এ পরিকল্পনার অধীনে সম্পদ কর পুনঃপ্রবর্তন, কর অব্যাহতি ও রেয়াত সংকোচন, রফতানি প্রণোদনার ওপর উৎস কর বাড়ানো এবং উৎসে কর সম্প্রসারণের মতো পদক্ষেপ আলোচনায় রয়েছে। বলা হচ্ছে, ভারতীয় মডেলে কর আদায় হবে। রাজস্ব আয় বাড়ানোর জন্য রাজস্ব আহরণের বিভিন্ন বিকল্প নিয়ে কাজ করছে এনবিআর। দেশের অর্থনৈতিক বাস্তবতায় এমন উদ্যোগ প্রশংসার দাবি রাখে। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, এসব পরিকল্পনা একসঙ্গে বাস্তবায়ন হওয়ার পর টেকসই ব্যবস্থাপনার অধীনে থাকবে কিনা। এদিকে বণিক বার্তার প্রতিবেদন বলছে, কর পরিকল্পনা নিয়ে উদ্যোক্তা ও ব্যবসায়ী মহলের মধ্যে উদ্বেগ ও দুশ্চিন্তা বাড়ছে। মূলত চলতি অর্থবছরে (২০২৫-২৬) রাজস্ব আহরণের দুর্বলতা দেখেই তাদের মধ্যে এ সংশয় কাজ করছে। প্রশ্ন উঠছে, নতুন কর পরিকল্পনা বাস্তবায়ন হলে পুরনো করদাতাদের কাঁধেই বাড়তি চাপ তৈরি হবে কিনা। যদি এমনটি হয় তাহলে তা ব্যবসায়িক উদ্বেগ নয়, বরং দেশের রাজস্ব ব্যবস্থার কাঠামোগত দুর্বলতার দিকেই ইঙ্গিত করে।
আসন্ন বাজেটে রাজস্ব আহরণের সম্ভাব্য লক্ষ্যমাত্রা ৬ লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকা। এদিকে চলতি অর্থবছরের প্রথম ১০ মাসে (জুলাই-এপ্রিল) রাজস্ব আহরণ হয়েছে প্রায় ৩ লাখ ২৭ হাজার কোটি টাকা। লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় ঘাটতি দাঁড়িয়েছে প্রায় ১ লাখ ৪ হাজার কোটি টাকায়। রাজস্ব আহরণে ঘাটতি দেশের রাজস্ব ব্যবস্থার দীর্ঘস্থায়ী এক সংকট। চলতি অর্থবছরের ঘাটতির কথা বিবেচনা করলে আগামী অর্থবছরে নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের জন্য রাজস্ব আহরণে ব্যাপক কাঠামোগত সংস্কারের বিকল্প নেই। এক্ষেত্রে করদাতাদের কর দিতে উৎসাহিত করা এবং কর প্রদান প্রক্রিয়া সহজ করার মতো পরিকল্পনা সাজাতে হবে। কিন্তু ব্যাপক পরিবর্তনের পথ না ধরে নতুন কর পরিকল্পনার মাধ্যমে বিদ্যমান করদাতাদের ওপর চাপ বাড়ালে দীর্ঘমেয়াদে কর আদায় প্রক্রিয়া ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
এনবিআরের পরিকল্পনায় উচ্চ সম্পদধারীদের ওপর সর্বোচ্চ ১ শতাংশ পর্যন্ত নতুন সম্পদ কর আরোপের কথা রয়েছে। নীতির দিক থেকে সম্পদ করের ধারণাটি ন্যায়সংগত। তবে বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে বড় সমস্যা হলো, সম্পদের প্রকৃত মূল্য নির্ধারণ করার কোনো নির্ভরযোগ্য ডেটাবেজ এখনো তৈরি হয়নি। অকৃষিজমি, শেয়ার, অলিখিত ব্যবসায়িক সম্পদের বাজারদর নির্ধারণ করা জটিল এবং প্রায়ই বিতর্কিত। এক্ষেত্রে কর ফাঁকির সুযোগ থেকেই যাবে এবং যারা সৎভাবে সম্পদ ঘোষণা করেছেন, তারাই কেবল এ করের ভার বহন করবেন। অন্যদিকে উত্তরাধিকার সূত্রে প্রাপ্ত সম্পদের ওপর কর আরোপের প্রস্তাবটিও সমস্যাজনক। অনেকেই এমন সম্পদের মালিক যেখান থেকে নিয়মিত নগদ আয় নেই। কৃষিজমি, পুরনো বাড়ি বা ব্যবসা এক্ষেত্রে বড় উদাহরণ। এসব সম্পদের ওপর কর দিতে গেলে অনেকে বাধ্য হয়ে সম্পদ বিক্রি করবেন। তাতে অনেকের আর্থিক স্থিতিশীলতা ক্ষতির মুখে পড়বে। রফতানি প্রণোদনার ওপর উৎসে কর ১০-২০ শতাংশে উন্নীত করার পরিকল্পনাও উদ্বেগজনক। এলডিসি উত্তরণের মুখে দাঁড়িয়ে বাংলাদেশের রফতানি খাত এরই মধ্যে বৈশ্বিক প্রতিযোগিতার চাপে রয়েছে। এ পরিস্থিতিতে রফতানি প্রণোদনার কার্যকর মূল্য কমিয়ে দেয়া হলে শিল্পের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা আরো কমবে।
নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের সরবরাহ পর্যায়ে উৎসে কর শূন্য দশমিক ৫০ থেকে ১ শতাংশে বাড়ানোর প্রস্তাবটির ভার শেষ পর্যন্ত পড়বে ভোক্তার ওপর। চাল, ডাল, গম, ভোজ্যতেল, আলু, পেঁয়াজসহ ২৮টি কৃষি ও খাদ্যপণ্যে এ বৃদ্ধি মূল্যস্ফীতি বাড়াতে পারে, যার প্রভাব পড়বে সমাজের দরিদ্র নিম্ন আয়ের মানুষের ওপর। আর রাষ্ট্রীয় চিনিকলের সুরক্ষার নামে চিনি আমদানিতে শুল্ক বাড়ানোর প্রস্তাবটি আরো স্ববিরোধী। যে মিলগুলোর উৎপাদন ব্যয় প্রতি কেজিতে ২৬০ টাকারও বেশি, আর বাজারে আমদানিনির্ভর চিনির দাম মাত্র ১০০-১০৫ টাকা, সেখানে শুল্কের দেয়াল তুলে অদক্ষ মিলকে বাঁচানোর চেষ্টা ভোক্তার বিরুদ্ধেই যাওয়া। অবশ্য কর অব্যাহতি ও রেয়াত সংকোচনের বিষয়টি নীতিগতভাবে প্রশংসা পেতে পারে। তবে আকস্মিক ও ঢালাও সংকোচন করদাতাদের ওপর কার্যকর করহার উল্লেখযোগ্য হারে বাড়িয়ে দেবে। বিনিয়োগ পরিবেশের ওপর এর নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।
দেশে এখন যারা নিয়মিত কর দেন, তারা এরই মধ্যে আয়কর, অগ্রিম কর, ন্যূনতম কর, উৎসে কর এবং সম্পদভিত্তিক সারচার্জ মিলিয়ে বহুস্তরীয় করের চাপ সামলাচ্ছেন। এনবিআর নিয়মিত করদাতাদের ওপর বারবার শর্ত চাপাচ্ছে। ফলে সৎ করদাতাদের মধ্যেও সম্পদ গোপন রাখার মানসিকতা তৈরি হচ্ছে, এমন অভিযোগও অনেকের। এক্ষেত্রে বোঝা দরকার, কর নিয়ম মানার সংস্কৃতি একবার ভাঙলে তা পুনরুদ্ধার করা কঠিন। অনেক ক্ষেত্রে মুনাফার ওপর নয়, বিক্রির ওপর কর নেয়া হচ্ছে। লোকসান দিলেও কর দিতে হচ্ছে। এটি কর দর্শনের মূল চেতনার বিরুদ্ধে। এ ধরনের অসংগতি দূর না করে নতুন কর যোগ করা হলে করদাতার আস্থা আরো কমবে। তাই বিদ্যমান করদাতাদের আস্থা অক্ষুণ্ন রাখতে হলে এনবিআরকে আগে নিশ্চিত করতে হবে যে যারা কর দিচ্ছেন, তারা ন্যায়সংগত হারে দিচ্ছেন, হয়রানির শিকার হচ্ছেন না এবং তাদের পরিশোধিত করের বিনিময়ে উন্নত সেবা ও স্বচ্ছ ব্যবস্থাপনা পাচ্ছেন।
দেশে সক্রিয় করদাতার সংখ্যা অত্যন্ত সীমিত। দেশের অধিকাংশ মানুষকে করজালের আওতার বাইরে রেখে মুষ্টিমেয় কিছু মানুষের ওপর করের বোঝা চাপানো হয়, এ অভিযোগও পুরনো। এ ব্যবধান কমানোর জন্য দীর্ঘমেয়াদি ও টেকসই কিছু পদক্ষেপ নিতে হবে। কর শনাক্তকরণ নম্বরকে (টিআইএন) আর্থিক ও সরকারি সেবার সঙ্গে সংযুক্ত করে করের আওতা বাড়াতে হবে। এছাড়া ব্যাংক লেনদেন, রিয়েল এস্টেট নিবন্ধন, বিদেশ ভ্রমণ, ব্যয়ের ধরনের মতো তৃতীয় পক্ষের তথ্য স্বয়ংক্রিয়ভাবে যাচাই করে আয়ের অনুমান তৈরির ব্যবস্থা করতে হবে। অনানুষ্ঠানিক খাতকে আনুষ্ঠানিক অর্থনীতিতে নিয়ে আসার জন্য ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের জন্য সহজীকৃত কর পদ্ধতি তৈরি করতে হবে। জটিল রিটার্ন ফরম, দীর্ঘ প্রক্রিয়া এবং ভয়ের পরিবেশ অনানুষ্ঠানিক খাতকে আরো আড়ালে রাখছে।
করজাল সম্প্রসারণের ক্ষেত্রে প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়াতে হবে। ডিজিটাল লেনদেনে স্বয়ংক্রিয় কর ডেটা সংগ্রহ, মোবাইল ব্যাংকিং ও ই-কমার্স থেকে তথ্য সংগ্রহের কাঠামো তৈরি হলে অনেক উচ্চ আয়ের ব্যক্তিকে করজালে আনা সম্ভব হবে। অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায় উচ্চ আয়ের অনেক পেশাজীবী নিয়মিত কর দেন না। এ গোষ্ঠীকে শনাক্ত করার জন্য পেশাদার সংগঠনগুলোর সঙ্গে অংশীদারত্ব গড়ে তুলতে হবে। ব্যবসায়ী মহলের অভিযোগ, জিডিপির হিসাব যদি যথাযথ না হয়, তাহলে কর-জিডিপি অনুপাত বিভ্রান্তিকর হতে পারে। এ অভিযোগ যুক্তিসংগত। তবে জিডিপির পরিসংখ্যানের সংশোধন হলেই কর-জিডিপি অনুপাতের উন্নতি হবে না। বরং রাজস্ব ব্যবস্থাপনা সংস্কারের প্রয়োজনীয়তা থেকে যাবে।
দীর্ঘমেয়াদি কর সংস্কারের জন্য কর রেয়াত ও ছাড়গুলোর নিয়মিত পর্যালোচনা করতে হবে, যাতে অনির্দিষ্টকাল ধরে সুবিধা পাওয়ার সংস্কৃতি না থাকে। এছাড়া কর প্রশাসনে দুর্নীতি হ্রাস ও স্বচ্ছতা বৃদ্ধি এবং করদাতারা যেন স্বেচ্ছায় কর দিতে আগ্রহী হন, সেজন্য কর ব্যবস্থাকে আরো সহজ, বোধগম্য ও ন্যায়সংগত করতে হবে। কর আহরণের জন্য নতুন পরিকল্পনার চেয়ে বেশি জরুরি ভারসাম্যপূর্ণ দৃষ্টিভঙ্গি। ব্যবসার পরিবেশ যদি সত্যিকার অর্থে অনুকূল হয়, তাহলে ব্যবসায়ীদের বারবার কর রেয়াত বা কর কমানোর দাবি তুলতে হবে না। ব্যবসায়ীরা কর কমানো নয়, বরং ন্যায্য ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার দাবি তুলছেন। যারা কর দিচ্ছেন তাদের প্রণোদনা বা অন্যান্য সুবিধা দেয়ার মাধ্যমে স্বস্তিদায়ক কর আহরণ ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। করদাতারা যেন অনুভব করেন তাদের দেয়া কর সঠিক কাজে ব্যয় হচ্ছে। এ ধরনের স্বচ্ছ, জবাবদিহিমূলক এবং সহজ কর আহরণ ব্যবস্থা জরুরি। এ কর আদায় হবে ন্যায্যতার ভিত্তিতে। অর্থাৎ বৃহৎ করজালের মাধ্যমে।
আসন্ন বাজেট ব্যবসাবান্ধব হবে বলে নানা মহলে আলোচনা চলছে। তবে বাজেট প্রস্তুতিতে সীমাবদ্ধ থাকলে চলবে না। নীতির কাঠামোয় বড় পরিবর্তন আনতে হবে। মনে রাখা জরুরি, করজাল সম্প্রসারণ না করে রাজস্ব আহরণ সম্ভব নয়।










