বাংলাদেশে কর্মরত বিদেশী নাগরিকদের অধিকাংশই তৈরি পোশাক ও টেক্সটাইল খাতে কাজ করছেন। এছাড়া সরকারের বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্প, বহুজাতিক প্রতিষ্ঠান, বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্র, আন্তর্জাতিক এনজিও, চামড়া শিল্প, চিকিৎসাসেবা এবং হোটেল ও রেস্তোরাঁয়ও কাজ করছেন। বাংলাদেশে অবস্থানরত বিদেশী নাগরিকদের মধ্যে অধিকাংশই ভারত, শ্রীলংকা, পাকিস্তান ও চীনের। থাইল্যান্ড, দক্ষিণ কোরিয়া, ফিলিপাইন, তুরস্ক, মরিশাস, ইন্দোনেশিয়া, উজবেকিস্তান, ইউক্রেন, যুক্তরাজ্য ও যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিকরাও রয়েছেন। রূপপুর পারমাণবিক প্রকল্পকে কেন্দ্র করে সাম্প্রতিক বছরগুলোয় দেশে রুশ নাগরিকের সংখ্যা উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। কিন্তু দেশের বিভিন্ন শিল্প ও বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানে কতজন বিদেশী নাগরিক বৈধ বা অবৈধভাবে কাজ করছেন, সে বিষয়ে সরকারি-বেসরকারি কোনো সংস্থা বা সংগঠনের কাছেই কোনো সঠিক পরিসংখ্যান নেই। কাজের অনুমতি না থাকলেও বিদেশীদের নিয়োগ করছে দেশীয় কোম্পানিগুলো। এক্ষেত্রে আইনের তোয়াক্কা করছে না দেশীয় কোম্পানি ও বিদেশীরা। আইনের প্রয়োগ ও তদারকি না থাকায় এ ধরনের ঘটনা ঘটছে। কোনো সমন্বিত তথ্যভাণ্ডার না থাকায় বৈধ-অবৈধ বিদেশীদের প্রকৃত সংখ্যাও নিরূপণ করা যাচ্ছে না। ফলে এটিএম জালিয়াতিসহ নানা অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে গত কয়েক বছরে বেশ কয়েকজন বিদেশী গ্রেফতারও হয়েছেন। অবৈধভাবে দেশে অবস্থান করেও কর্মে নিয়োজিত হয়ে নগদে বেতন গ্রহণ করছেন। রাজস্ব ফাঁকি দিয়ে তারা হুণ্ডির মাধ্যমে লেনদেন করছেন। অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড ও অবৈধ লেনদেন বন্ধ করতে সব বিদেশী নাগরিকের প্রকৃত সংখ্যা নিরূপণ জরুরি। কাজের পূর্বানুমতি ব্যতীত কোনো বিদেশী নাগরিককে দেশীয় কোম্পানি কোনো কর্মে নিয়োগ করলে সেই কোম্পানিকেও শাস্তির আওতায় আনতে হবে। এজন্য আইনে প্রয়োগ নিশ্চিত করা জরুরি।
দেশের শিল্প ও বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানে কর্মরত বিদেশীদের ওয়ার্ক পারমিট বা কাজের অনুমোদন দেয়ার বিষয়টি তত্ত্বাবধান করে বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (বিডা)। তবে বাংলাদেশের বিনিয়োগকারীদের ওপর বিদেশী কর্মী নিয়োগে কোনো বিধিনিষেধ আরোপ করা নেই। কারিগরিভাবে দক্ষ বিশেষজ্ঞ ও ব্যবস্থাপকের প্রয়োজনে শিল্প ও বাণিজ্যিক ক্ষেত্রে বিদেশী কর্মী নিয়োগ দেয়া হয়। আর রফতানি প্রক্রিয়াকরণ অঞ্চলের (ইপিজেড) বাইরে স্থাপিত শিল্প ও বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানগুলোয় কাজ করতে গেলে বিদেশীদের বিডার অনুমোদন নেয়ার প্রয়োজন পড়ে। আইন অনুযায়ী, বাংলাদেশে অবস্থান করে কাজ করলে কাজের অনুমতি নেয়া ও আয়কর প্রদান বাধ্যতামূলক। যদিও এ আইনটি যথাযথ মানা হচ্ছে না। সমন্বিত তথ্যভাণ্ডার না থাকায় এবং ভিসা নীতিমালার দুর্বলতার কারণেই এমনটি ঘটছে। বিজনেস ভিসা (বি-ভিসা) ও ট্যুরিস্ট ভিসায় (টি-ভিসা) আসা বিদেশীদের কাজের অনুমতি নেই। অথচ তারা কোনো প্রতিবন্ধকতা ছাড়াই দেশে অবস্থান করতে পারার সুযোগ নিচ্ছেন। আবার এ-থ্রি ভিসায় বহু বিদেশী বিভিন্ন প্রকল্পে কাজ করছেন। কিন্তু ২০০৬ সালে প্রণীত ভিসা নীতিমালায় কাজের অনুমতি গ্রহণের শর্ত না থাকায় এ-থ্রি ভিসাধারীরা কাজের অনুমতি নেন না। আবার কর্মানুমতি না নিয়ে কিংবা ভিসার মেয়াদ শেষ হয়ে যাওয়ার পরও বছরের পর বছর কাজ করছে। যেহেতু অবৈধভাবে কাজ করছেন তারা নগদে বেতন গ্রহণ করে হুণ্ডির মাধ্যমে লেনদেন করছেন। এতে তারা সহজেই কর ফাঁকি দিচ্ছেন। অবৈধভাবে অবস্থান করে কেউ ধরা পড়লে বছরের পর বছর কাজ করার পর মাত্র ৩০ হাজার টাকা জরিমানা দিয়ে দেশ ছাড়ার সুযোগ রয়েছে। আইনের এ দুর্বলতার কারণে অনেক বিদেশী অবৈধভাবে দেশে অবস্থান করেন। আইনের দুর্বলতার কারণে কালো তালিকাভুক্ত বিদেশীদেরও নতুন পাসপোর্ট করার সুযোগ করে দিচ্ছে বিদেশী দূতাবাসগুলো। দেশে বিদেশীদের এ ধরনের অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড বন্ধ করতে আইনের শক্ত প্রয়োগ নিশ্চিত করা জরুরি।
বিদেশীদের অবৈধ অবস্থানের কারণে স্থানীয় কর্মীদের চাকরির সুযোগ সংকুচিত হয়। কর্মানুমতি ছাড়া কাজ করে নগদে বেতন-ভাতা গ্রহণ করে অবৈধভাবে হুণ্ডির মাধ্যমে বিদেশে অর্থ পাঠানো হয়। মেয়াদোত্তীর্ণ ভিসায় অবস্থানরত বিদেশীরা নানা অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িত হন। এসব সংকট নিরসনে তাৎক্ষণিক তথ্যপ্রাপ্তি নিশ্চিতে একটি কেন্দ্রীয় অনলাইন ইন্টার-অপারেবল তথ্যভাণ্ডার তৈরির সুপারিশ করেছে বিডা। এ তথ্যভাণ্ডারে সুরক্ষা সেবা বিভাগ, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, বাংলাদেশ ব্যাংক, জাতীয় রাজস্ব বোর্ড, বিডা, বেপজা, বেজা, হাই-টেক পার্ক কর্তৃপক্ষ, এনজিও অ্যাফেয়ার্স ব্যুরো, এনএসআই, ইমিগ্রেশন ও পাসপোর্ট অধিদপ্তর এবং স্পেশাল ব্রাঞ্চের প্রবেশযোগ্যতা থাকতে হবে। এছাড়া সংশ্লিষ্ট সব সংস্থার সঙ্গে ইন্টার-অপারেবল করে বাংলাদেশী মিশনগুলোর ভিসা প্রদানের প্রক্রিয়াকে অনলাইন ও অটোমেটেড করতে হবে। সুরক্ষা সেবা বিভাগ কর্তৃক জারীকৃত এ-থ্রি ভিসার ধরন পরিবর্তন বা এ-থ্রি ভিসার মেয়াদ বৃদ্ধির ক্ষেত্রে আবশ্যিকভাবে ১৫ দিনের মধ্যে কর্মানুমতি গ্রহণের শর্ত আরোপ করাও দরকার। প্রয়োজনে কাজের অনুমতি গ্রহণের বিষয়টি নিশ্চিতকল্পে বিদেশীদের পাসপোর্টে এ-থ্রি ভিসার পৃষ্ঠাঙ্কন করতে হবে।
গত ফেব্রুয়ারিতে এক সভা শেষে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে বিগত সরকারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছিল, ২০২৩ সালের ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত বাংলাদেশে অবস্থানরত বৈধ বিদেশী নাগরিকের সংখ্যা ১ লাখ ৭ হাজার ১৬৭। যদিও এক প্রশ্নের জবাবে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব তখন বলেছিলেন, দেশে অবৈধ বিদেশীর সংখ্যা আনুমানিক চার-পাঁচ লাখ হতে পারে।
দেশে বিপুলসংখ্যক বিদেশী নাগরিক কর্মরত থাকলেও সরকারের কাছে কোনো প্রকৃত পরিসংখ্যান নেই। আইনের প্রয়োগ না থাকায় প্রকৃত পরিসংখ্যান তৈরি করা যাচ্ছে না। এ ধরনের সমস্যা সমাধানে কেন্দ্রীয় অনলাইন-ইন্টার অপারেবল তথ্যভাণ্ডার তৈরির জোরালো উদ্যোগ নিতে হবে। দেশের নিরাপত্তার স্বার্থেই এ উদ্যোগ বাস্তবায়নে সরকারকেই পদক্ষেপ নিতে হবে। তাই বিদেশীদের কর্মের অনুমতি নেয়া বাধ্যতামূলক করতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে হবে।










