমার্শিয়াল ব্যাংককে। শেখ হাসিনার শিল্প ও বেসরকারি বিনিয়োগ উপদেষ্টা সালমান রহমানের মালিকানার প্রতিষ্ঠান বেক্সিমকো বিভিন্ন ব্যাংকের কাছে খেলাপি ঋণ রেখে গেছে ৫০ হাজার কোটি টাকারও বেশি। উপর্যুক্ত ভয়াবহ লুটপাটের মোকাবেলায় ড. আহসান মনসুর খুবই দক্ষতার পরিচয় দিয়ে ফাইন্যান্সিয়াল সেক্টরকে গত ১৮ মাসে স্থিতিশীল অবস্থায় ফিরিয়ে এনেছিলেন। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট যেখানে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ২০ বিলিয়ন ডলারের বিপজ্জনক পর্যায়ে নেমে গিয়েছিল সেখান থেকে রিজার্ভ দ্রুত বৃদ্ধির ধারাবাহিকতায় ড. মনসুরের অপসারণের দিন গত ২৫ ফেব্রুয়ারি ৩৫ বিলিয়ন ডলার অতিক্রম করেছিল। ডলারের বাজারদর এক বছরেরও বেশি সময় ধরে ১২২ টাকায় স্থিতিশীল রাখতে পেরেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। বিপর্যস্ত ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ আবার ঘুরে দাঁড়াতে সক্ষম হয়েছে। ইউনাইটেড কমার্শিয়াল ব্যাংকও বিপর্যয় অনেকখানি কাটিয়ে উঠেছে। দেউলিয়াত্বের দ্বারপ্রান্তে পৌঁছে যাওয়া পাঁচটি ইসলামী ধারার ব্যাংককে একীভূত করে গঠিত সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকও সফলভাবে কার্যক্রম শুরু করতে পেরেছে। ব্যাংকের মোট আমানত আবার ১৮ লাখ কোটি টাকা অতিক্রম করেছে। ব্যাংকের ঋণের হারও ১১ শতাংশ হারে বৃদ্ধি পেতে যাচ্ছে চলমান ২০২৫-২৬ অর্থবছরে। নতুন গভর্নর মোস্তাকুর রহমান আশা করি আহসান মনসুরের শুরু করা কাজ এগিয়ে নিয়ে যাবেন।

মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধের ফলে আর্থিক খাতে এরই মধ্যে উদ্ভূত এবং অদূর ভবিষ্যতে আসন্ন বিভিন্ন ডাইমেনশনের বিপর্যয় এহেন তুলনামূলকভাবে অদক্ষ গভর্নর কতখানি সামাল দিতে সক্ষম হবেন তা নিয়ে সংশয় থাকাটাই স্বাভাবিক। গভর্নর যদি ঋণখেলাপিদের প্রতি নমনীয় হন তাহলে ব্যাংক খাতের সবচেয়ে বড় সমস্যা প্রায় ৩১ শতাংশ খেলাপি ঋণের কোনো সমাধান অদূর ভবিষ্যতে পাওয়া যাবে না। অতএব আগামী দিনগুলোয় আবার ব্যাংক খাত দেউলিয়াপনার দিকে ধাবিত হবে কিনা কিংবা অস্থিতিশীল অবস্থায় পতিত হবে কিনা সেটা নিয়ে উদ্বেগ থাকাই স্বাভাবিক!

ড. ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার গত দেড় বছরে স্বৈরশাসক হাসিনার লুটপাটতন্ত্রকে কঠোরভাবে দমন করে অর্থনীতিতে সুবাতাস ফিরিয়ে এনেছিলেন। গত ১৭ ফেব্রুয়ারি যখন বিএনপি সরকার রাষ্ট্রক্ষমতা গ্রহণ করেছিল তখন তাদের কাছে অর্থনীতির সার্বিক অবস্থা স্বস্তিকর মনে হওয়াই স্বাভাবিক ছিল। কিন্তু মার্চের ২৪ দিন ধরে চলমান যুদ্ধ নতুন সরকারের জন্য অভাবনীয় সংকট ডেকে এনেছে। যুদ্ধ শুরুর পর গতকাল পর্যন্ত সরকারের গৃহীত পদক্ষেপগুলো মোটামুটি সঠিক ছিল বলা চলে। যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলে বাংলাদেশের মতো একটি স্বল্পোন্নত দেশ চরম বিপর্যয়ের গিরিখাতে পতিত হবেই—এর অন্যথা হওয়ার জো নেই। আগামী দিনের পৃথিবীতে সংঘাত নিয়মিত চিত্র হতে পারে সেজন্য সার্বিক প্রস্তুতি নিয়ে অর্থনীতিকে ঘাতসহ করতে হবে। একক পণ্য ও একক বাজারনির্ভর না হয়ে আমাদের রফতানি পণ্য ও বাজারে বৈচিত্র্য আনতে হবে। মধ্যপ্রাচ্যের বাইরেও দক্ষ মানবসম্পদ পাঠিয়ে রেমিট্যান্স প্রবাহ সচল ও শক্তিশালী করতে হবে। সর্বোপরি গত দেড় দশকে যে অর্থনৈতিক লুটপাট হয়েছে তার ফরেনসিক অডিট করে চুরি হওয়া অর্থ ফিরিয়ে আনতে পদক্ষেপ নিতে হবে। ভবিষ্যতে যাতে এ রকম অবাধ লুটপাট কেউ করতে না পারে সে নীতি গ্রহণ করতে হবে। স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রে আমরা যে ‘সাম্য, মানবিক মর্যাদা ও সামাজিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা’র অঙ্গীকার করেছিলাম তা পূর্ণতা পাবে আমরা যদি অর্থনৈতিক লুটপাটতন্ত্রের অবসান ঘটাই এবং সব নাগরিকের মর্যাদার দেশ গঠন করতে পারি।

ড. মইনুল ইসলাম: সাবেক সভাপতি, বাংলাদেশ অর্থনীতি সমিতি, একুশে পদকপ্রাপ্ত অর্থনীতিবিদ ও অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক, অর্থনীতি বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়