দেশে প্রবীণ জনসংখ্যা দ্রুতগতিতে বাড়লেও তাদের স্বাস্থ্য সুরক্ষায় কোনো সুসংহত জাতীয় স্বাস্থ্য কৌশল নেয়া হয়নি। বরং দেখা যাচ্ছে, প্রবীণদের জন্য নির্মিত একমাত্র চিকিৎসালয় ‘বাংলাদেশ প্রবীণ হিতৈষী সংঘ ও জরা বিজ্ঞান প্রতিষ্ঠান’ (বাইগাম) মাসের পর মাস অর্থছাড় না পাওয়ায় কার্যত অচল অবস্থায় রয়েছে। বণিক বার্তার প্রতিবেদন জানাচ্ছে, হাসপাতালটির জন্য অর্থ মন্ত্রণালয় থেকে ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বরাদ্দকৃত অর্থছাড় হয়নি। এতে হাসপাতালটির বিভিন্ন উন্নয়নকাজ আটকে আছে। হাসপাতালটিতে ডিজিটাল এক্স-রে মেশিন, মেমোগ্রাফি যন্ত্র, আইসিইউসহ অনেক গুরুত্বপূর্ণ যন্ত্রপাতি নেই। ফলে অনেক ক্ষেত্রেই সেবা নিতে আসা রোগীদের ফিরে যেতে হচ্ছে। এমনকি প্রবীণ হাসপাতাল হলেও এখানে প্রবীণদের উপস্থিতিই বর্তমানে কমে এসেছে। সব মিলিয়ে ভুক্তভোগী হচ্ছেন প্রবীণরা, যা কোনোভাবেই কাম্য নয়।
দেশের ক্রমবর্ধমান বয়স্ক জনগোষ্ঠীর স্বাস্থ্যসেবার বিষয়টিকে প্রাধান্য দেয়া প্রয়োজন। এজন্য সরকারের উচিত হাসপাতালটির অর্থছাড় নিশ্চিতের পাশাপাশি সার্বিক উন্নয়নে অগ্রাধিকারভিত্তিতে মনোযোগ দেয়া। তা না হলে ভবিষ্যতে বড় ধরনের জনস্বাস্থ্য বিপর্যয় দেখা দিতে পারে। কেননা একাধিক পূর্বাভাসে উল্লেখ করা হয়েছে যে আগামী কয়েক দশকে দেশের মোট জনসংখ্যার বড় একটি অংশ হবে ষাটোর্ধ্ব।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) এক ভাইটাল স্ট্যাটিস্টিকস প্রতিবেদনে উল্লেখ রয়েছে, ২০২৩ সালে দেশে ৬৫ বছরের বেশি বয়সের জনগোষ্ঠী ছিল মোট জনসংখ্যার ৬ দশমিক ১৪ শতাংশ। ২০১৯ সালে এ হার ছিল ৫ দশমিক ২৮ শতাংশ। সংস্থাটির তথ্যে আরো বলা হয়েছে, ২০১৯ থেকে ২০২৩ সালের মধ্যে শুধু ২০২২ সাল ছাড়া প্রতি বছরই ৬৫ বছরের বেশি বয়সী মানুষের সংখ্যা বেড়েছে। আবার জাতিসংঘ জনসংখ্যা তহবিলের (ইউএনএফপিএ) ২০২৫ সালের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে বাংলাদেশের জনসংখ্যা ১৭ কোটি ৫৭ লাখ। এর মধ্যে প্রায় ১ কোটি ২০ লাখ মানুষ ৬৫ বছর বা তার বেশি বয়সী।
বয়স বৃদ্ধির সঙ্গে সাধারণত নানা ধরনের শারীরিক ও মানসিক রোগে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি বেড়ে যায়। যেমন উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস, পক্ষাঘাতগ্রস্ত, দৃষ্টি বা শ্রবণ কিংবা স্মৃতিশক্তি লোপ, হাঁটুব্যথা, বার্ধক্যজনিত মানসিক ও শারীরিক জটিলতা। এমনকি ফ্লু, নিউমোনিয়ার মতো নানা সংক্রামক রোগে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকিও বেড়ে যায়। বয়োজ্যেষ্ঠদের এসব রোগ থেকে সুরক্ষা দিতে প্রয়োজন বিশেষ স্বাস্থ্যযত্ন। যে কারণে পৃথিবীর উন্নত দেশগুলোয় বয়োজ্যেষ্ঠদের স্বাস্থ্যগত সুরক্ষার বিষয়টিকে অগ্রাধিকারে রাখা হয়। এজন্য সহায়ক নীতিও প্রণয়ন করা হয়। সেখানে বিশেষ গুরুত্ব পায় প্রয়োজনীয় বাজেট বরাদ্দ এবং যথাসময়ে অর্থছাড়ের বিষয়টি। নরওয়ে, সুইডেন, সুইজারল্যান্ড বা কানাডার মতো দেশগুলো প্রবীণ জনগোষ্ঠীর যত্নে বিশ্বে বর্তমানে এগিয়ে আছে। এর প্রধানতম কারণগুলো হলো সর্বজনীন স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থা, অব্যাহতভাবে বাজেট সহায়তা এবং স্বাস্থ্য খাতে জবাবদিহি প্রতিষ্ঠা। এসব দেশে প্রবীণদের জন্য হাসপাতাল, হোম কেয়ার, পুনর্বাসন ও দীর্ঘমেয়াদি চিকিৎসাসেবা ব্যবস্থা গড়ে তোলা হয়েছে। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যের মতো দেশগুলোয়ও প্রবীণদের স্বাস্থ্যসেবায় ঘাটতি-সংক্রান্ত নানা বিষয় বিভিন্ন সময়ে গবেষণায় উঠে এসেছে। কমনওয়েলথ ফান্ডের সাম্প্রতিক এক জরিপে উল্লেখ করা হয়েছে, উন্নত দেশগুলোয় প্রবীণরা সময়মতো চিকিৎসা ও সম্মানজনক ব্যবহার পাওয়ার ক্ষেত্রে নানা চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ছেন। কিন্তু এর পরও দেখা গেছে, এসব দেশও বাজেট ও নীতি সহায়তার মাধ্যমে প্রবীণদের স্বাস্থ্যসুরক্ষার চ্যালেঞ্জগুলো মোকাবেলার চেষ্টা করে যাচ্ছে।
এ প্রেক্ষাপট তুলনায় বাংলাদেশে প্রবীণ জনগোষ্ঠীর স্বাস্থ্যসেবা পরিস্থিতি উদ্বেগজনক অবস্থা রয়েছে। যদিও। প্রবীণদের স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিতের বিষয়টি সামাজিক ন্যায্যতার সঙ্গেও জড়িত। সেই সঙ্গে মনে রাখা প্রয়োজন, জনস্বাস্থ্যের বিষয়টি অর্থনীতির ওপর প্রভাবক হিসেবে কাজ করে। তাই প্রবীণদের স্বাস্থ্যসেবা জাতীয় অগ্রাধিকারে রাখা প্রয়োজন। প্রয়োজনীয় বরাদ্দ দিতে হবে। সেই সঙ্গে যথাসময়ে অর্থছাড় করতে হবে। অর্থছাড় না হওয়ার বিষয়টি অর্থ মন্ত্রণালয়ের অপেশাদার আচরণকে নির্দেশ করে। প্রবীণ জনগোষ্ঠী যে সরকারের নীতি পরিকল্পনায় উপেক্ষিত সেটিও তুলে ধরে। আবার দেখা গেছে, প্রতিষ্ঠানটির অভ্যন্তরীণ ব্যবস্থাপনা নিয়েও অভিযোগ রয়েছে। অতীতে অনিয়ম ও অপ্রয়োজনীয় ব্যয়ের অভিযোগের কারণে সরকারি বরাদ্দ কমানো হয়েছে বলে দাবি করা হয়েছে। কিন্তু বরাদ্দ কমানো কি এ সমস্যা সমাধানের কার্যকর উপায়, সে প্রশ্ন থেকে যায়। বরং এ থেকে বোঝা যায় যে সরকারি এ প্রবীণ হাসপাতাল পরিচালনায় তদারকি, স্বচ্ছতা, জবাবদিহি ও কার্যকর পরিকল্পনায় বড় ধরনের ঘাটতি রয়ে গেছে। এগুলো একেবারেই গ্রহণযোগ্য নয়।
এ বাস্তবতায় প্রয়োজন প্রয়োজনীয় বরাদ্দ নিশ্চিত করা এবং যথাসময়ে সেই অর্থছাড় হওয়া। একই সঙ্গে প্রয়োজন অর্থের সঠিক ব্যবহার, আধুনিক চিকিৎসা অবকাঠামো সম্প্রসারণ, দক্ষ জনবলের মাধ্যমে সেবার মানোন্নয়নে দৃশ্যমান অগ্রগতি নিশ্চিত করা। স্বাস্থ্য ব্যবস্থার সংস্কার, অর্থায়ন, স্বাস্থ্য তথ্য ব্যবস্থা, ওষুধ পরিকল্পনা ও সেবায় প্রবীণদের অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। আর এসব কাজের জন্য অর্থায়ন ও বিনিয়োগ জরুরি।
টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা ৩-এ সবার জন্য স্বাস্থ্যের কথা বলা হয়েছে। বর্তমানে দেশের জনসংখ্যার বড় একটি অংশ প্রবীণ। তাদের স্বাস্থ্য সুরক্ষার বিষয়টি উপেক্ষিত রেখে সেই লক্ষ্য কখনই অর্জন সম্ভব হবে না। আর প্রবীণদের স্বাস্থ্যসেবা একটি বিশেষায়িত ক্ষেত্র। বার্ধক্যজনিত রোগের চিকিৎসায় প্রয়োজন বিশেষ দক্ষতা, প্রযুক্তি। সেই সঙ্গে মানবিক দৃষ্টিভঙ্গিও প্রয়োজন। এগুলো নিশ্চিতে সরকারকে তৎপর হতে হবে। জানা গেছে, এরই মধ্যে দেশের প্রবীণ নাগরিকদের চিকিৎসাসেবায় বিশেষ উদ্যোগের অংশ হিসেবে সারা দেশে সরকারি হাসপাতালগুলোয় আলাদা বিশেষায়িত ইউনিট স্থাপন করা হচ্ছে। প্রবীণ ইউনিটে থাকবে আলাদা চিকিৎসক, নার্স ও স্বাস্থ্যকর্মীর ব্যবস্থা। থাকবে আলাদা টিকিট কাউন্টার। তাদের সুবিধার কথা মাথায় রেখে বিশেষ ব্যবস্থাপনায় বসানো হবে টয়লেট। এসব পরিকল্পনা বাস্তবায়ন হোক সেটাই প্রত্যাশা। একমাত্র সরকারি প্রবীণ হাসপাতালের মতো এসব উদ্যোগ প্রয়োজনীয় তদারকি ও সদিচ্ছার ঘাটতিতে বন্ধ না হোক। তবে বিদ্যমান হাসপাতালটির সার্বিক উন্নয়ন সরকারের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকারে থাকা প্রয়োজন।










